ভরা বর্ষার রাতে

15

মো. আরিফুল হাসান

বিকেল থেকেই বৃষ্টি। রাতের নীরবতা পেয়ে তা আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে বসেছে। থামার নাম নেই। কুপিটাতেও তেল ফুরিয়ে এসেছে। ঘরের এককোণে তিনটা মালসা থইথই, আরেক কোণে ট্যাপ খাওয়া বলটা টুবু টুবু হয়ে উপচে পড়ছে জল। চালটা এ বছর ছাউনি দেয়া হয়নি। দিবে কে? নেওয়াজের বাবা গত শীতে চোখ মুদলেন। চোখের সামনে জ্বলজ্যান্ত মানুষটা তড়পাতে তড়পাতে মারা গেলো। লোকে বললো সাপে কেটেছে। আইড়ার বনে লাকড়ি কাটতে গিয়ে ঘুমন্ত সাপকে জাগিয়ে তুলেছে লাহু। লাহু মুন্সি সেই কালসাপের কামড়ে মারা গেছে। সারা গা কালো হয়ে গিয়েছিল তার। মুখ দিয়ে বেরুচ্ছিলো ফেনা। যেনো জবাই দেওয়া রাতা মোরগের মতো উঠানের এপাশ থেকে ওপাশে গড়াগড়ি খায়। বেশি সময় না, বাড়িতে আনার পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যেই দেহটা শক্ত হয়ে আসে। উঠানে লাশকে ঘিরে ভির জমে। কেউ কেউ বলে ওঝা কবিরাজ ডাকো, সাপে কাটা রুগির রুহ্ আটকে থাকে; ছয় মাস পরেও ভালো হয় শুনছি। কেউ বলে ডেকে আর লাভ কী?মুরব্বিরা প্রাজ্ঞ-জীবনের মন্ত্রবলে বুঝে নেয়, ডেকে আর লাভ নেই। তবুও ওঝা আসে, কিন্তু সাপে কাটা রোগীর কাছে সে আসে না। দূর থেকে গাড় হয়ে প্রণাম করে অদেখা সাপটির উদ্দেশ্যে। তারপর বলে, কালনাগে খাইছে; এই বিষ হজম করার শক্তি আমার বিদ্যায় নাই। লোকেরা অনুরোধ করে, একবার সাপটিকে যদি আনতেন। হা হা করে উঠে ওঝা, এই সাধ্য আমার বাপেরও নাই। একবার যদি এই সাপ গর্ত থেকে মুখ তুলে, বিষে পুরা গাঁ ছেয়ে যাবে। একটি মানুষও বাঁচবে না এ গাঁয়ের। গাঁয়ের লোকেরা ভয় পায়, আবার সন্দেহ জাগে। এমন যদি সাপের বিষ তাহলে লাহু মুন্সিকে কাটলো ক্যামনে? হয়তো লাহু মুন্সি খয়রাত পাখির বাচ্চা চুরি করার জন্য গর্তের ভেতর হাত দিয়েছিলো। তার বাহুতে মাটির দাগ নিরীক্ষু করে কেউ কেউ। কিন্তু কাটা মোরগের মতো তড়পানোর ফলে তার সারা দেহেই চাট চাট মাটি লেগে আছে। কোনটি গর্তের মুখের মাটি তা আর এখন আলাদা করে চিনে নেওয়া অসম্ভব। তবুও মুরব্বিরা মাথা নাড়ে। হুম, লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু। লাকড়ি কাটবি কাট, খয়রাত পাখির বাচ্চা চুরি করার জন্য হাত দিবি ক্যান? হ্যাঁ, খয়রাত পাখির বাচ্চা চুরি করবো! নে এইবার জনমের মতো খয়রাত পাখির মাংস খা।
