বেলায়তের সম্রাট হযরত মাওলানা আলী (রা.)

11

ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই, ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ইবনে আবু তালেব (রা.)’র ডাক নাম ছিল আবুল হাসান। উপাধী আবু তোরাব। তাঁর প্রশংসা লেখে শেষ করা যাবে না। যদি নামধারী মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে-দ্ব›েদ্ব তাঁর লিপ্ত হতে না হতো তাহলে অফুরন্ত জ্ঞান ভাÐারের সম্পদ মুসলমানদের আত্মস্থ হতো। তিনি যে মারেফাতের এবং হাফিকতের গুপ্ত জ্ঞানের প্রকাশ করেছেন তাঁর মত আর কেউ করতে পারেনি।
মাওলা আলী (রা.) দুনিয়াতে আগমন করেছেন ক্বাবা গৃহের ভিতর। জন্মের পর শিশু আলী (রা.) কিছুই আহার করে না এবং চোখ খোলে থাকায় না। তাঁর মা ফাতেমা (রা.) তাঁর স্ত্রীর নামও ফাতিমা। তাঁকে নিয়ে গেলেন নবীজীর দরবারে। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে নেয়ার সাথে সাথে শিশু আলী চোখ খোলে প্রথম দর্শন করলেন নবীজীর নূরানী চেহারা। প্রিয় নবী (দ.) এর মুখের লালা মোবারক হলো আলী (রা.)’র জীবনের প্রথম আহার। তাই বেলায়তের মর্যাদায় হযরত আলী (রা.) ছিল অদ্বিতীয়।
আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (রা.) একদিন মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, প্রিয় নবী (দ.) এর উত্তরাধিকার ও আধ্যাত্মিক জগতের জ্ঞান সম্পর্কে তোমাদের যা ইচ্ছা জেনে নিতে পার। সমবেত জনতার মধ্যে হতে দা’লার ইয়ামনী নামের একব্যক্তি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে চাইলে হযরত আলী (রা.) বললেন, তুমি আমাকে পরীক্ষা করতে নয় ফিকাহ ও জ্ঞান সম্পর্কিত প্রশ্নই করবে। দা’লার বললেন, আমিরুল মোমেনিন ! আপনি কি আল্লাহকে দেখেছেন ? তিনি বললেন, এটা কি সম্ভব, যে আল্লাহকে আমি দেখব না তাঁর ইবাদত করব। দা’লার প্রশ্ন করলেন, আপনি কি ভাবে তাঁকে দেখখতে পেয়েছেন ? উত্তরে আমিরুল মোমেনিন বললেন, চর্মচোখে তাঁকে দেখা যায় না ; অন্তর্দৃষ্টি ও বিশ্বাসের মাধ্যমে তাকে দেখতে পেয়েছি। তিনি এক। তাঁর কোন অংশীদারিত্ব নেই। তিনি উপমাহীন। তিনি কোন কাল স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তাঁকে চেনা যায় না। অনুমান দ্বারা তাঁকে বুঝাযায় না। হযরত আলী (রা.)’র এসব কথা শুনে দা’লাব চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে এলে তিনি বললেন, এখন আমি আল্লাহর পাকের সাথে প্রতিজ্ঞা করেছি যে, কাউকে আমি আর কোন দিন পরীক্ষা করতে প্রশ্ন করব না।
