ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ব্যাপক যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা নেই

3

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খাঁন ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসন জারি করেছিলেন। সামরিক শাসক হিসেবে অল্প কিছুদিন ক্ষমতায় থাকার পর, সামরিক আইনের ঘোষণায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত হন। পরবর্তীকালেও অনেক কলাকৌশল করে সর্বমোট পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসাবে ১০ বছর ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের উভয় অংশে (পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান) তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র গণ আন্দোলনের কারণে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তদানীন্তন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খাঁনের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। আইয়ুব খাঁন তদানীন্তন জেনারেলদের চাইতে অনেক মেধাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতের বিখ্যাত ‘আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের’ মেধাবী ছাত্র। যাই হউক, তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর, ২৬ মার্চ ১৯৬৯ সালে তাঁকে দেওয়া বিদায় সম্বর্ধনায় বক্তৃতা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘I don’t know if in our political life, we will have a good man for a long time. If nothing else, I have hold this country together for 10 years, It was like keeping a number of frogs in one basket. The East Pakistan will last a few years and the west Pakistan will drag on, just drag on.’ অর্থাৎ আমি জানি না আমাদের রাজনৈতিক জীবনে একটি ভালো মানুষ দীর্ঘ সময়ের জন্য পাবো কিনা? আর কিছু না করতে পারি গত ১০ বছর ধরে আমি এই দেশকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছি, ইহা ছিল একটি ঝুঁড়িতে কিছু ব্যাঙ রাখার মতো, পূর্ব পাকিস্তান সামান্য কয়েক বছর টিকবে আর পশ্চিম পাকিস্তান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খাঁন যখন ঐসব বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন ও কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা প্রকাশ্যে বলা হয় নাই। যাই হউক, পাকিস্তানের রাজনীতির মূল চালিকা শক্তিই ছিল ‘ভারত বিরোধিতা’। বিভিন্ন জনসভায় বক্তারা এমনভাবে উপস্থাপন করত, আমরা ছোটরা ও ভারতের নাম শুনলেই আমাদের গাঁ শিউরে উঠত। আসলে দীর্ঘ ২৬ বছরের সেনা শাসনে পাকিস্তান কোনভাবে উপকৃত হয়েছে বলে প্রমাণ করা যাবে না। প্রত্যেক সেনাশাসন পাকিস্তানকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করেছে। সামরিক শাসন আমলে অনবরত সেনাশাসনের ফলে সেনাবাহিনী এবং আমলারা ছাড়া সত্যিকার অর্থে অন্য কোন শ্রেণীর লোক উপকৃত হতে দেখা যায় নাই।
আবার আইয়ুব খাঁন থেকে জেনারেল মোশারফ পর্যন্ত প্রত্যেক সামরিক নায়কও অবমাননা এবং অপদস্থ হয়ে ক্ষমতা ত্যাগ করতে হয়েছে। কিন্তু এরপরও পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী নিজেদেরকে পাকিস্তানের অভিভাবক মনে করে। শুধু তাই নয় তারা নিজেদেরকে পাকিস্তানের আদর্শ এবং ইসলামের অভিভাবক মনে করে, ইহার ফলে শুধু পাকিস্তান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, ইসলামের ভাবমূর্তিও অমুসলমানদের কাছে নষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র বাহিনী দেশের শাসন ক্ষমতায় শীর্ষস্থানে থাকার ফলে জাতীয় নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা আই.সি.আই এর হাতেই চলে গেছে। কাজেই কিছু সময়ে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসলেও, প্রকৃত রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের ভার আই.সি.আই এর হাতেই থাকে, ফলে বেসামরিক শাসনের সময় ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ সামরিক বাহিনীই করে থাকে। কাজেই পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই তিন শ্রেণীর মানুষের জন্য যেন পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। তিন শ্রেণীর মধ্যে রয়েছে (১) সশস্ত্রবাহিনী (২) আমলা শ্রেণী এবং (৩) তাঁদের অন্তরঙ্গ সঙ্গীরা। পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক শাসক জেনারেল মোশারফ নিজেই একবার বলেছিলেন পাকিস্তান তিন শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। আল্লাহ, সেনাবাহিনী, এবং আমেরিকা। অবশ্য ভারতের ব্যাপারে ও অনেক পশ্চিমা শক্তিশালী দেশগুলোর খুব একটা ভাল ধারণা ছিল না। তখনকার দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কূটনৈতিক ছিলেন জন কেনেথ গলব্রেইথ (John kenneth Galbraith) তিনি ভারত সম্পর্কে বলতে দ্বিধা করেন নাই যে, ‘India is the largest functioning anarchy in the world.’ অর্থাৎ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম চলমান/ অরাজকতা। কূটনীতির ভীষণ সমৃদ্ধশালী ভাষা, এতে কোন সন্দেহ নেই।