তবুও মাটি দেয় না এ লাশ। গ্রামবাসীরা আশায় থাকে হয়তো নেওয়াজের মতো দুধের শিশুটির কথা চিন্তা করে কালনাগ নিজের বিষ ফিরিয়ে নিলেও নিতে পারে। তারা আল্লা-খোদার নাম নেয়, লাশ পাহারা দেয়। একরাত, দুইরাত তিনরাতের পর লাশ ফুলে উঠে। তবুও শীতকাল বলে তিনরাত রাখতে পেরেছে। মুরব্বিরা আর দেরি করে না। বাঁশ কেটে, কবর খুড়ে লাহু মুন্সিকে মাটি দেয়। বড় একা হয়ে পড়ে নেওয়াজের মা। তিনবছরের শিশুটিকে নিয়ে এখন কোথায় যাবে, কোনদিকে যাবে সে? বিয়ের এতোবছর পর একটা বাচ্চা সন্তান আসলো পৃথিবীতে। সেই বাবুটাকে মাসুম রেখেই পরপাড়ে পাড়ি জমালো লোকটা। তার অভিমান হতে থাকে লাহুর উপর। কি দরকার ছিলো খয়রাত পাখির গর্তে হাত দেয়ার? কে-ই বা বলেছে তাকে মাংস এনে খাওয়াক? ভালোই তো বেঁচে ছিলাম ফেনে-ভাতে। এখন এই মানুষটা যে চলে গেলো আমার এখন অবলম্বন কি! হাহাকার করে উঠে সে। রাত্রি যায় চোখের পাতা এক হয় না।
ফুলচানের বিয়ে হয়েছিলো ভাদ্রমাসে। এমনই ভরাবাদল ছিলো সে রাতে। ফুলচান মেঘের শব্দে নিজের অস্তিত্বের ভেতর অন্য কারো ডুব দেয়া আবিষ্কার করে লজ্জারাঙা হয়ে। লাহু মুন্সি দু’শো টাকা গুঁজে দেয় বধুয়ার হাতে। বাকিটা মাফসাফ, হেসে বলে নববর। ফুলচান নিঃশব্দে হেসে স্বামীর মাথাটা কোলের উপর নিয়ে বলে, আমার কোনো দাবিদাওয়া নেই। আপনিই আমার পরম পাওয়া। অঝোর বর্ষা রাতে আবেগে, সোহাগে দু’জন কেঁপেছিল। ভিজেছিল প্রেমের ঝর্ণাধারায়। কিন্তু সে রাতের কোনো ফসল ফলেনি। একমাস যায়, দুই মাস যায় একবছর যায় ফুলচান ফলবতী হয়ে উঠে না। লাহু মুন্সির বয়োবৃদ্ধ অন্ধ বাবা বাঁজা নারীকে পরিত্যাগ করতে পুত্রকে বলে।কিন্তু সে ফুলচানের মায়ায় পড়ে যায়। নিঃসন্তান সাতটি বছর কাটালেও অবশেষে তার অপেক্ষার শেষ হয়। চাঁদের মতো টুকটুকে পুত্রটির নাম নাখে নিজের দাদার নামে নবী নেওয়াজ। কিন্তু লাহুর বাবা নাতীর চাঁদমুখ দেকে যেতে পারে না। দু বছর আগে ক্লান্তবৃদ্ধ চোখ মুদেন।
লাহু মুন্সি মারা যাবার পর ফুলচান তুজু সিকদারের ধানের মিলে কাজ নেয়। তুজু সিকদার মানুষ বেশি ভালো না। নিজে তিনটা বিয়ে করেছে আবার মিলের নারী শ্রমিকদের প্রতিও লোলুপ দৃষ্টি তার। এ কথা সবাই জানে, জেনে মেনেই তার কারখানায় কাজে যায়। না গিয়ে উপায় নাই, গ্রামের অনাহারী অভাবী মানুষদের শেষ আশ্রয় তুজু সিকদারের কল।
ফুলচানকে যে কাজটি পাইয়ে দেয় সেই রহিমার মা নিজে বলেছে, এতো লজ্জা শরম রাখলে না খেয়ে মরবি। একটু ঢলাঢলি, একটু হাসিমুখে কথা বলা দোষের কিছু নয়। পেট ধর্মই বড় ধর্ম। ক্ষুধার কাছে জাত কুল মান সবই মাটি। কেউ কি দিয়ে যাবে একমুঠো ভাত, যখন তোমার হাড়িতে ঘুঘু চড়বে? কেউ কি দিয়ে যাবে পথ্যি ওষুধ, যখন তোমার সন্তান কালাজ্বরে ভোগে মরবে? না, কেউ দিবে না। এই দুনিয়ায়, কার গোঁয়ালে কে ধোঁয়া দেয়? সবাই নিজেরটা নিয়ে পাগল। সেখানে জান বাজানোর জন্য একটু আধটু পাপ পথে তো যেতেই হয়।
