ভারতের কেরালা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মি: পিনারাই ভিজায়ান ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার এখনই সময়

80

ভারতের কেরালা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মি: পিনারাই ভিজায়ান ভারতের প্রখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকায় উপরোল্লিত নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন যার অনুবাদ নিম্নে দেওয়া হলো। উপরোক্ত লেখাটি অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ বলে মনে হওয়াতে পূর্বদেশের এবং বাংলাদেশের পাঠকের জন্য অনুবাদ করা প্রয়োজন মনে হয়েছে । ‘২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল যা সম্প্রতি ভারতীয় লোকসভায় এবং রাজ্যসভায় অনুমোদিত হয়েছে তা তিনটি কারণে ভারতবাসীকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। প্রথমঃ কারণ হলো এই আইন ভারতের শাসনতন্ত্রের মূলনীতি এবং আদর্শের পরিপন্থী। দ্বিতীয়ঃ কারণ হলো এই আইন বিবাদ বিভাজন সৃষ্টিকারী এবং মানবাধিকার লঙঘনকারী, তৃতীয়ঃ ইহা হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক দর্শনের উপর ভিত্তি করে ভারতের রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদ এবং শাসনতন্ত্রে হিন্দুত্ববাদ কায়েমের একটি মহা বিপজ্জনক প্রয়াস। কাজেই কোন ভারতীয় যার ভারতীয় গণতন্ত্রের উপর অকৃত্রিম ভালবাসা ও বিশ্বাস রয়েছে এই সর্বনাশা ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারেন না।
চলুন, উপরোল্লিখিত তিনটি বিষয়ে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি । প্রথম হলো বর্তমান নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন আমাদের শাসনতন্ত্রের মৌলিক আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক। আমাদের শাসনতন্ত্রে ৫ থেকে ১৩ ধারা পর্যন্ত নাগরিকত্বের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে এবং ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইনের ধারা অনুযায়ী নাগরিকত্বের ভিত্তি হলো জন্মগত, বংশধর রূপে উদ্ভব, নাগরিক হিসাবে নিবন্ধনভুক্ত করা, কোন ভূমি রাষ্ট্রের দখলে আসার পর সেখানকার অধিবাসী। বর্তমানে সংশোধিত নাগরিক আইনে নতুন শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার পর সংশোধনীটির দ্বারা শাসনতন্ত্র লঙ্ঘিত হয়েছে। অথচ শাসনতন্ত্রের ১৪ বিধিতে বলা হয়েছে শাসনতন্ত্র কোন নাগরিককে আইনের সাম্যতা বঞ্চিত করবেনা। শাসনতন্ত্রের ১৪ ধারা শুধু নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, ইহা সমভাবে যারাই ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করেছে সে অধিকার তারাও পাবেন।
শাসনতন্ত্রের আত্মা তথা শাসনতান্ত্রিক উদ্দীপনা বলতে আমরা কি বুঝি? ভারতের স্বাধীনতার স্থাপতিরা শাসনতন্ত্র রচনার সময় দীর্ঘদিনব্যাপী লোকসভায় নতুন শাসনতন্ত্রের উপর জ্ঞানগর্ব আলোচনা করেছিলেন । এই আলোচনায় সবচাইতে বেশি অবদান রেখেছিলেন বাবা সাহেব আম্বেদকার। এছাড়াও লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতার সংগ্রামীদের আপোসহীন আন্দোলনের ফলস্বরূপ এই শাসনতন্ত্র বাস্তবে রূপ লাভ করেছে । ইহা ছাড়া লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী এবং কৃষিজীবী উপনিবেশ শক্তির বিরুদ্ধে আপোসহীন আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এবং সাথে সাথে তাদের স্বপ্ন ছিল অর্থনৈতিক সাম্য গড়ে তোলা। বস্তুত এই সংগ্রামের লক্ষ শুধু বিদেশি শাসকদের উৎখাত করা ছিল না। এই সংগ্রামের লক্ষ ছিল ব্যাপকভিত্তিক। আধুনিক ভারতের ইতিহাসের এই আলোক বর্তিকাদের সংগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার কায়েম করা । একটি গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র যাতে মানুষে মানুষে বিভেদ ,পক্ষপাত এবং বিভিন্ন বৈষম্য চিরতরে বিদায় নেবে ।
যদিও শাসনতন্ত্র রচিত হওয়ার পর সম্পূর্ণ নাগরিক মুক্তি এবং সামাজিক সমতা এখনও ফিরে আসেনি তবুও শাসনতন্ত্র আমাদের জাতির পথনির্দেশিকা হিসাবে বহুত্যাগের বিনিময়ে আমরা লাভ করেছি। আমাদের স্বাধীনতার অগ্রদূতেরা সব সময় সজাগ ছিলেন যে, তাদের এই সংগ্রামের ফলে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে যা হবে জাতহীন, বর্ণহীন ধর্মনিরপেক্ষ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণমুক্ত। ১৯৩১ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত ভারভীয় কংগ্রেস পার্টির সম্মেলনে বাক স্বাধীনতা, জনসভার স্বাধীনতা এবং আইনের সবার সমতাসহ মানবাধিকার সংক্রান্ত সব বিষয়ে স্বাধীনতা দেওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রস্তাবালী গ্রহণ করা হয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অনেক ভারতের দেশীয় রাজ্যও অংশগ্রহণ করেছিল।
