ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল

29

 

দেশে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রণিত ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মানচিত্রে সবচেয়ে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্যে সিলেটে গত কয়েকদিনে উল্লেখযোগ্য ভূ-কম্পন অনুভূত হয়েছে। সিলেটে উপর্যূপরি কয়েক দফায় অনুভূত ভূমিকম্প আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সারাদেশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন মৃদু মাত্রার ভূ-কম্পনগুলোই আসলে এতদঅঞ্চলে উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পেরই পূর্বাভাস দিচ্ছে।
ভ‚মিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য বলছে, গত ২৯ মে থেকে সর্বশেষ ৭ জুন পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে মাত্র তিনদিনে সাত দফা মৃদু মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৯ মে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত একদিনেই উপর্যূপরি চার দফা ভূ-কম্পন অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল সিলেটের জৈন্তাপুর ও এর আশপাশে ছিলো। এরপর সর্বশেষ গত ৭ জুন দেড় মিনিটের ব্যবধানে পরপর দুই দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজার’সহ আশপাশের এলাকায় সর্বশেষ গত ১৮ এপ্রিল সন্ধ্যা সাতটা ২৪ মিনিটে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ওই ভূ-কম্পনটি তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হয়েছিল। রিখটার স্কেলে পাঁচ দশমিক শূন্য মাত্রার ওই ভ‚মিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল প্রতিবেশি দেশ মিয়ানমারের হেখা অঞ্চলে। দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় রাজধানী ঢাকার আগারগাঁও থেকে ৪১৪ কিলোমিটার দূরত্বের পাশাপাশি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ২৭ দশমিক ৩ কিলোমিটার গভীরে ভু-কম্পন হওয়ার কারণে সেটা খুব বেশি টের পাওয়া যায়নি।
ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, ভূমিকম্পের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভু-ত্বকীয় পাত বা টেকটনিক প্লেট। ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে বাংলাদেশ তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে। সেগুলো হলো- ইউরোশিয়ান প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট এবং মিয়ানমার মাইক্রো প্লেট। এই তিন প্লেটের সংযোগস্থল দেশের জাতীয় সীমান্ত দিয়ে গেছে। ভারত ও মিয়ানমার প্লেটের মধ্যে অবস্থান করছে সিলেট। আর সিলেটের উত্তরে রয়েছে ‘ডাউকি ফল্ট’। তাই সেখানে ভূমিকম্পের আশঙ্কা ও ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। আবার পূর্বাঞ্চলের ‘সেগিং ফল্ট’- এর দিকেও ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। এই প্লেট বাউন্ডারিগুলোর সবকটাই দেশের সীমান্ত এলাকার খুবই কাছে। ডাউকি ফল্ট সিলেটের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার উত্তরাংশের ৩৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। ওই ফল্টে ঘন ঘন মৃদু ভূমিকম্প হওয়া মানে সেটা সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তিনদিনে সাত দফা মৃদু ভূ-কম্পন শুধু সিলেটই নয়, সারা দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি করছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউএনডিপি’র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এ কে এম মাকসুদ কামাল বলেন, দেশের অভ্যন্তরেই ১২টি ভূমিকম্প ফাটল রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি খুব বিপজ্জনক। প্রাকৃতিকভাবে শত বছর পর পর এসব ফাটলে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার নজির রয়েছে। বিগত ১৮২২ সালের পর ১৯১৮ সালে দেশে উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। তার মানে, আমরা আরেকটি উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পের দ্বারপ্রান্তেই রয়েছি। এরইমধ্যে টেকটনিক প্লেটগুলোতে প্রচুর পরিমাণে শক্তি জমা হয়েছে। ভ‚-তলের টেকটনিক প্লেটে ক্রমান্বয়ে জমা হওয়া শক্তিই এক পর্যায়ে ভূমিকম্পের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠে বেরিয়ে আসে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তালিকায় দেশে উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের পার্বত্যাঞ্চলের কিছু অংশ। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের চারটি জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগের পাঁচটি জেলাও ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী জেলার অংশবিশেষ, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলার উত্তরাংশ। এরপর মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের অংশবিশেষ, চট্টগ্রাম, বান্দরবান পার্বত্য ও কক্সবাজার জেলা। সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা ও বরিশাল বিভাগ।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল আর্থকোয়েক মডেলে রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা চার দশমিক নয় মাত্রায় হলে সেটিকে মৃদু ভ‚মিকম্প বলা হয়। কম্পনের মাত্রা পাঁচ থেকে পাঁচ দশমিক নয় হলে মাঝারি আর ছয় থেকে উপরের দিকে হলে সেটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।