ফুলচান মুখ বুঁজে মেনে নিয়েছে। বাপের বাড়িতে কেউ নেই; তাই না মেনেও কোনো উপায় করতে পারতো না সে। উপরন্তু প্রতিবেশীদের চক্রান্তে ভিটেটি ছাড়তে হতো তাকে। না সে এ কাজ করতে পারে না। নেওয়াজকে সে পৈত্রিক মাটির দুধগন্ধ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। ফলে, বয়েস আটাশ হলেও ফুলচান আর বিয়ে করার নামনিতে পারে না।
তুজু সিকদারের কলে কাজ করে দু’মুঠো অন্নের সংস্থান হয়েছে। সকাল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত মিলে কাজ করতে হয়। কতো রকম কাজ! ধান সিদ্ধ করো, রোদে শুকাও, চিটা ঝাড়ো, বস্তাবন্দি করো, তারপর আছে করার ভাঙ্গানির কাজ। ভাঙ্গানি শেষ হয়ে গেলে আবার ঝেড়ে তুষ আলাদা করো, তারপর ক্ষুদ আলাদা করো, চাল-ক্ষুদ-তুষ-কুড়া আল্লাদা আলাদা বস্তাবন্দি করো। কতো রকম কাজ, কাজের যেনো শেষ নেই। সারাদিন দরদর করে ঘাম ঝড়ে দেহে। ফুলচানের তেলচিটা পড়া খয়েরী রঙের বøাউজটা শরীরের সাথে লেপ্টে যায়। দুধে আলতা গায়ের বরণ রোদে পোড়ে তামাটে হয়ে যায়। তবু ফুলচান কাজ করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মিলেই অন্য নারী শ্রমিকদের বাচ্চাদের সাথে খেলতে থাকা নেওয়াজকে খাওয়ায়, একপশলা আদর ছুঁড়ে দেয়। নেওয়াজই আবার কখনো কখনো কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে মায়ের কাছে ঘেঁষে। ফুলচান আদর করে সন্তানের কপালে চুমু খায়।
তুজু সিকদার এদিক দিয়ে মানুষটা ভালো। পোলা-মাইয়ার যতœ-আত্তিতে মায়েরা কতটা সময় ব্যায় করলো সে বিষয়ে তার কোনো খবরদারি নেই। মিলের শ্রমিকরা এমনিতেই অনেক কাজ করে। সবচেয়ে বেশি করে উত্তর পাড়ার যুবতী সুফিয়া। সবাই বলে, মালিকের মন পাইতে চায়। কিন্তু সুফিয়ার একচোখ ট্যাঁরা, গায়ের রঙটাও কেমন গাব কষের মতো কালো। তুজু সিকদার ওর দিকে ঝুঁকে না। সন্ধ্যার সময় সব নারীরা মজুরি নিতে এলে তুজু সিকদার ফুলচানের সাথে একটু বেশি সময় কথা বলে। যেচে যেচে ঘরের অবস্থা, কিভাবে চলছে কি আশয় বিষয়, নেওয়াজের শরীরের অবস্থা জানতে চায় সে। ফুলচান প্রফুল্ল মুখে জবাব দেয়। কখনো কখনো তুজু সিকদার নেওয়াজের হাতে গুঁজে দেয় চার আনা পয়সার চারটা পাইনআপেল চকলেট। নেওয়াজ গদগদ হয়। ফুলচান উচ্ছ্বসিত সন্তানের চোখের উজ্জ্বলতার দিকে চেয়ে কৃতজ্ঞতা জানায় মনে মনে মহাজনের প্রতি। তখন তার দৃষ্টিতেও হয়তো প্রশ্রয়ের একটা ইঙ্গিত থাকে। তুজু সিকদার মজুরি দেবার সময় চেপে ধরে ফুলজানের হাত -ভালো মন্দ আমাকে জানিও।