যাই হউক, এতদিন আমরা পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধের ব্যাপারে যেভাবে চিন্তা করতাম, দুই দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়ার পর, আগের দৃষ্টিকোণ থেকে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের ব্যাপারে চিন্তা করা কোন অবস্থাতেই সঠিক হবে না।সত্যি সত্যি দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ গুরুর আলামত দেখা গেলে বিশ্বের সমস্ত পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দেশগুলি সমস্বরে এই যুদ্ধ থামানোর জন্য মাঠে নেমে যাবে।কারণ আণবিক অস্ত্র সমাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রের পার্থক্য বুঝবে না। সমানে উভয়কে ধরাশায়ী করবে। সাথে সাথে বিশ্বের অন্যান্য দেশও বায়ু দূষণের ফলে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত শতাব্দীর ষাট দশকের প্রথম দিকে তদানীন্তন সোভিয়েত রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নিকিতা ক্রুশ্চেভ তিনি তখন বলেছিলেন, ‘There are those who don’t seem able to get into their heads that in the next war, victor will be barely distinguishable from the vanquished.A war between Soviet Union and the United States would almost certainly end in mutual defeat’. অর্থাৎ কিছু লোক আছে যাদের মাথায় আসেনা যে আগামী যুদ্ধে পরাজিত এবং বিজিতদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোন যুদ্ধ হলে উভয় দেশের পরাজয়ের মাধ্যমে এই যুদ্ধ শেষ হবে। বিংশ শতাব্দীর ষাট দশকে যদি এই অবস্থা হতে পারে, বর্তমানে এই অস্ত্রের ভয়াবহতা কত বাড়তে পারে? ভারত এবং পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র রয়েছে দুই দেশের মধ্যে বড় আকারে যুদ্ধ বন্ধ রাখার জন্য এই কথা টাই যথেষ্ট। ইহাই পরমাণু অস্ত্রের বাস্তবতা।অবশ্য দুই দেশের মধ্যে যদি একটি বা উভয়টি পাগলের দ্বারা পরিচালিত হয় তা হবে ভিন্ন কথা। কারণ বিধির বিধান রত করা সম্ভব নয়।
বিশ্বে কোন সময়ে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী হয় না। গত শতাব্দীর ষাট দশকের শেষের দিকে চীন এবং সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে সাইবেরিয়া এলাকায় তুমুল যুদ্ধ চলছিল। অথচ দুটিই সাম্যবাদী দেশ ছিল। ঠিক সে সময়ে আমেরিকা তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীনের অবিসংবাদিত নেতা মাও সেতুং এবং প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের আমন্ত্রণে চীন সফর করেছিলেন। অথচ এর অল্পসময় আগেও চীনের অবিসংবাদিত নেতা মাও সেতুং যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পেপার টাইগার’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সেই সফর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সম্পর্কের শুরু। দুই দেশের মধ্যে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়েছে। ৪০ বছরের মধ্যে চীনের অলৌকিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটল। ১৯৭৮ সালে চীনের জি.ডি.পি ছিল ১৫ হাজার কোটি ডলার। ৪০ বছর পর জি.ডি.পি ১২ লাখ কোটি ডলার। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্কে চিড় ধরে গেল। কিন্তু রাশিয়ার সাথে চীনের আবার ভাই ভাই সম্পর্ক গড়ে উঠল।কাজেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাপারে স্থায়ী বলতে কিছু নেই। হয়তো দেখবেন, পাকিস্তান একদিন ভারতের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছেন। এখন ও বিশ্বের প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্বাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা থেমে গেলেই ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
অবশ্য পাকিস্তানের একনায়কতন্ত্রের ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক বা পরিস্থিতির কারণেই হোক হোতা ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজেই। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ৩০ ডিসেম্বর ১৯৪৭ ইংরেজিতে পাকিস্তানের কেবিনেট সভায় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যাতে ছিল, That no question of policy or principal would be decided except a cabinet meeting presided over by Quaid-e – Azam and in the event of any difference of opinion between him and the cabinet, the decision of Quaid-e -Azam would be final and binding.. অর্থাৎ কোন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হলে মন্ত্রীপরিষদের সভায়, কায়েদে আযমকে সভাপতিত্ব করতে হবে। কায়েদে আযম এবং মন্ত্রিসভার মধ্যে নীতিগত কোন পার্থক্য দেখা দিলে কায়েদে আযমের সিদ্ধান্তই বলবৎ থাকবে। ইঁদুর ও বিড়ালের মধ্যে যে পার্থক্য, জিন্নাহ সাহেব এবং তাঁর ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের মধ্যে এর চাইতেও বেশি পার্থক্য ছিল।
লেখক: কলামিস্ট