ভুলে যাওয়া ইতিহাস

8

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

ফিলিস্তিনিদের আর দাবীয়ে রাখা সম্ভব নয়।ইসরাইল এই সত্যটা যত সওর বুঝতে পারে ততই তা নিজের জন্য, ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং যুক্তরাষ্ট্র তথা সারা বিশ্বের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। বিশ্বের ইতিহাসে সব সময় দেখা গেছে নিপীড়িত জাতি যখন জেগে উঠে তখন তাকে আর দাবিয়ে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের কিছু উঠতি ছেলেদের দ্বারা মুক্তিবাহিনীর হাতে পাকিস্তানের দক্ষ সেনাবাহিনীর সদস্যরা সমস্ত আধুনিক অস্ত্র তাদের কাছে থাকা সত্তে¡ও মাত্র ৯ মাসের মধ্যে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে যুদ্ধে অপমানজনকভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। আসলে বিশ্বের ইতিহাসে সব সময় দেখা গেছে নিপীড়িত জাতি যখন জেগে উঠে, তখন তাকে দাবিয়ে রাখা কিছুতেই সম্ভব হয়ে উঠে না। এখন যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, প্রায় অর্ধশতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন রাজনীতিবিদ জো বাইডেনকে ও প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে স্বীকার করতে হলো ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ছাড়া ইসরাইলের বা ফিলিস্তিনিদের সমস্যার কোন সমাধান নাই।
নজরুলের ভাষায় বলতে গেলে,
‘আমি সেদিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না,’
বর্তমানে বিশ্ববাসীর আরেকটা দুর্ভাগ্য হলো, যে সব নেতৃবৃন্দ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছেন, তাঁরা প্রায় সবাই নিজ নিজ দেশের জন্য অস্ত্র মজুদের প্রতিযোগিতায় রয়েছে, অস্ত্র তৈরির যোগ্য বড় বড় দেশগুলি শুধু নিজের প্রয়োজনে অস্ত্র তৈরি করে না, সব অস্ত্র বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অন্য দেশের কাছে অহরহ বিক্রয় ও চলছে।এতে সারা বিশ্বে বিভিন্ন দেশের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা চলছে। ‘অস্ত্রই বিশ্বব্যাপী অশান্তি সৃষ্টির কারণ’। অথচ বিশ্বের এইসব রাজনৈতিক নেতারা তা বুঝেও বুঝেন না। অস্ত্র ক্রয় বা বিক্রয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট দেশের যে সব লোক জড়িত থাকে তাঁরা ঐ দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী থেকেও শক্তিশালী হয়ে থাকেন। সারা বিশ্বে প্রায় একই অবস্থা চলছে। অস্ত্র নিয়ে বিশ্বব্যাপী এই পাগলামি বিশ্বব্যাপী এমন ভয়ানক কান্ড ঘটে যেতে পারে, পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অস্ত্রের প্রয়োজন শূন্যের কোটায় পৌঁছে যেতে পারে। সেজন্য বর্তমান পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আগেই বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘I do not know with what weapons would war III will be fought, but world war IV will be fought with sticks and stone’. অর্থাৎ আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোন অস্ত্র ব্যবহার হবে? তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধে মাত্র লাঠি আর পাথরই ব্যবহার হবে’। ফিলিস্তিন শুধু একটি মুসলিম রাষ্ট্র নয় এর সাথে আছে খ্রিস্টানদের ও ঐতিহ্য। মুসলমানদের প্রথম কেবলা ‘আল আকসা মসজিদ’ এবং এখানে রয়েছে ইব্রাহিম (আ.) এবং মূসা (আ.) সহ অসংখ্য নবী ও রাসূলের কবর। এই মসজিদ থেকে হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বোরাকে করে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন।
ইহা স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছে, বিশ্বজগৎ ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরাইলি বর্বরতা আর গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। ফিলিস্তিনিদের জমি দখল ও আর মেনে নেওয়া হবে না। সারা বিশ্বের কাছে ইহা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে, ফিলিস্তিনিদের ভূমি গায়ের জোরে দখল করে নিচ্ছে। এই বর্বর দখলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ বহু প্রস্তাব নিয়েছে, কিন্তু ইসরাইল একটি প্রস্তাবের প্রতি ও যথাযথ সম্মান দেখায় নাই। এক কোটি জনসংখ্যার ও কম, একটি দেশ জাতিসংঘের অবমাননা করবে, এর চাইতে সমস্ত মানবজাতির জন্য আর বড় অপমান কী হতে পারে? জাতিসংঘের সাথে ইসরাইলের এই অসভ্য আচরণের প্রতিক্রিয়া সব চাইতে বেশি হওয়া উচিত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। বরং দেখা যায় এই ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় ইসরাইল আর ও উৎসাহিত হয়েছে। বিশ্বের পরাশক্তি হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র এই ব্যাপারে তার দায়বদ্ধতা এড়াতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সেক্রেটারি হেনরি কিসিঞ্জার তাঁর লেখা বই ‘White House Years’ এ লিখেছেন, Whereas in 1920 we had withdrawn from the world because we thought we are too good for it, the insidious theme of the late 1960s was that we should withdraw from the world because we are too evil for i. অর্থাৎ ১৯২০ সালে বিশ্ব থেকে আমাদের উপস্থিতি আমরা প্রত্যাহার করেছিলাম কারণ আমরা মনে করেছিলাম এই কাজের জন্য আমরা অনুপযুক্ত কারণ আমরা অতিশয় শুভ। ১৯৬০ দশকে আরেকটি প্রতারণাপূর্ণ প্রতিপাদ্য শুনা গেল আমাদেরকে বিশ্ব থেকে প্রত্যাহার করা উচিত কারণ আমরা ইহার জন্য অশুভ”।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৪ আগস্ট ১৯৪১ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল যাতে উভয় রাষ্ট্র প্রতিজ্ঞা করেছিল যে তাঁরা নিজ নিজ দেশের মূল ভূখন্ডের বাইরে কোন ভূমি দখল করবে না। এটাই হয়ে যায় উপনিবেশ গড়ার জন্য ভূমি দখল অবৈধ করার ভিত্তি। এই চুক্তিটিই পরে দুই রাষ্ট্র ও স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিয়াংকাইশাকের চীন সহ চার রাষ্ট্র মিলে আবারও এক সাথে স্বাক্ষরিত হয় ১৯৪২ সালে। ইহাই হলো বর্তমানে জাতিসংঘ কর্তৃক কলোনি স্থাপন নিষিদ্ধ করার প্রতীক। ইতিমধ্যেই ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে পাশ হওয়া রেজুলেশন বা প্রস্তাবের প্রতীক। সারা বিশ্বব্যাপী ইসরাইলিদের পশুবৎ বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের ঝড় ইতিমধ্যে আরম্ভ হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের মালিকানাধীন জায়গা ইসরাইলীদের জোর করে দখল করে নেওয়া সারা বিশ্বের জনগণ আর মানতে রাজি নয়। ইহাকে যদি আর প্রশ্রয় দেওয়া হয়, সারা বিশ্বে অন্ধকার যুগের লুটপাটের অবস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনাই রয়েছে।
সারা বিশ্বব্যাপী ইসরাইলিদের পশুবৎ বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার আওয়াজ উঠা ইতিমধ্যে আরম্ভ হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জায়গা ইসরাইলিদের জোর করে দখল করে নেওয়া সারা বিশ্বের জনগণ আর মানতে রাজী নয়। স¤প্রতি আয়ারল্যান্ডের পার্লামেন্টে ফিলিস্তিনিদের ভূমি ইসরাইল কর্তৃক জোর দখলের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করেছেন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইসরাইলের এই বেআইনি এবং অমানবিক ও দস্যুসুলভ দখলের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাশ করেছেন। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইসরাইলের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে এবং তাতে ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অসহনীয় অবজ্ঞা দেখিয়েছে। ইহা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যদের মধ্যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ।এই প্রস্তাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে ইসরাইল কর্তৃক আন্তর্জাতিক আইন দারুণভাবে ভঙ্গ হয়েছে।১৯৬৭ সালে গাজা, পূর্ব জেরুজালেম, গোলান হাইট এবং তার সাথে সিনাইকে ও ইসরাইল একীভূত করে নিয়েছিল। এই পর্যন্ত শুধু, সিনাইকে মিশরের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে তড়িঘড়ি করে গোলান মালভূমিকে ইসরাইলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সেটাকেই ইসরাইলের অধিবাসীদেরকে ইতিমধ্যেই দখল ও দিয়েছে। ট্রাম্প ইহা ইসরাইলের মালিকানাধীন বলে স্বীকৃতি ও দিয়ে দিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতাকালীন সময়ে পূর্ব জেরুজালেমের অন্তত ৬০ শতাংশ ইহুদীদেরকে স্থায়ীভাবে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
গত রমজান মাসে যখন ইসরাইলের সেনাবাহিনী পূর্ব জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করার চেষ্টা শুরু করল তখনই ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ভয়াবহ পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তা ইসরাইলি সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং রমজান মাসে আল-আকসা মসজিদের ভিতরে যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যায়।হামাস অনবরত রকেট আক্রমণ শুরু করে। যাই হোক বর্তমানে উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমে যুদ্ধ বিরতি চলছে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও বলেছেন ফিলিস্তিনিদের আলাদা রাষ্ট্র না হলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অত্যাচারী সে ব্যক্তি হউক, দল হউক, রাষ্ট্র হউক বা জাতি হউক, চিরস্থায়ী হয় নাই এবং ভবিষ্যতেও হতে পারবে না। কারণ ‘He prayeth best who loveth best. All things both great and small for the dear god who loveth us, He made and loveth all’.

লেখক: কলামিস্ট