আজ বিকেল থেকে মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বর্ষাকালে ধানের মিলে কাজ একটু কম থাকায় শ্রমিকরা সন্ধ্যার আগে আগেই বাড়িতে ফিরতে পারে। ফুলচানও হাতের কাজ শেষ করে টিউবওয়েলে হাতমুখ ধুয়। ঘামে ভেজা আঁচলটা দিয়ে বুকের পিঠের ঘাম মুছে। তার অন্যান্য কর্মসখীরা মহাজনের কাছে চলে গেছে। হয়তো দুয়েকজন মাইনে নিয়েও চলে গেছে। নেওয়াজ তুষের মধ্যে খেলতে গিয়ে সারা শরীর তুষ-কুড়ায় মাখামাখি করে ফেলেছে। ফুলচান নেওয়াজকে টেনে নিয়ে কলপাড়ে গা ধোয়ায়। ফিনফিনে আঁচলটা দিয়ে গা মুছে। এই ফাঁকে তার আরও কিছু সময় অতিবাহিত হয়। পুবের আকাশে একটা ¤øান চাদ সন্ধ্যামেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে হয়তো। অঝোর বৃষ্টিটা নেই, টিপটিপ বৃষ্টিপৃষ্ঠার আড়ালে ওই পূর্বকোনটা কেমন ফকফকা লাগে যেনো। ফুলচান হাঁক দেয়, রহিমার মা কি আছে না চলে গেছে! কোনো উত্তর আসে না। ফুলচান বুঝে, সবাই চলে গেছে তাকে ছেড়ে। আসলে বৃষ্টির দিন, একটি নিবিড় পেলেই সবাই হুড়মুড় করে ছুটে। বলা তো যায় না, বর্ষার বৃষ্টি, কখন আবার বাঁধ ভেঙে ঝরতে শুরু করে। ফুলচান নেওয়াজকে কোলে নিয়ে মহাজনের কক্ষের দিকে যেতে থাকে।
মহাজন তুজু সিকদার একটা ছাল উঠা ফোমের চেয়ারে সামনের ময়লা ক্যাশবাক্সের উপর খাতা খুলে বসে আছে। একটা নামের উপর তার চোখ দুটো ঝুলে আছে। ফুলচান এখনো আসেনি কেনো কে জানে। একবার মনে হয় এখান থেকে বের হয়ে মিলঘরে দেখে আসে। আবার মনে হয় না, তার দরকার নেই; ফুলচান হয়তো এই এক্ষুনি এসে পড়বে। ভাবনার দ্বিতীয় ভাবনাটা সত্যি হয়ে বাইরে ফুলচানের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। একটু নড়েচড়ে বসে তুজু সিকদার। ফুলচান আজ এতো দেরি করলো কেনো? সেকি ইচ্ছে করেই সবার শেষে একা একা এসেছে? কিছু কি বলতে চায় ফুলচান? আওরাতটার আচার আচরণ কেমন যেনো প্রশ্রয়ে ভরপুর! টানটান হয়ে উঠে তুজু সিকদারের দেহ। আহা, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, ফুলচান আসছে, আমার ফুলচান।
গলা খাকারি দিয়ে ফুলচান দুচালা টিনের ছোট্ট ঘরটাতে ঢুকে। নেওয়াজ কোলে উঠে ফুলচানের বুকের কাপড়টা টেনে ধরে আছে। এতে করে ফুলচানের বক্ষসন্ধির উর্বর প্রান্তটুকুফুটে উঠেছে। তুজু শিকদারের চোখ প্রথমেই সেদিকে পড়ে। গলায় একটা কোমল প্রেম-প্রেম স্বরে তুজু শিকদার আহ্বান করে, আসো লাহুর বৌ, আসো। ফুলচান কাছে এসে দাঁড়ায়। মহাজন খাতা খুলে ফুলচানের নামের পাশে টিকচিহ্ন দেয়। আজ যে তোমার দেরি হলো। ফুলচান কারন বর্ণনা করে। ইচ্ছে করেই সংক্ষিপ্ত কথাকে লম্বা করে। ছেলের তুষকুড়ায় মাখামাখির গল্পটা বলার সময় ফুলচান যেনো হেসে হেসে ঢলে ঢলে পড়ে। আমোদিত হয় তুজু সিকদার। ক্যাশবাক্সের ঢালা খুলে একটি দশটাকার নোট নেওয়াজের হাতে গুঁজে দেয়। দেয়ার সময় তর্জনী আঙুলটা ইচ্ছে করেই ছোঁয়ায় ফুলচানের বক্ষফলের মিলন স্থলে। কেমন যেনো মৃদু কাঁপন উঠে ফুলচানের দেহে। তুজু সিকদারের শিকারী আঙুল সে কম্পন অনুভব করতে ভুল করে না। নিজের চেয়ারে ফিরে না গিয়ে আরেকটু চেপে দাঁড়ায় ফুলচানের উষ্ণতায়। কামুক অথচ অধির নয় এমন কণ্ঠে বলে, একা একা থাকতে ভয় করে না ফুলচান? কপালে থাকলে খন্ডানোর উপায় কী?-উত্তর করে ফুলচান। ফুলচানের গলাটা কেমন যেনো অচঞ্চল, পাথরের মতো ধীর মনে হয়। সে যায়গা থেকে সরে না। খেটে খাওয়া দেহটা শক্ত হয়ে মাটির সাথে লেগে থাকে। তোমার জন্য মায়া লাগে, আরেকটু কাছে ঘেষে বলে তুজু সিকদার। আমার ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে। আপনার মায়া লাগলে লাভ কী?
মালসা এবং বলগুলো জলে ভরে উঠলে ফুলচান দরজা ফাক করে সেগুলো ঝপাৎ করে বাইরে ফেলে। আবার ভরে উঠলে আবারও ফেলে। এভাবে রাত বাড়তে থাকলে ফুলচানের ঘুমও কোথায় যেনো চলে যায়। তার কেনো যেনো মনে হতে থাকে মহাজন আজ আসবে। সন্ধ্যায় তার যে ভাবগতি দেখা গেছে তাতে মানুষটা আজ না এসে পারে না। সে যখন বলেছে আমার চাল দিয়ে পানি পড়ে, আপনার মায়া দিয়ে লাভ কী? তুজু সিকদার কেমন যেনো ভিরমি খায়। তারপর সমব্যথী হয়ে পড়ে। একসময় এতোটাই কোমল হয়ে যায় যে হন্তদন্ত হয়ে নিজের ক্যাশবাক্স খুলে ফুলচানের পাওনাটা প্রদান করে এবং ফুলচানকে তাড়া দেয় তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যেতে। বাদলের ধারা যেকোনো সময়ই শুরু হয়ে যেতে পারে। তুজু সিকদার নিজের তিনব্যাটারি টর্চলাইটটি ফুলচানের হাতে গুঁজে দিয়ে বলে, রাস্তায় সাপখোপ থাকতে পারে, সাবধানে যেনো সে বাড়ি ফিরে। সেই থেকে একটা ঘোরের ভেতর আছে ফুলচান। রাতে ঠিকমতো গলা দিয়ে ভাত নামতে পারেনি। একটা উৎকণ্ঠা, একটা ভয়, সাথে একটা ম্লান রোমাঞ্চ জেগে উঠে তার মনে। তারপর তার মনে হতে থাকে মহাজন আজ আসবে তার কাছে। কেনো মনে হয় জানা নেই, কিন্তু মন বলছে আসবে, সে নিশ্চয়ই আসবে।
বাইরে বৃষ্টির শব্দের ভেতর কান পাতে ফুলচান। কার যেনো পদশব্দের অপেক্ষা করে। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি পড়ছে। বাঁশের মাচাটায় নেওয়াজ অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ফুলচান তেলচিটচিটে কাঁথাটা টেনে দেয় নাড়িছেড়া ধনটার বুকে। এক মুহুর্তে সে দেখতে পায় নেওয়াজের মুখে লাহু মুন্সির ছাপ। ওই একপলকই, তারপর আবার বৃষ্টিবিজলীর ছাপচিত্রে তা নির্মূল হয়ে মুছে যায়। এমন সময় জলের বুকে ঝপঝপ পায়ের শব্দ টের পাওয়া যায়।
কে যেনো জল ভেঙে এগিয়ে আসছে তার ভাঙাঘরের দিকে। ফুলচান বাতির আলোটা উস্কে দিয়ে তার বুকের বসনটা ছেড়ে দেয়।