ভুল রিপোর্টে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে সাবেক পিপি’র নোটিশ

141

বুকে প্রচন্ড ব্যথা। সিএসসিআর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তারিখটা ছিল গত ৬ মার্চ। ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। এরপর সিদ্ধান্তে আসেন এটা হার্টের সমস্যা। তাও ছোটখাট নয়, এনজিওগ্রাম করার পরামর্শ দেন ওই রোগীকে। সম্পূর্ণ এক সাপ্তাহের বিশ্রামও দেয়া হয়। ৯ মার্চ হাসপাতাল থেকে রিলিজ নেন। এক সাপ্তাহের বিশ্রামের পর ঢাকায় ছুটেন। কিন্তু এনজিওগ্রাম করতে গেলে করোনা নেগেটিভের সার্টিফিকেট দরকার। এ কারণে তিনি অনলাইনে একটি ডায়াগনস্টিক পেম্যান্ট করেন। নমুনাও দেন। নমুনা দেয়ার পর মোবাইলে রিপোর্ট আসে। তখন তিনি ফজরের নামাজের জন্য দাঁড়ান। একেবারে কাকডাকা ভোরে। রিপোর্ট পজেটিভ। তিনি আর দাড়াঁতে পারছিলেন না। ভয়ে সারা শরীর কাঁপছিল। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। কিন্তু করোনা পজেটিভ হওয়ার মতো তার কোনও উপসর্গই নেই। মোবাইলে পাঠানো ওই রিপোর্টে ভাল করে চোখ বুলাচ্ছিলেন। যদি কোনও ভুল ধরা পড়ে। হঠাৎ এক জায়গায় চোখ আটকে যায়। তিনি করোনার নমুনা দেন বিকেল ৪টায়। কিন্তু রিপোর্টে এসেছে রাত ৯টা ৩১ মিনিটে নমুনা দেয়ার তথ্য। সেম্পল রিসিভ দেখানো হয়েছে রাত ১টা ৩০ মিনিটে। প্রচন্ড হার্টের সমস্যার মধ্যে কিছুটা শক্তি ফিরে পান তিনি। একইদিন সকাল ১১টায় আরেকটি প্রাইভেট চিকিৎসালয়ে নমুনা দেন। এতে রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। অদ্ভুত বিষয়! এরপর এনজিওগ্রাম করে দেখে তার হার্টে একটি ব্লক ১০০ ভাগ। হার্টে রিং পড়ান ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের চিকিৎসক ডা. বিধান বণিক। সুস্থ হয়ে চট্টগ্রামে ফেরেন এ রোগী। তিনি চট্টগ্রামের সাবেক মহানগর পিপি এডভোকেট আবদুস সাত্তার। গতকাল করোনা পজেটিভ রিপোর্ট দেয়া ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধেই ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আইনি নোটিশ পাঠান।
এ বিষয়ে তিনি জানান, ঘটনাটা কত ভয়াবহ বুঝতে পারেন। এমনিতেই হার্টের সমস্যা নিয়ে ঢাকায় গেছি। করোনা পজেটিভ শুনার পর মনে হচ্ছিল আমি মুহূর্তের মধ্যে স্ট্রোক করব। এসব ভুয়া রিপোর্ট প্রদারকারীদের আইনের আওতায় আনা দরকার মানুষের স্বার্থে। এ কারণে আমি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছি। এডভোকেট আবদুস সাত্তারের পক্ষে নোটিশটি পাঠিয়েছেন চট্টগ্রামের আরেক সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল হক হেনা। ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে যাদের নামে নোটিশ পাঠানো হয়েছে তারা হলেন, ঢাকার বনানীস্থ প্রাভা হেলথ এন্ড ডায়াগনস্টিক এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রিপোর্ট প্রস্তুতকারী ডা. জাহেদ হোসেইন ও জুনিয়ার সাইন্টিফিক অফিসার রেজোয়ান আল রিমন।
আইনি নোটিশে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাভার মিরপুরস্থ কালেকশন সেন্টারে করোনা টেস্টের জন্য বিকাশে ৩ হাজার ৪৭৫ টাকা পাঠান এডভোকেট আবদুস সাত্তার। ২০ মার্চ বিকেল ৪টায় নমুনা দেন। তিনি মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে রিপোর্ট পান ২১ মার্চ ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে। যখন ফজরের নামাজের জন্য দাঁড়ান। পাঠানো রিপোর্ট পজিটিভ দেখে তার স্ট্রোক করার যোগাড় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নোটিশে বলা হয়, এডভোকেট সাত্তারের কাছ থেকে উল্লেখিত দিন বিকেল ৪টায় নমুনা সংগ্রহ করা হলেও পরীক্ষা প্রতিবেদনে নমুনা কালেকশনের সময় উল্লেখ করা হয় রাত ৯টা ৩১ মিনিট। তাছাড়া নমুনা কালেকশন রিসিভ দেখানো হয়েছে ২০ মার্চ দিনগত রাত দেড়টায়। বিষয়টি গোলমেলে মনে হওয়ায় তিনি ২১ মার্চ সকাল ১১টা ৬ মিনিটে ঢাকার এ. এম. জেড নামে আরেক হসপিটালে নমুনা দেন। পরীক্ষার ফি নেয়া হয় ২ হাজার ৮০০ টাকা। এখান থেকে রিপোর্ট আসে এডভোকেট আবদুস সাত্তার করোনা নেগেটিভ।
তিনি জানান, নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পর আমার মাথা থেকে যেন পাহাড় সরে যায়। আমার সামর্থ আছে বলে আমি দুই হাসপাতালে প্রাইভেট খরচে করতে পেরেছি। কিন্তু যাদের সামর্থ নেই তাদের অবস্থা কি হবে আল্লাহ মালুম।
এ বিষয়ে নোটিশদাতা এডভোকেট আহসানুল হক হেনা জানান, একটি বৃহৎ ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠান এভাবে মনগড়া ও ভুল রিপোর্ট প্রদান করে এডভোকেট সাত্তারের সাথে প্রতারনা ও বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। এতে জনাব সাত্তারের ২০ লাখ টাকা আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে।
২২ মার্চ এডভোকেট সাত্তার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি হন। ২৫ মার্চ তিনি হার্টে রিং পরে রিলিজ হন। প্রথমদিকে করোনা পজেটিভের যে রিপোর্ট এসেছিল তা বিশ্বাস করলে তাকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকতে হত। কিন্তু তার হার্টের অবস্থা এতই নাজুক ছিল যে, দ্রুত সময়ের মধ্যে রিং পরতে না পারলে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে আইনি নোটিশে উঠে আসে।