একবার কুফাবাসী আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (রা.)’র দরবারে হাজির হয়ে ফরিয়াদ করলো, এবছর ফোরাত নদীর জলোচ্ছ¡াসের কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। আপনি আল্লাহর দরবারে দোয়া করলে আমাদের উপকার হবে। হযরত আলী (রা.) ঘরে প্রবেশ করে মহানবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি দিকে চললেন। হযরত জুনদুব সাথে তাঁর সাথী হলেন এবং মনে মনে ভাবতে লাগলেন এখনই জানতে পারবো আসল আর নকলের পার্থক্য। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন শত্রæপক্ষ নহরওয়ান অতিক্রম করলে হযরত আলী (রা.)’র বিরুদ্ধে সেই প্রথম লড়াই করবো। তিনি নহরওয়ানে উপস্থিত হয়ে দেখলেন হযরত আলী (রা.)’র কথাই সত্যি। নহরওয়ানে হযরত আলী (রা.) জুনদুবকে পশ্চাতের দিক থেকে ধরে নেড়ে নেড়ে বললেন, জুনদুব ! সত্য উজ্জ্বল হয়েছে ? জুনদুব সাথে সাথে বললেন, হ্যা। জুনদুব সাথে সাথে আমিরুল মোমেনিনের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন কঠিন ভাবে।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)’র শাসনামলে একঘরে দু’জন মহিলার দু’টি সন্তানের জন্ম হয়। একটি ছেলে, একটি মেয়ে। নবজাতকের মতো দু’জনই দাবি করেছেন ছেলেটি তার। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমিরুল মোমেনিন হযরত ওমর ফারুক (রা.)’র দরবারে উভয় পক্ষ হাজির হন। উভয়ের কোন সাক্ষী না থাকায় বিচার করতে হযরত ওমর (রা.) সমস্যায় পড়েন। হযরত ওমর (রা.) তাড়াতাড়ি হযরত আলী (রা.)’র নিকট উপস্থিত হন। হযরত আলী (রা.) তখন একজনের বাগানে কাজ করেছিলেন। ওমর (রা.) চিৎকার করে বললেন, তাড়াতাড়ি আমার কাছে আসুন। আমি এক সমস্যায় পড়েছি, আপনাকে সমাধান দিতে হবে। হযরত আলী (রা.) বললেন, আমি এখন আপনার নিকট আসতে পারবো না, আমি কাজের চুক্তিবদ্ধ। আপনি ওখান থেকে বলুন আমি সমাধান দিচ্ছি। হযরত ওমর (রা.) সমস্যাটি খুলে বললে আমি (রা.) বলেন, কেন, আপনি কোরআন পড়েননি ? হযরত ওমর (রা.) বললেন, ঘটনা, এখনকার এটা কোরআনে ওয়াসাল্লামের জুব্বা মোবারক পরিধান করে মাথায় পাগড়ী বেঁধে লাঠি হাতে নিয়ে বাইরে এসে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে যাত্রা শুরু করলেন ফোরাতের দিকে। েেফারাতের তীরে উপস্থিত হয়ে মাটিতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে দাঁড়িয়ে পবিত্র লাঠি হাতে নিয়ে নদীর সেতুর উপর এসে দাঁড়ালেন। তাঁর সাথে ছিলেন হযরত ঈমাম হাসান (রা.) ও হোসাইন (রা.)। তিনি লাঠি নিয়ে পানির দিকে ইঙ্গিত করতেই নদীর পানির উচ্চতা এক ফুট কমে যায়। আমিরুল মোমেনিন সমবেত জনতার কাছে জানতে চাইলেন, এতটুকু পানি থাকলে তাদের সমস্যা হবে কী না। তারা বললেন, আরো কমাতে হবে। তিনি আমার পানির দিকে লাঠি দ্বারা ইঙ্গিত করে পানির উচ্চতা তিনফুট কমিয়ে দিলে উপস্থিত জনগণ বললেন, আমিরুল মোমেনিন ! আর না, এতটুকু যথেষ্ট।
