ভন্ডদের মুখোশ উন্মোচিত হোক

6

কামরুল হাসান বাদল

একটি রাষ্ট্র কেমন হবে। তার চরিত্র কতটা উদার, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক হবে তা নির্ভর করে তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চরিত্রের ওপর। আমি পূর্বেও অনেকবার লিখেছি. ডাকাতের সর্দার ডাকাতই হবে, আউলিয়ার সর্দার আউলিয়া। আউলিয়া শব্দটি আমি ইতিবাচক মানুষ হিসেবে বোঝাতে চেয়েছি। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের তান্ডব তারপর তাদের নেতা মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারি এবং তার পক্ষে হেফাজতের নির্লজ্জ, বিবেকহীন পক্ষপাত দেখতে দেখতে এ কথাগুলোই বারবার চিন্তার জগতে ঘুরপাক খাচ্ছিলো। যেকোনো ধর্মের প্রথম শর্তই হচ্ছে সত্য বলা, মিথ্যাকে পরিহার করা, অন্যায়কে অন্যায় বলা। ঘটনার পর থেকে মামুনুলের মিথ্যাচার, এরপর সে মিথ্যাকে ঢাকতে গিয়ে অসংখ্য মিথ্যার জন্ম দিতে দেখে বুঝতে পারলাম হেফাজতের সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্কই নেই। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করলে এমন পরিস্থিতি হবে তা বঙ্গবন্ধু ৫০/৬০ বছর আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে একটি বৈপ্লবিক কর্ম সম্পন্ন করেছিলেন। যদিও তিনি বিপ্লবী নন, গণতন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী।
সেকুলারিজমের অর্থ ইহজাগতিকতা। এটির নানাবিধ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আছে পাশ্চাত্যে ও প্রাচ্যের দার্শনিক ও পন্ডিতদের কাছে। অনেক রাষ্ট্র বা জননেতারা ‘সেকুলারিজম’ এর নিজস্ব একটি ব্যাখ্যা, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োগ ব্যবস্থা করে নিয়েছেন। বাংলাদেশেও ‘সেকুলারিজম’কে ধারণ করা হয়েছে ‘ইহজাগতিকতা’র দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নয়, ধর্মের ব্যাপারে রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ থাকার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। অর্থাৎ রাষ্ট্র সকল ধর্মের মানুষের সমমর্যাদা নিশ্চিত করবে, ধর্মচর্চার স্বাধীনতা প্রদান করবে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এমন ব্যবস্থায় অনেকে বলে থাকেন এক্ষেত্রে আলাদা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলার প্রয়োজন নেই। কারণ গণতন্ত্রের ব্যাখ্যায় জনগণের এইসব অধিকারের কথা বলা আছে।
সা¤প্রদায়িকতার হিংস্ররূপ খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশভাগের আগে আগে বাংলা বিহার জুড়ে যে সা¤প্রদায়িক হানাহানি হয়েছিল সে সময় তিনি কলকাতার বিশিষ্ট ছাত্রনেতা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। পাকিস্তান আমলেও সংঘটিত সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে তিনি গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এর উল্লেখ আছে কয়েকবার। তাই একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর আন্তরিকতার কমতি ছিল না কখনো।
আমি আগের পর্বেও উল্লেখ করেছি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের জন্য তাঁকে জীবন দিয়ে দাম দিতে হয়েছে। এই দুই নীতির কারণে তিনি বিরোধিতায় পড়েছিলেন একদিকে মুসলিম বিশ্ব বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অগণতান্ত্রিক দেশগুলোর অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী তৎকালীন অন্যতম পরাশক্তি সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সরকারের। স্বাধীনতার পরপর একাত্তরের পরাজিত শক্তি এবং দেশের মুখচোরা, কিছু রাজনীতিক প্রচারণা চালাচ্ছিলেন এই দুই নীতির বিরুদ্ধে। তারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্রেফ ধর্মহীনতা আখ্যা দিয়ে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু ইসলামের ক্ষতি করছেন। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি যে সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া আধিপত্য খর্ব করেছিল তারাও বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল বঙ্গবন্ধুর। আর আওয়ামী লীগে খোন্দকার মোশতাকদের গ্রুপটি শুরু থেকেই ওই নীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।
