ভাষাচিন্তক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

50

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

(পূর্ব প্রকাশিতের পর : শেষ কিস্তি)
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়: আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষাতত্ত্ব অধ্যয়ন করেননি বলেই কি আবদুল করিমের ভাষাচিন্তা অবহেলিত? বিশেষত বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান-এ তাঁর পরিচয় কেবল ‘সংগ্রাহক ও লেখক’। আবার, তাঁর সন্তানতুল্য-স্নেহে লালিত ভ্রাতুষ্পুত্র লিখিত জীবনীতে: ‘আবদুল করিম কেবল মধ্যযুগে রচিত পুথির সংগ্রাহক, সংরক্ষক, পরিচায়ক, গবেষক ছিলেন না, তিনি নবনূর ও কোহিনূর পত্রিকার রসিক পুস্তক সমালোচক তথা রসগ্রাহী সাহিত্যালোচকও ছিলেন অনেককাল’ (শরীফ, ১৯৮৭: ৫৫)। এখানেও তাঁর আঞ্চলিক ভাষা আলোচনা ও ভাষাচিন্তার কথা অনালোচিত। ইসলামাবাদ গ্রন্থের পরিচিতিতেও তিনি লিখেছেন, ‘চট্টগ্রামের সচিত্র ইতিহাস’ (শরীফ, ১৯৮৭: ৫৫)। অথচ আমরা জানি সওগাত-এ সচিত্র ‘ইসলামাবাদ’ প্রকাশিত হলেও গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় চিত্র পরিত্যাক্ত হয়েছে এবং ১৬০ পৃষ্ঠার গ্রন্থে চুয়াত্তর (৫-৭৮) পৃষ্ঠা মাত্র ইতিহাস এবং বাকি একাশি (৭৯-১৫৯) পৃষ্ঠা ব্যাপী ভাষা-আলোচনা। আলোচনাটিতে তিনি পালি-মঘী-রাঢ়ীয়-আরবি-ফারসি ও পর্তুগিজ ভাষার মিশ্রণে ও প্রত্যক্ষ প্রভাবে চট্টগ্রামের ভাষা কীরকম বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়ে উঠেছে তার পরিচয় বিশ্লেষণ করেছেন অনেকটা ভাষাতাত্ত্বিকের মতো দক্ষতা দেখিয়ে। ইসলামাবাদ গ্রন্থের ৭৯-১৪৩ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘চট্টগ্রামের ভাষা’ এবং ১৪৪-১৫৯ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘দেশভেদে বঙ্গভাষার বিভিন্নতা’ নিয়ে আবদুল করিম সাবলীল আলোচনা-বিশ্লেষণ করেছেন। অবশ্য সাহিত্যবিশারদ স্বীকার করে নিয়েছেন: ‘বঙ্গদেশের নানা স্থানের ভাষার নমুনা ও তৎসম্বন্ধে অনেক কথা পন্ডিতপ্রবর ডক্টর গ্রীয়ার্সন সাহেবের দ্যা লিংগুইস্টিক সার্ভে ওব ইন্ডিয়া নামক গ্রন্থ হইতে গৃহীত হইয়াছে’ (করিম, ২০১৭: ১৫৯)। তবু ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক লিখেন, ‘আলোচনার মধ্যে নানাস্থানে গ্রীয়ার্সনের প্রসঙ্গ এনে তিনি বক্তব্য স্পষ্ট করার প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু তৎসত্তে¡ তিনি কোথাও গ্রীয়ার্সনের জরিপ পদ্ধতির ওপর পূর্ণত নির্ভর করেননি’ (মনিরুজ্জামান, ১৯৯৪: ৩১৮)। সাহিত্যবিশারদ তাঁর ‘চট্টগ্রামী ভাষা কী?’ (১৯৪৬) প্রবন্ধে সাধারণের অবগতির নিমিত্ত চট্টগ্রামী ভাষার একটু নমুনা দেন এভাবে-
‘বাঁঅনর পোয়া ভাত খাই আচাইত যাই চায় যে, খালত্তুন সেয়ান গরি উডি তার হৌর ষাঁডত্ হন্ধ্যা গরের। তে তার হৌররে দেই পুছ কৈল্ল যে-অবা, এই খাল কাট্টিল যে মাডিইন কি হৈল্? এই কথা হুনি তার হৌর আর গোস্সায় থাইত্ন পারি কয় যেÑন জানস ঔডা? আধাগ্গিন্ মাডি আঞিই খাই, আধাগ্গিন্ মাডি তোর বাএ খাইয়ে; নয় ক্যা তোরে আঞি মাইয়া বিয়া দিইই!’ (করিম, ১৯৯৭: ৫৯১)।