হযরত জুনদুব ইবনে আবদুল ইজদী (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি উস্ট্রির যুদ্ধ ও ছিফ্ফিনের যুদ্ধে হযরত আলী (রা.)’র সাথে ছিলাম কিন্তু নহরওয়ানের যুদ্ধের সময় আমার সন্দেহ হলো আমিরুল মোমেনিন সত্যের পথে আছে কী না। কারণ আমাদের বিরুদ্ধে অনেক আলেম ও সৎলোক ছিল। আমি এই দিন সকালে দেখতে পেলাম তিনি অজু করে বসে আছেন। ইতোমধ্যে একজন অশ্বারোহী এসে হযরত আলী (রা.)’র দরবারে হাজির হয়ে বললেন, শত্রæপক্ষ নহরওয়ান অতিক্রম করে পানি সংগ্রহের পথ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তিনি বললেন, অসম্ভব ব্যাপার তারা নহরওয়ান অতিক্রম করতে পারেনি। আরেক ব্যক্তি এই সংবাদ প্রদান করলে মাওলা আলী (রা.) বললেন, আল্লাহর কসম করে বলছি তারা নহরওয়ান অতিক্রম করতে পারেনি। কারণ তাদের পরাজয়ের স্থান তো এটাই। অতঃপর তিনি নহরওয়ানের থাকবে কী করে ? হযরত আলী (রা.) বললেন, এর সমাধান পবিত্র কোরআনে আছে। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন পুরুষ মেয়েদের চাইতে শক্তিশালী। দুই মহিলার স্তন থেকে গøাসে সমপরিমাণ দুধ নিয়ে ওজন কর। যার দুধের ওজন বেশী তার পুত্র সন্তান। যার দুধের ওজন কম তার কন্যা সন্তান। তাই করলেন হযরত ওমর (রা.)। সমস্যাটির হলো সমাধান।
একদিন হযরত আলী (রা.) এক সভায় উপস্থিত সকলকে শপথ দিয়ে জানতে চাইলেন, প্রিয় নবী (দ.) এর বাণী আমি যার বন্ধু আলী তার বন্ধু তোমরা শুনতে পাওনি ? সভায় বারজন আনসারী সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। সকলে সাক্ষ্য দিলেন কিন্তু একব্যক্তি সাক্ষ্য দিলেন না। হযরত আলী (রা.) তাঁকে বললেন, তুমিও তো একথা শুনতে পেয়েছিলে। লোকটি বললো, আমার মনে নেই। আমিরুল মোমেনিন বললেন, হে আল্লাহ যদি লোকটি মিথ্যা বলে তার মুখে ধবলকুষ্ঠের চিহ্ন প্রকাশ হোক। সে ব্যক্তির চোখের মাঝখানে ধবলকুষ্ঠের চিহ্ন প্রকাশিত হয়েছিল।
একদিন আমির মুয়াবিয়া (রা.) বললেন, আমার শেষ পরিণয় সম্পর্কে কেউ কি জান ? সকলে বললো ‘না’। মুয়াবিয়া (রা.) বললেন, হযরত আলী (রা.) ই জানতে পারে। তাঁর কথা সত্য প্রমাণিত হয়। তিনি তাঁর বিশ্বস্ত তিন ব্যক্তিকে বললেন, তোমরা একের পর এক কুফায় গিয়ে আমার মৃত্যুর খবর প্রচার করবে এবং আমার অসুস্থতা, মৃত্যু দিবস, মৃত্যুর সময়, স্থান, কবর ও নামাজের জায়নাজার ঈমামের ব্যাপারে তিনজন একই কথা বলবে। তারা তাই করলেন।
হযরত আলী (রা.) পর পর দুই ব্যক্তির কাছে একই সংবাদ শুনতে পেয়েও নির্লিপ্ত রইলেন। তৃতীয় ব্যক্তির মুখে এই সংবাদ শুনতে পেয়ে তিনি আপন দাড়ি ও মাথায় দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, আমার দাড়ি ও মাথা রঙিন না হওয়া পর্যন্ত মোয়াবিয়া কিরূপে মৃত্যুবরণ করতে পারে ?
হযরত ঈমাম হোসাইন (রা.) বর্ণনা করেন, হযরত আলী (রা.)’র ইন্তেকালের দিন আমি গায়েব হতে শুনতে পেলাম তোমরা আল্লাহর এই বান্দাকে আমাদের হাতে অর্পণ করে বাইরে চলে যাও। আমি বাইরে আসলাম অতঃপর ভিতর হতে শুনতে পেলাম ‘হুজুর (দ.) এর প্রতিনিধি শহীদ হলেন। যিনি ইসলাম ধর্মের তত্ত¡াবধায়ক এবং প্রিয় নবী (দ.) এর জীবন চরিত্র কার্যকর ও অনুসরণকারী একথা শুনার পর আমরা ভিতরে গিয়ে দেখি হযরত আলী (রা.)’র গোসল ও কাফন পরানো সম্পন্ন হয়ে গেছে। সোবহান আল্লাহ।

লেখক : রাজনীতিক, কলাম লেখক