বড় ঝুঁকিতে এটিএম সেবা ব্যাংকের প্রযুক্তিগত দুর্বলতায় মূল কারণ

5

 

দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, পদ্ধতিগত ত্রুটি ও ব্যাংককর্মীদের অসততার কারণে এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন) সেবা বড় ঝুঁকিতে পড়েছে। এ সুযোগে নতুন নতুন কৌশলে মাঝেমধ্যেই ঘটছে জালিয়াতির ঘটনা। এর সঙ্গে সাইবার অপরাধীরা যেমন জড়িত, তেমনই ব্যাংককর্মী ও তথ্যপ্রযুক্তির উপকরণ ব্যবসায়ীরা সম্পৃক্ত। যৌথভাবে বহুমুখী পরিকল্পনার মাধ্যমে এরা চুরি করছে গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা। অনেক সময় এরা গ্রাহকের হিসাব ছাড়াই এটিএম মেশিন থেকে সরাসরি টাকা তুলছে, যা পরে ব্যাংকের দায় হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে। সূত্র জানায়, এ ধরনের প্রবণতা বন্ধে এবং ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারের লক্ষ্যে জাতীয় সাইবার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (সার্ট), বাংলাদেশ ব্যাংক, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এসব নিয়ে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গঠন করা হয়েছে সাইবার ইউনিট। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয়ও এ ইউনিট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। কয়েকটি ব্যাংকে ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে। ব্যাংকগুলো তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। গ্রাহকদেরও সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপরও বন্ধ হচ্ছেনা প্রতারণার মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন ও এটিম বুথ ছিনতায়ের ঘটনা। এর কারণ হিসেবে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞমহল মনে করছেন, অধিকাংশ ব্যাংকের এটিএম মেশিন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আনা হয় না। অনুমতি ছাড়া অন্য চ্যানেলে আসা মেশিনগুলোর বহুমুখী দুর্বলতা থাকে, যা এটিএম জালিয়াতির সুযোগ তৈরি করে। সূত্র জানায়, তথ্যপ্রযুক্তিগত দুর্বলতার কথা জেনে দেশীয়দের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধীদেরও বড় টার্গেট বাংলাদেশ। চক্রটি সাইবার হামলা চালিয়ে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এছাড়াও নানা ধরনের ম্যালওয়্যার ভাইরাস পাঠিয়ে হামলার চেষ্টা করেছে।
এটিএম বুথ ঝুঁকিমুক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকগুলোর সদিচ্ছার অভাবে এখনো তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। ‘সক’ (সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার) বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েক দফা তাগাদা সত্তে¡ও দু-একটি ব্যাংক ছাড়া বেশির ভাগই কার্যকর করেনি। ফলে এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে এটিএম সেবা। সূত্র জানায়, গত পাঁচ বছরে এটিএম বুথগুলোয় অন্তত ১৭টি চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দেশি-বিদেশি চক্র জড়িত ছিল। এগুলো নিয়ে সিআইডি তদন্ত করছে। এতে সিআইডি দেখেছে, জালিয়াতির কোনো একপর্যায়ে ব্যাংককর্মীদের সংশ্লিষ্টতা বা উদাসীনতা রয়েছে। স্কিমিং (কার্ডে রক্ষিত তথ্য চুরি করা), ক্লোনিং (কার্ড নকল করা) করে কার্ডের গোপন তথ্য জেনে নিচ্ছে চক্রটি। এছাড়া বুথে গোপন ক্যামেরা স্থাপন, ম্যালওয়্যার ভাইরাস ও শপিংমলে অনলাইনে (পজ মেশিন) অর্থ পরিশোধে কার্ড রিডার বসিয়েও তথ্য চুরি করছে। পরে তারা কার্ড প্রস্তুতকারক বা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সহায়তায় বিকল্প কার্ড তৈরি করে গ্রাহকের টাকা চুরি করছে। পাশাপাশি জালিয়াত চক্র সিম ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের মোবাইল ফোনে অর্থ উত্তোলনের এসএমএস বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে গ্রাহক নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে খোয়া যাওয়া অর্থের বিষয়ে থাকেন অন্ধকারে। শুক্রবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে অর্থ আত্মসাৎ ও এটিএম বুথ ছিনতাইয়ের দুটি ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়। একটি নগরীর জুবলী রোড এলাকায় তৈরি পোশাক শিল্পের বিশ্বস্ত কর্মচারি কর্তৃক দশলাখ টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে আত্মসাতের অপচেষ্টার ঘটনা অপরটি গভীর রাতে ফিরিঙ্গিবাজার এলাকার একটি এটিএম বুথ ছিন্তায়ের ঘটনা। দুটি ঘটনার সাথে জড়িতদের পুলিশ দ্রুতসময়ে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। সেইসাথে আত্মসাতের টাকার একটি বড় অংশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা যায়। পুলিশের তৎপরতা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ জনমনে স্বস্তি আনলেও এধরনের ঘটনায় ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক গ্রাহকদের মধ্যে যথেষ্ট উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, চট্টগ্রামের পুলিশ প্রশাসন দায়িত্বের সাথে তৎপরতা চালিয়ে অপরাধিদের গ্রেফতার করেছে, তা যদি সারা দেশের চিত্র হতো, তাতে ব্যবসায়ী বা ব্যাংক গ্রহকদের উৎকণ্ঠার কারণ থাকত না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতারকচক্র নানা কৌশলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড়বড় কর্পোরেট হাউসের টাকা আত্মসাৎ করছে, এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ শাখা থেকে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার উল্লেখযোগ্য প্রতিকার পাওয়া যায় নি এখনও। চেক বা প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনারোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আনি শৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতা ও নজরদারিই যথেষ্ট মনে করা হলেও এটিএম বুথের বিষয়টি পুরোটাই ব্যাংকের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও পদ্ধতিগত ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোর হতে হবে।