আমাদের স্বাধীনতার স্থপতিরা স্বপ্ন দেখেছিলেন ভারত সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত থাকবে। অথচ আজকে আমাদের শাসনতন্ত্রের সর্ব অংশ আক্রান্ত হচ্ছে যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সামাজিক সাম্যতা, ভারতের ফেডারেশন রূপরেখা ইত্যাদি লিপিবদ্ধ রয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় যেসব শ্রেণির মানুষ ঐসব আদর্শগুলির উপর আক্রমণ করছে তাদের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কোন অবদান নেই। ‘হিন্দুত্ববাদের’ অগ্রদূতেরা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। শতবার তা অস্বীকার করলেও বীরত্বপূর্ণ সে অতীত তারা অস্বীকার করতে পারবেনা বা মুছে ফেলা যাবেনা। আমাদের দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয় হলো নাগরিক আইন, এই আইন বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী, অসাম্যমূলক এবং মানবিক অধিকার লংঘনকারী একটি আইন। আমি আগেও বলেছি আমাদের জাতীয় ঐক্য সংগ্রামে ও আন্দোলনের মাধ্যমে এসেছে। বর্তমানে নাগরিক আইনের সংশোধনী আমাদের জাতীয় ঐক্য ধ্বংস হওয়ার অনেক কারণের মধ্যে একটি কারণ। অতি কষ্টে গড়া শাসনতন্ত্র আমরা আমাদের সামাজিক পার্থক্য এবং আমাদের ব্যক্তিগত পর্যায়ের কথা আমরা অকপটে স্বীকার করেছি এবং বৈচিত্রের মধ্যে আমাদের ঐক্যের কথা আমরা মেনে নিয়েছি।
নাগরিক সংশোধনী আর কিছু নয়। ইহা সাম্প্রদায়িক পার্থক্য আরও গভীরভাবে সৃষ্টি করে দেওয়ার আর একটি নোংরা প্রয়াস। এই আইন আফগানিস্তান, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান থেকে হিন্দু, শিক, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সী এবং খ্রিষ্টানদের যারা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভারতে প্রবেশ করেছে তাঁরা ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হবেন। তবে এ সময়ের মধ্যে উপরোল্লিখিত দেশগুলি থেকে কোন মুসলমান আসলে তাদেরকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবেনা। সেক্ষেত্রে তাদেরকে স্ব স্ব দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এতে ভারতীয় শাসনতন্ত্রের মৌলিক আদর্শ ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ অস্বীকার করা হয়েছে। যা ভারতীয় শাসনতন্ত্রের অবমাননা। ভারতীয় স্বাধীনতার স্থপতিদের অনেক গবেষণা এবং দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ছাড়া ভারতের ঐক্য কিছুতেই টিকিয়ে রাখা যাবেনা।
ভারতের জনতা রাজ্যে সংশোধিত নাগরিক আইনের বিরুদ্ধে অগনিত জনতা রাস্তায় আন্দোলনে নেমে পড়েছে। তাঁদের মতে এই আইন বৈষম্যমূলক, মানবিক অধিকার হরণকারী এবং ভারতকে এই আইন বহুভাগে বিভক্ত করে ছাড়বে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নাগরিক সংশোধনী আইন বাতিলের আন্দোলনে সবচাইতে বেশি অংশগ্রহণ করেছে ভারতের প্রায় বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা। যদিও ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তাদের সহযোগী দলগুলি অতি সহজেই পার্লামেন্টের উভয় হাউজে এই আইন অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু এই আইনের সংশোধনের বিরুদ্ধে সমগ্র ভারতের যুব-সমাজের বিশেষ করে ছাত্রসমাজ বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ের মতো মাঠে নেমেছে। ধর্মীয় ভিত্তিতে ভারত বিভক্তির বিরুদ্ধে। তারা ঘোষণা দিয়েছেন বিবাদ সৃষ্টিকারী এবং মানবতা বিরোধী এই আইন তারা কিছুতেই মেনে নেবেন না। আমাদের শেষ বক্তব্য হলো ভারতীয় জনতা পার্টি এই আইন পাস করে ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। ইহাই হলো বি.জে.পি. এবং আর.এস.এস. এর লক্ষ্য। আমরা আগে বলেছি স্বাধীনতা আন্দোলনে আর.এস.এস. এর কোন অবদান ছিলনা। এই সময়ে তাদের নেতা আমে.এস.গোলওয়াকার ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, যেখানে অন্যকোন ধর্মাবলম্বীদের বসবাসের অধিকার থাকবেনা। নাগরিক সংশোধনী আইনই হলো বি.জে.পি’র ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতি আঘাত।
কেরালার বৈশিষ্ট্য
সামাজিক সাম্য এবং ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য কেরালার সংগ্রাম থেকে আমাদের অনেক কিছুই শিক্ষা গ্রহণ করার রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে কেরালার সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক শক্তি এবং পরবর্তীকালে বামপন্থীদের এবং অন্যান্য প্রগতিবাদী সামাজিক শক্তিগুলি সামাজিক অসাম্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সর্বকালে সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। আজকে কেরালার সমন্ত রাজনৈতিক সর্বকালে সংগ্রামে চালিয়ে গেছে। আজকে কেরালার সমস্ত রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক সংগঠনগুলি একমাত্র হিন্দুত্ববাদী শক্তিছাড়া সবাই একতাবদ্ধ হয়ে ভারতীয় শাসনতন্ত্রের মূল্যবোধগুলি, মৌলিক মানবিক অধিকারগুলি রক্ষার জন্য একত্র হয়ে সংগ্রামে নেমেছে। আমরা গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা উপর জঘন্য হামলার বিরুদ্ধে আমাদের তুমুল অবরোধ এবং আন্দোলন বন্ধ করতে পারিনা। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করার এখনই সময়।
লেখক : কলামিস্ট