উদাহরণে ব্যবহৃত একটি বোকা জামাতার গল্পের অংশবিশেষ তাঁর আগে গ্রিয়ার্সন এবং এনামুল হক ব্যবহার করেছেন। সম্প্রতি রবীন্দ্র কুমার দত্ত (২০১২) তাঁর গবেষণা-গ্রন্থের পরিশিষ্টেও এ-গল্প ব্যবহার করেছেন। তবে লক্ষণীয় যে, আবদুল করিম ‘দুরুচ্চার্য’ আঞ্চলিক ভাষাকে বাংলা ভাষার লিপি দিয়ে সাবলীলভাবে প্রকাশের পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন এবং বাংলা ভাষার-ক, খ, গ, হ ইত্যাদি সব ধ্বনির অবস্থান-অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন। অথচ বর্তমানে অনেক কবি-সাহিত্যিক-হন্ডে (কোথায়), গরি (করি), হয় যে (কয় যে), হন হন (কন কন/ কে কে) ইত্যাদি লিখে বাংলা ভাষা থেকে পৃথকতা প্রমাণের প্রয়াস পান। সাহিত্যবিশারদের সমর্থন সেখানে নেই। তাঁর নিষ্ঠার নিদর্শন: গ্রাম্য শব্দ-সংগ্রহ এবং তার অর্থনির্দেশ ও ব্যুৎপত্তি-নির্ণয়। গত শতকের গোড়ায় যখন দেশে শিক্ষার মান তলানিতে তখন আবদুল করিম বলছেন বাংলা ভাষায় শিক্ষা দানের কথা এবং চট্টগ্রামের লোকভাষা বা আঞ্চলিক বুলিকে বাংলার ‘প্রাদেশিক ভাষা’ অভিধা দিয়ে বাংলা ভাষার উপভাষা হিসেবে বর্ণনা-বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমানে শিক্ষার প্রসার ঘটলেও আমরা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে হীনম্মন্যতা কাটাতে পারিনি; আবার অনেকে আঞ্চলিক ভাষাকে পৃথক ভাষা অভিধা দিতে আবেগাপ্লুত। আনিসুজ্জামানের ভাষায়:
‘আমাদের দেশে অনেক উপভাষা আছে-তার মধ্যে সিলেটি ও চট্টগ্রামির মতো উপভাষা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিচারে একধরনের প্রবলতার অধিকারী। অনেককে বলতে শুনি এই উপভাষা তাদের প্রথম ভাষা, প্রমিত বাংলা তাঁদের পক্ষে দ্বিতীয় ভাষা। একথা যাঁরা বলেন তাঁরা ভাষা ও উপভাষার পার্থক্য বুঝতে চান না। কোনো উপভাষা যে কালক্রমে স্বতন্ত্র ভাষার রূপ পরিগ্রহ করতে পারে না তা নয়। তবে বাংলার কোনো উপভাষার পক্ষে এখনও সে সময় আসেনি।’ (আনিসুজ্জামান, ২০১৩: ২৮)।
বর্তমান বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে বোধগম্যতার দিক থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী উপভাষা হচ্ছে সিলেট-নোয়াখালী-চট্টগ্রামের উপভাষা। এগুলোকে একত্রে ‘প্রান্তবঙ্গীয়’ উপভাষা শ্রেণিকরণে চিহ্নিত করা যায় (শ্যামল, ২০১৮: ৮৯)। কোনোভাবেই পৃথক ভাষা নয় এবং পৃথক ভাষা ভাবা কাক্ষিতও নয়-সে-কথা শতবছর আগে আবদুল করিম ইসলামাবাদ-এ জানিয়ে দেন এভাবে, ‘অভ্যন্তরে দৃষ্টিপাত করিলে অনুসন্ধানী মাত্রেই বুঝিতে পারিবেন যে আমাদের ভাষার মূল প্রকৃতি বাঙ্গালা ভাষার নিয়ম বহিভর্‚ত নহে’ (করিম, ২০১৭: ৯৮ )। আমরা তাঁর আঞ্চলিক ভাষা আলোচনা-চিন্তাকে চূড়ান্ত বলছি না। বস্তুত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কোনো আলোচনা-গবেষণাই চূড়ান্ত নয়; তবে পূর্ববর্তী গবেষণার পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনা থেকেই নতুন গবেষণার পথ বেরিয়ে আসে। পূর্ববর্তী জ্ঞান অসমাপ্ত হলেও অবহেলার নয়-একথা মনে রেখে আবদুল করিমের আলোচনা তাঁর ভাষাচিন্তাকে অধ্যয়ন-পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বিশ শতকের গোড়া থেকে বায়ান্নোর ভাষা-আন্দোলন পর্যন্ত বাংলার মুসলমানকে জাতীয়তা-সংকট ও মাতৃভাষা-বিতর্ক থেকে মুক্ত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত করতে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। যে জাতীয়তাবাদের জোয়ারে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। অনেকে মুসলিম জাগরণের প্রান্ত ধরেন নবনূর (১৯০৩) থেকে, কারো কারো কাছে তা অবশ্য বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মুখপত্র শিখা (১৯২৬) থেকে। নবনূর প্রথম বর্ষ আষাঢ় ১৩১০ সংখ্যাতেই আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল করিম লিখলেন, ‘দেশ প্রচলিত ভাষাই কোন জাতির মাতৃভাষা ও জাতীয় ভাষা হওয়া উচিত এবং স্বাভাবিক। … বাঙ্গালা ভাষা ত্যাগ করিলে বঙ্গীয় মুসলমানের কোনো মঙ্গল আছে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস নাই’ (করিম, ২০১০: ১৪-১৫)। বলাবাহুল্য বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলন-জাত জাতীয়তাবোধ জন্মানোর আগেই সাহিত্যবিশারদের এমন স্বচ্ছ চিন্তা আজকের দিনের অনেক সুশীলের কাছেও অচিন্তনীয়। কলকাতায় ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত সপ্তম বর্ষ বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে অভিভাষণে সাহিত্য বিশারদ আরও স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কেন বাংলা এবং কেন তা অপরিবর্তনীয়। তাঁর ভাষায়:
‘মাতার মুখনিঃসৃত ভাষাই মাতৃভাষা। … মাতৃদুগ্ধ যেমন শিশুর স্বাভাবিক খাদ্য, মাতৃভাষাও তেমনই তাহার প্রকৃতি-দত্ত ভাষা। … বঙ্গদেশে হিন্দু সমাজ হউক আর মুসলমান সমাজ হউক, সর্বত্র সে ভাষা এই বাঙ্গালা ভাষা (করিম, ২০১০: ১৮)।
চট্টগ্রামে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে আবদুল করিম ইসলামাবাদের ইতিহাস ও চট্টগ্রামের ভাষাবৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে স্পষ্ট ভাষায় তাঁর সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন: মাতৃভাষার সহায়তা ভিন্ন জাতীয় উন্নতি কেবল সুদূর পরাহত নয়, সম্পূর্ণ অসম্ভব। এজন্য আমাদের শিক্ষার বাহন (সবফরঁস) মাতৃভাষা বাঙ্গালাই হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি (করিম, ২০১০: ৭০)। ডেনমার্কের উদাহরণ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মাধ্যমও তিনি বাংলা হবার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এই মতবাদ থেকেই গড়ে ওঠে ভাষা-আন্দোলন; অর্জিত হয় রাষ্ট্রভাষা বাংলা। অথচ শতবছর পেরিয়েও সাহিত্যবিশারদের স্বপ্ন থেকে আমরা যোজন দূরে বাস করছি।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও প্রান্তবঙ্গীয় দু’জন আঞ্চলিক ভাষা-গবেষক ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে বাঙালিকে প্রাণিত করেন। একজন সৈয়দ মুজতবা আলী ৩০ নভেম্বর ১৯৪৭ সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার সপক্ষে অকাট্য যুক্তি তুলে বক্তৃতা করতে গিয়ে বলেন: ‘অসম্ভব কর্ম সমাধান করার চেষ্টা করে মূর্খ, বলদকে দোয়াবার চেষ্টা সে-ই করে যার বুদ্ধি বলদের ন্যায়’ (মুজতবা, ২০১২: ১১৪)। সেই ভাষণটি ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামে পুস্তকাকারে মুদ্রিত হয়। আরেকজন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ‘দৈনিক পূর্ব পাকিস্তান’ পত্রিকায় ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ নামে প্রবন্ধ লিখে বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গঠন করেন। ১৯৪৭-র নভেম্বরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরদানকারী লেখক-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাহিত্যবিশারদ প্রথম স্বাক্ষরকারী (আহসান, ২০১৩: পাঁচ)। সুচরিত চৌধুরী ও মাহবুব উল আলম চৌধুরী সম্পাদিত পূর্ব-পাকিস্তানে প্রকাশিত প্রথম প্রগতিশীল মাসিক সাময়িকপত্র সীমান্ত (১৯৪৭-১৯৫২)। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলমানদের অধিকার-ঐতিহ্য অন্বেষণ করে সাহিত্যবিশারদ সীমান্ত-র প্রথম বর্ষ ২য় সংখ্যায় লিখেন: ‘মানবজীবনের সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাশালী প্রেম-রূপ গুণটিকে কেন্দ্র করিয়া কাব্য-রচনা করিবার কল্পনা কেবল মুসলমান কবিগণই বাঙ্গালা ভাষাকে সর্ব প্রথম দান করিয়া গিয়াছেন’ (করিম, ২০১০: ১৪৮)। এভাবে মানবীয় প্রেমের মাহাত্ম্য কীর্তন করে একদিকে আবদুল করিম ধর্মান্ধ হিন্দু-মুসলমানকে আধুনিক মনের উদারতার ছায়ায় ডেকেছেন। আবার, বাংলা সাহিত্যে মুসলমান-অবদান আবিষ্কার করে তিনি বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট মোছন করেছেন। বাংলা ভাষা সম্পর্কে মুসলমানের হীনম্মন্যতা যেমন দূর করেছেন তেমনি তিনি হিন্দুদের বাংলা ভাষার প্রতি একক আধিপত্যের দর্পচূর্ণ করেছেন। একই সাথে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি অসাম্প্রদায়িক রূপ দাঁড় করানোর সমাজভাষাতাত্তি¡ক দায়িত্ব পালন করেছেন অসীম আন্তরিকতার সাথে।
ভাষাচিন্তক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের বিরোধী ভাষাচিন্তার লোকও ছিল বাংলাদেশে এবং এখনও আছে বৈকি। অপ্রিয় হলেও সত্য তাঁর স্বপ্ন-মাতৃভাষাকে শিক্ষার বাহন করা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় শিক্ষাদান-আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। আবার অনেক ভাষাচিন্তা আলোর মুখ দেখেছে তাঁর সমকালে; আন্দোলন গড়ে ওঠেছে, জাতীয়তাবাদী চেতনা জেগেছে। কিন্তু সে-চেতনার জোয়ার আমরা ধরে রাখতে পারিনি। হয়তো প্রকৃতির নিয়মে চেতনা-স্রোতেও জোয়ার-ভাটা আছে। আবার হতে পারে আবদুল করিমের অগ্রসর ভাষাচিন্তা ধারণে আমরা আজও প্রস্তুত নই। অনুমান করা যায় একারণেই হয়তো আজহারউদ্দিন খান তাঁর লিখিত ‘সাহিত্যবিশারদ জীবনী’র নাম রেখেছেন ‘মাঘ নিশিথের কোকিল’। মাঘ-নিশিথে আমরা তাঁর ভাষাচিন্তা পাঠ করি আর ভাবি অচিরেই বসন্ত আসবে। শিমুল-পলাশ ফুটবে আর বাংলা ভাষা সসম্মানে সর্বস্তরে প্রচলিত হবেÑবাংলার জয় হবে। মুখে জয় বাংলা স্লোগান দিলেও আজ আমরা লোকভাষাকে ভাবি সাধারণের-আমজনতার, আঞ্চলিক ভাষাকে ভাবি গেঁয়ো, বাংলা ভাষাকে বলি দেশি ভাষা। আর ‘অসাধারণ’ আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে ইংরেজি শিখিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক রূপে গড়তে সর্বস্ব বিনিয়োগ করে ওদের শিকড় বিহীন করতে ব্যস্ত। আরেক দল পরকালের পরিতৃপ্তির লোভে প্রজন্মকে ধর্মীয় ভাষা শেখানোর অপপ্রয়াসে অধীর আগ্রহী। এমন বাস্তবতায় ভাষাচিন্তক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ আমাদের অনন্য আশ্রয়। তাঁর ভাষাচিন্তার উৎস-দেশপ্রেম থেকে জাত বাঙালি জাতীয়তাবাদ-ই আমাদের বিশল্যকরণীর ভ‚মিকা পালন করতে পারবে। সর্বোপরি, জাতীয় জীবনের জ্ঞান-বিজ্ঞান বিকাশের ধারায় সাহিত্যবিশারদের ভাষা-ভাবনা ও জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক জীবনদর্শন বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষিত হয়ে সংযোজিত হতে পারবে।