বৈশাখী মেলা ও জব্বারের বলীখেলা বন্ধ নয় বিকল্প স্থানে আয়োজন হোক

23

 

ঐতিহ্যবাহী লালদিঘি মাঠে ঐতিহাসিক ছয় দফার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য সরকার ২০২০ সালে ‘নগরীর লালদিঘি মাঠ সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধনের পর তা সাধারণ মানুষের জন্য উম্মুক্ত কওে দেয়ার কথা। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিসহ নানা জটিলতায় এখনও সৌন্দর্যবর্ধন ও সংস্কারকৃত মাঠটি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক উদ্বোধন করা সম্ভব হয়নি। ফলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এবারও এ মাঠটিকে ঘিরে প্রতিবছর যে বৈশাখী মেলা ও ঐতিহাসিক জব্বারের বলিখেলার আয়োজন হত, তা করা সম্ভব হচ্ছেনা। বুধবার বলীখেলার আয়োজন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আযোজিত সংবাদ সন্মেলনে এমনটি বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তাদের ভাষায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঐতিহাসিক ছয় দফার স্মৃতি সংরক্ষণে ২০২০ সালে লালদিঘি ময়দানকে ঘিরে ‘নগরীর লালদিঘি মাঠ সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করবেন। তাই মাঠটি উন্মুক্ত করা হয়নি। এ কারণে এ বছরও ঐতিহাসিক জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা আয়োজন করা যাচ্ছে না। সংবাদ সন্মেলনে আবদুল জব্বার স্মৃতি কুস্তি প্রতিযোগিতা ও মেলা কমিটির সভাপতি চসিক কাউন্সিলর জহর লাল হাজারী আলো বলেন, যদি এটি আগামী বছর সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় তাহলে আমরা কুস্তি ও মেলার আয়োজন করবো। উল্লেখ্য যে, মহামারির করোনার কারণে বিগত দুইবছর ধরে জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখীমেলা বন্ধ ছিল। এবছর মেলার প্রস্তুতি শুরু করেও মাঠ অবমুক্ত না হওয়ার করণ দেখিয়ে সর্বশেষ মেলা ও বলীখেলা বন্ধ করে দেয়া হয়। সংবাদ সন্মেলনের পর বৈশাখী মেলা ও জব্বারের বলীখেলা বন্ধ নিয়ে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাদের ভাষায়, জব্বারের বলীখেলা নিছক কোনো খেলা নয়। এর রয়েছে ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব। বাংলার যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশের উদ্দেশ্যেই এই বলীখেলার প্রচলন। বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদিঘির আশপাশের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসে বৈশাখী মেলা। তারা মনে করেন, ২০২০-২১ দুই বছর মহামারি করোনায় বলীখেলার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি তো ভিন্ন। তারপরও কেন সম্ভব হচ্ছে না? ‘মাঠ সংকট’- এর যে যুক্তি দেখানো হচ্ছে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত! নাকি আমরা পিছু হাঁটছি হাজার বছরের সংস্কৃতি থেকে, বাঙালিয়ানা ঐতিহ্য থেকে! তবে কি এভাবে ঠুনকো নানান অজুহাতে একে একে বন্ধ হয়ে যাবে ইতিহাস সৃষ্টিকারী ঐতিহাসিক সব আয়োজন! অনেকে মাঠের সংকটের কারণে বলীখেলা অন্যত্র স্থাননান্তর করে বৈশাখী মেলার স্থান নির্ধারিত স্থানে বহাল রাখবার দাবি জানান। তবে অসমর্থিত সূত্র জানা গেছে, মাঠের সংকটে বলীখেলা বন্ধ রাখা হলেও মূলত ঈদকে সামনে রেখে টেরীবাজার, বকসিরবিট ও হাজারী লাইন এলাকার ব্যবসায়ীদের অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ এবং যানজটের আশঙ্কায় এ এলাকায় এবার মেলার আয়োজন থেকে পিছু হটেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আমরা মনে করি, কর্তৃপক্ষ যেই যুক্ততেই হোক বলীখেলা ও মেলা বন্ধ না করে বরং বিকল্প স্থানে মেলা ও বলীখেলার আয়োজন করার উদ্যোগ নিতে পারেন। এজন্য অনেকে সিআরবি অথবা আউটার স্টেডিয়াম অথবা পলোগ্রান্ড মাঠে আয়োজন করা যেতে পারে বলে মত দেন। আমরা বলতে চাই, একটি চিরায়ত ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞকে বন্ধ না করে এটিকে যেকোনভাবে সচল রাখা প্রয়োজন, তাই বিকল্প স্থানে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে আয়োজন করাটাই শ্রেয়। আমরা আশা করি, কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে বিকল্প স্থানে মেলা ও বলীখেলার আয়োজনে দ্রুত উদ্যোগ নেবেন।
উল্লেখ্য যে, ইংরেজ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে চট্টগ্রাম শহরে ১৯০৯ সালে এই বলীখেলার প্রচলন করেন বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলেও এ বলীখেলা চট্টগ্রামবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এরসাথে যুক্ত হয় বৈশাখী মেলা। দীর্ঘ একশত বছরের অধিক সময়ে এ মেলা ধরাবাহিকভাবে হয়ে আসছে। আমরা আশা করি, এবারও মেলা ও বলীখেলা যথাসময়ে সম্পন্ন হবে।