এই দুই অপশক্তির ষড়যন্ত্রের কারণে নিহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৫ সালের পর ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে বাদ দিয়ে সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। সে সাথে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী ব্যক্তি ও সংগঠনের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করেছিলেন দেশে। জিয়াউর রহমান সবই বাতিল করে দিয়ে দেশে ধর্মীয় রাজনীতি অনুমোদন করেন, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে তিনি দেশের এক শ্রেণির মানুষ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে একটি বার্তা স্পষ্ট করতে চাইলেন যে, বঙ্গবন্ধু দেশকে ধর্মহীন করে তুলেছেন। তিনি তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে ইসলামকে পুনর্জাগরণের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি রাষ্ট্রে ও সরকারি বিভিন্নক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বক্তৃতা শুরু করতেন উচ্চস্বরে বিসমিল্লাহ বলে। তাঁর আমল থেকেই রাষ্ট্র ও সমাজে ধর্মীয় উন্মাদনা বৃদ্ধির কাজটি শুরু হয়।
বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেই আওয়ামী লীগকে ধর্মবিরোধী দল বলে প্রচারণা চালানো হতো। ১৯৭৫ সালের পর ঐই প্রচারণা দিনদিন বৃদ্ধি পেয়েছিল সরকারি আনুকূল্যে। জিয়ার পরে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি জেনারেল এরশাদ সংবিধান পরিবর্তন করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে গোলাম আজমের নাগরিকত্বকে বৈধতা দিয়েছিলেন। ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় এসে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদী নেতা হলেও তিনি তাঁর আন্দোলন-সংগ্রামের সময় দেশের অন্যান্য অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতেন। গত শতকের ৬০ দশকে তিনি যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে সে সময়ও তিনি কম্যুনিস্ট পার্টি (সে সময় নিষিদ্ধ) ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ইত্যাদির সাথে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি চীনপন্থী রাজনীতিকদের কঠোর সমালোচনা করতেন। এ বিষয়ে সদ্য প্রকাশিত কারাগারের রোজনামচা’য় বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বদাই মিত্র হিসেবে গণ্য করেছেন।
অনেক কিছুর জন্য ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগকে দায়ী করা হয়। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে খন্দকার মোশতাকদের একটি প্রতিক্রিয়াশীল গ্রুপ সবসময় সক্রিয় ছিল। মোশতাক সবসময় টুপি পরতেন। তাহেরউদ্দিন ঠাকুর-জায়নামাজ নিয়ে হাঁটতেন। এই অংশটিই পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জড়িত ছিল আর প্রগতিশীল ধারার তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান জীবন দিয়ে আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত ছিলেন বলে প্রমাণ দিয়ে গেছেন। আজ আওয়ামী লীগে টুপি পরা মোশতাকদের আধিক্য বেড়েছে। এরা প্রকৃত আওয়ামী লীগারদের চেয়েও বেশি আওয়ামী লীগার হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাইছেন। শুধু তাই নয় অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এখন আওয়ামী লীগের এই গ্রুপের শক্তিই বেশি।
হেফাজতকে কেন্দ্র করে বর্তমান আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে ঢেলে সাজানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মের মুখোশপরা ভন্ডদের চেহারা জাতির কাছে স্পষ্ট করতে হবে। এই ভন্ডরা নিজেদের অপকর্ম ঢাকা দিতে ধর্মকে ব্যবহার করে। ঠিক যেমন তাদের বাপ-দাদারা পাকিস্তানিদের পক্ষ নিয়ে ধর্মের নামে নারী ধর্ষণ থেকে শুরু করে গণহত্যা চালাতো। আর সে ভন্ডদের এখনও সমর্থন করেও যারা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের রাজনীতি তথা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করে তাদেরকে বের করে দেওয়া উচিত।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক