বেগম মুশতারী শফীর মুক্তিযুদ্ধের গল্প

20

শাকিল আহমদ

বেগম মুশতারী শফীর (জন্ম-১৯৩৮ মৃত্যু ২০ ডিসেম্বর ২০২১) মুক্তিযুদ্ধের গল্পের গভীরে প্রবেশের আগে এই মুক্তিযোদ্ধার সাহিত্য সৃষ্টির সময় এবং প্রেক্ষাপট নিয়ে খানিকটা আলোকপাত প্রয়োজন। কারণ সৃষ্টিশীল লেখক মাত্রই তার সময় ও সমাজ প্রেক্ষাপট সবচাইতে বড় বিষয়। এর পরেই আসে একজন লেখকের অনুভূতি-আবেগ-দর্শন-সৃষ্টি যন্ত্রণা। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বস্তুত বাঙালি জীবনেরই প্রাণ ভোমরা। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশে এই বাকদলের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের সৃষ্টিশীল সাহিত্যের এক বিশাল ক্যাম্পাস। আমার দৃষ্টিতে বাঙালি জাতির সময়ের বাঁক বদলের ক্ষেত্রে বেগম মুশতারী শফী এক ভাগ্যবান মানুষ। কারণ ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি চৌদ্দ বছরের এক কিশোরি বালিকা এবং মুক্তি সংগ্রামের সময় চৌত্রিশ বছরের এক যুবতি মা। বস্তুত একজন মানুষের জীবনে সেটিই শ্রেষ্ঠ সময়। আর এক সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রামের সময় মুশতারী শফীর এক কঠিন কঠোরতম ত্যাগ এবং অনন্য অসাধারণ অংশগ্রহণ, সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণের ক্ষেত্রে (স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন) তিনি এক কিংবদন্তী ও বটে।
বিশ শতকের পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর-আশি থেকে নব্বই এর দশক পর্যন্ত এই গুণেধরা সমাজটাকে, পাল্টে দেওয়ার জন্য, নারী মুক্তি, নারী অধিকার নারী স্বাধীনতার জন ঘরে-বাইরে এবং রাজপথে নিরন্তন সংগ্রাম করে গেছেন বাঙালি তিন মহিয়ষী নারী, যথাক্রমে বেগম সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম ও বেগম মুশতারী শফী। তাঁদেরকে একমাত্র তুলনা করা চলে মাক্সিম গোর্কির ‘মা’ নিলভনার সাথে। একাত্তরে ত্রিশলক্ষ শহীদ পরিবারের যে রক্তকরন হয়েছিল এদের অন্যতম ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়িয়েছেন জাহানারা ইমাম ও বেগম মুশতারী শফী। কিন্তু তবুও তাঁরা থেমে থাকেননি। একটি স্বাধীন পতাকার জন্য, স্বাধীন ভূ-খন্ডের জন্য লড়াকু সৈনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন সেদিন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও কিন্তু তাঁদের যুদ্ধ থেমে থাকেনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই ঘুনেধরা সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের অঙ্গিকারে সমাজে মাথাচারা দিয়ে ওঠা একাত্তরের ঘাতক স্বাধীনতা বিরোধীদের কে আইনের কাটগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য আবারও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নামেন এই লড়াকু দুই নারী। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগের বীর গাঁথাও প্রবহমান থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধে এক অনন্য ভূমিকা ছিল মুশতারী শফীর বাসভবন ‘মুশতারী লজ’। মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন অস্ত্র রাখার ঘাটি সহ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শুরুতেই অনেক গোপন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম পরিচালনার ঘাঁটি ছিল মূলত এই মুশতারী লজ। আর সে কারনেই পাকহানাদার বাহিনীর অন্যতম এক টার্গেটে পরিণত হয় মুশতারী শফীর পরিবার। শেষ পর্যন্ত হানাদার বাহিনীর হাতে তাঁকে হারাতে হয় প্রাণপ্রিয় স্বামী ডা: শফী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একমাত্র স্নেহের ছোট ভাই এহসানকে। সম্পূর্ণ গুড়িয়ে দেওয়া হয় মেয়েদের দ্বারা পরিচালিত মুশতারী শফীর তিল তিল করে গড়ে তোলা সেই ‘বান্ধবী’ পত্রিকার ছাপা খানাটিও। যুদ্ধকালীন এক কঠিনতর সময়ের মুখোমুখি উপনীত হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের কঠিনতর স্বাক্ষী সেই ‘মুশতারী লজ’ কে পেঁছনে ফেলে শিশু সন্তান কে বুকে আঁকড়ে ধরে প্রিয় ‘ডায়েরি’টিকে বগলদাবা করে এক অনিশ্চিত যাত্রার শরণার্থী হয়ে ছুটে চলে। সেই দু:খ-ক্লিষ্ট জীবনকে টেনে টেনে অবশেষে পৌঁছে যান সীমান্তের ওপারে শরণার্থী শিবিরে। এ বিষয়ে আর তেমন কিছু বলতে চাইনা, কারণ বলা আছে তাঁর জবানিতে রচিত অমর কাব্য “স্বাধীনতা আমার রক্তঝরা দিন” স্মৃতি কথায়।
বেগম মুশতারী শফী শুধু মুক্তিযুদ্ধের এক প্রত্যক্ষ কারিগরই নন। তিনি আমাদের কথা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যের এক নিপুন কারিগর ও বটে। কারণ একাত্তরকে এতো কাছে থেকে এতো হৃদয়যন্ত্রণা দিয়ে, ক্ষত-বিক্ষত চিহ্নবুকে ধারণ করে আমাদের কথা সাহিত্যের অন্যকোন লেখক কলম ধরতে পারেনি। জাহানারা ইমাম এবং মুশতারী শফী ছাড়া। মুশতারী শফী যেহেতু একজন সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন। সেহেতু যুদ্ধকালীন সময়ে ব্যস্ততা ও দায়িত্ববোধের মাঝেও একটু অবসরে কাজে লাগাতেন বগলদাবা করে নিয়ে যাওয়া সেই ডায়েরিটি। লিপিবদ্ধ করতেন চারপাশে ঘটে যাওয়া যুদ্ধের অনেক লোমহর্ষক ঘটনাবলী। অবসরে শিল্পরূপ দিয়ে সৃষ্টি করতেন এক একটি অনন্য-অসধারণ ছোট গল্প।
কথাশিল্পী মুশতারী শফী ১৯৪৯ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় মুকুলের মাহফিলে ছোট গল্প লেখার মধ্যদিয়ে লেখা লেখির জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁর প্রথম গল্প গ্রন্থ (যৌথ ভাবে) “দুটি নারী একটি ‘যুদ্ধ’ ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় অ্যাডভোকেট গাজীউল হক এর অনুপ্রেরণায় তাঁর সহোদর জলীজাহানুর এর পাঁচটি গল্প এবং মুশতারী শফীর পাঁচটি গল্প নিয়ে। উল্লেখ্য মুশতারী শফীর গ্রন্থভূক্ত পাঁচটি গল্প যথাক্রমে- দু’টি নারী একটি যুদ্ধ, মরা শিউলি, সঙ্কট থেকে সঙ্কট উত্তরণ, প্রায়শ্চিত্তে, যে গল্পের শেষ নেই গল্প গুলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শরণার্থী জীবনে কলকাতায় বসেই লিখেছিলেন এবং সেই গল্পগুলো স্বকন্ঠে প্রচার করেছিলেন ‘আকাশবানী’ থেকে। প্রকৃত পক্ষে রনাঙ্গনে সেই সময়কার অনুভূতি নিয়ে লেখা গল্পগুলোর সাহিত্যিক মূল্য যেমন রয়েছে, তেমনি যুদ্ধের সাথে লড়তে লড়তে তাঁর এসব গল্প রচনা। সুতরাং এসব গল্প অনেকটা আত্মজৈবনিক এবং ইতিহাস-আসৃত ও বটে। স্বাধীনতার এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টির সময় এ সমস্ত গল্পের পটভূমি তৈরী হয়েছে। সময়ের দিক থেকেও এসব গল্পের রয়েছে এক ঐতিহাসিক এসব গল্প রচনার সময় তিনি ভারতের শরণার্থী শিবিরে, হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সেবাদান করতেন, কখনো স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে কাজ করতেন আর ফাঁকে ফাঁকে রচনা করে ‘আকাশবানী’ থেকে পাঠকরে শুনাতেন। তখন আকাশবানী থেকে প্রচারিত এসব গল্পের গুরুত্বই ছিল অসাধারণ, যেমন- “ঐ যা! অনেক বেলা হয়ে গেল। আজ বুঝি ‘আকাশবানী’র ‘দেশ গান’ আর শোনা হলো না। মনে পড়তেই তড়াক করে বিছানা থেকে নেমেই ড্রইং রুমে গিয়ে রেডিওটা খুলে দেয় কেয়া। সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ বুলেটিন প্রচার শুরু হলো। ‘পূর্ব বাংলার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পাক সামরিক বাহিনরি সাথে বেসামরিক জনসাধারণের প্রচন্ড লড়াই চলছে’ বুলেট শেষ হতেই ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ রেকর্ডটা বেজে উঠলো। … তড়াক করে উঠে বসে আমিন। …ঃ আমার অনুমান তাহলে ঠিকই হলো কেয়া, ওরা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো।” (ঝরা শিউলি)। এতে সহজেই অনুমেয় ‘আকাশবানী’ তখন আমাদের মুক্তিপাগল বাঙালির জন্য কতটা গুরুত্ববহ। আর এই সম্প্রচার কেন্দ্র থেকেই তখন মুক্তিযুদ্ধে শক্তি যোগান দেওয়ার মতো গল্প লিখে স্বকন্ঠে প্রচার করেছেন আমাদের গল্পকার বেগম মুশতারী শফী। এসব গল্পে তিনি সময়কে হৃদয়ে ধারণ করেছেন, উপলব্ধি করেছেন এবং জীবনের এক প্রচন্ড রকম অভিজ্ঞতা থেকে কলম ধরেছেন। ‘প্রায়শ্চিত্ত; গল্পের অংশ বিশেষ—- “প্রত্যেক দিনের মতো সে রাতেও দুলাল বাজারে ‘আকাশবানী’র খবরটা শুনে ঘরে ফিরছে। আর ফিরেই প্রথমে নূরাকে খুঁজেছিল। কেননা বাড়িতে একমাত্র নূরাই উৎসুক হয়ে বসে থাকে কখন দুলাল ফিরবে মুক্তিবাহিনীর দুর্বার বিজয়ের সংবাদ নিয়ে, —- আলোচনা করতে করতে একদিন দুলাল বলেছিল, জানিস বুবু, আমার ভীষণ ইচ্ছে করে মুক্তিযুদ্ধে যেতে। দ্যাখ, কিভাবে পাকিস্তানিরা আমাদের গোটা দেশের ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেছে- কি নৃশংস হত্যা।” তাঁর গল্পগুলো এভাবেই অতিসাধারণ মানুষকেও উদ্ভুদ্ধ করেছিল মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরার ক্ষেত্রে। সাধারণ মানুষের অসাধারণ বিরত্বগাঁথা তিনি এ ভাবেই গল্পে চিত্রায়িত করেছেন। সেই সময়কার গল্পগুলো সময়কে অতিক্রম করে কালোত্তীর্ণ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের আবেদন নিয়ে শিল্প বিচারেও আমাদের কথাসাহিত্যে প্রতিনিধিত্ব করছে ।
বেগম মুশতারী শফীর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ২০০৯ সালে আগের পাঁচটি গল্পের সাথে নতুন তিনিট গল্প সংযোজনে আটটি গল্পের সময়ে দুটি নারীও একটি যুদ্ধ শিরোনামে ইত্যাদি থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এই গ্রন্থের আটটি গল্পের সাথে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে আরো নতুন আটটি গল্প নিয়ে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় বেগম মুশতারী শফীর মোট ষোলটি গল্পের সন্বয়ে গ্রন্থ “মুক্তিযুদ্ধের গল্প” তাঁর পরবর্তীতে রচিত গল্পগুলো স্বাধীনতা পরবর্তী সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের এবং অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ভঙ্গের এক নিদারুণ যন্ত্রণার চিত্রই চিত্রায়িত হয়েছে। হয়তো লেখক নিজেই স্বাধীনতা পরবর্তী স্বপ্ন ভঙ্গের যাতনায় অধিকতর আক্রান্ত বলেই এতোটা হৃদয়গ্রাহী করে রচনা করেন- বীরঙ্গনা, শান্তিহারা, সমগোত্রীয়, নি:শব্দে নির্বাক, খোলা জানালার পাশে, অচল মুখ ইত্যাকার গল্পগুলো।
যুদ্ধপরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধার স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা যেন এই স্বাধীন দেশের সমাজ বাস্তবতাকে এভাবে নাড়া দেয়- “আমি যুদ্ধ করেছিলাম দেশের জন্য দেশের স্বাধীনতার জন্য এবং তা করতে গিয়ে একটি পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছি। আর আজ তুমি যুদ্ধ করছ আমাদের কটি প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এ যুদ্ধের যেন শেষ নেই। মাঝে মাঝে বড় বয় হয় বন্যা, এই যুদ্ধে করতে করতে একদিন যদি সম্পূর্ণ তোামকে হারাতে হয়- তখন আমি কি নিয়ে যাবে “(অচল মুখ্য) পঙ্গুমুক্তিযোদ্ধা শাহেদের এই চাপা যন্ত্রণা, আকুতি, এই স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের পঙ্গু সমাজ বাস্তবাতরই এক বাস্তব রূপায়ন। স্বপ্নভঙ্গের এই চালচিত্র আমাদের মুুক্তিযুদ্ধের সাহিত্যে ঘুরে ফিরে বারবার এসেছে বটে তবে লেখকের এই ‘অচল সুখ’ গল্পের শরীর বুননে, বর্ণনার আভিজাত্যে পঙ্গুত্ব বরণ করা নিরীহ শাহেদ আর বন্যার সংসার যেন সমগ্রদেশের এক টানাপোড়ন ও দু:খ ক্লিষ্ট যাপিত জীবনের চালচিত্রই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও জীবন যুদ্ধের কবে অবসান হবে তা কেউ জানে না। মুক্তিযুদ্ধের আবেগঘন পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সমাজের নিচুতলার বাসিন্দাদের যাপিত জীবনকে অত্যন্ত কাছে থেকে অবলোকন করেছেন লেখক। এতোটা হৃদয়গ্রাহী করে গল্পের পটভূমি নির্মাণ করেছেন মুশতারী শফী যা অপরাপর কথা সাহিত্যিক, থেকে অনেকটা ভিন্ন মেজাজের। এর কারণ অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ব্যক্তি মুশতারী শফীর এই স্বাধীনতার সাধ অন্য কারো থেকে স্বতন্ত্র বলেই হয়তো তাঁর কলম থেকে কর্ষিত মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য ও হয়ে ওঠেছে এতটা উর্বর।
তাঁর গল্পের পটভূমি এবং বর্ণনা থেকে মনেজাগে হয়তো বা আত্মজীবনী কিম্বা ডায়েরির খন্ড খন্ড অংশ থেকে এসব গল্পের সৃষ্টি হয়েছে। বস্তুত একাত্তরের জীবন থেকে উৎসারিত লব্ধ অভিজ্ঞতা ও তিক্ততা থেকে ওঠে এসেছে অনেক গল্পের পটভূমি। আরো আছে স্বাধীনতা পরবর্তী স্বপ্নভঙ্গের ফলে হৃদয়ে যে ক্ষরণ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের আসফালনের ফলে স্বাধীনদেশের চাওয়া পাওয়ার প্রতি যে বৈষম্যও হতাশার রেখা পড়েছে তারও প্রতিফলন আছে অনেক গল্পে। বস্তুত মুক্তিযুদ্ধের জীবনছবি আঁকবার জন্য তাঁকে কারো কাছে থেকে কিছু ধার নিতে হয়নি। কারণ তিনিতো নিজেই এক মুক্তি সংগ্রামের মহান কারিগর। গল্পের শরীর বুননের জন্য কলম ধরলেই চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয় যুদ্ধকালীন সময়ের ব্যেদনাক্লিষ্ট হাজারো ঘটনার ঘনগটা। সুতরাং এমনতর মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা লব্ধ লেখকের কলম থেকেই তো পাঠক এমন হৃদয়গ্রাহী বারুগন্ধ দিনগুলোর গল্প শুনতে পায়। যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের যন্ত্রণা কে খানিকটা হালকা করবার জন্যই হয়তো বা তিনি কলম ধরেছেন। গল্পের ছলে বিভীষিকাময় জীবনচিত্রকে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন কথা শিল্পী বেগম মুশতারী শফী কথা সাহিত্যের উর্বর শাখা ছোট গল্পের মধ্য দিয়ে।
গল্পের পটভূমি বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুধু নগরকেন্দ্রিক ছিল না। ক্রমে ক্রমে তা গ্রামীণ জীবনে ও ছড়িয়ে পরে। দেশের মানুষের কেন না কোন ভাবে অংশগ্রহণ এবং গ্রামের অতিসাধারণ মানুষটিও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের ফলে বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভবপর হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ও নারী অনুকম্পকে এতো কাছে থেকে এতোটা হৃদয় দিয়ে অন্য কোন লেখক উপস্থাপন করতে পারেনি। যুদ্ধকালীন সময়ের নারী চরিত্র চিত্রায়নে তিনি অসাধারন শিল্প-নৈপুর্ণতা দেখিয়েছেন-বীরঙ্গনা, দুটি নারী একটি যুদ্ধ, খোলা জানালার পাশে, যে গল্পের শেষ নেই ইত্যাকর গল্পগুলোতে। বীরঙ্গনা গল্পের অংশ বিশেষ- “অনেকক্ষণপর জ্ঞান এলো মেয়েটির চোখ খুলে তাকাতে ভয় পেল সে। যদি ওরা জানতে পারে সে বেঁচে আছে, তাহলে হয়তো একে একে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে ওর ওপর। তার চেয়ে মড়ারমতো পড়ে থাকাই ভালো। কিন্তু চোখবন্ধ করেও অনুভব বারলো সে পৃথিবীর আলোকে, অনুভব করলো পাকাধানের মিষ্টি সুবাস মেশানো পৌষালি বাতাসকে। চোখবন্ধ করেই সে বুক ভরে নি:শ্বাস নিলো। আহ্কি মিষ্টি ও সুন্দর মায়ের আদরের মতোই স্নেহময় পরশ। সহসা পুরুষ কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে মেয়েটি আবার নি:শ্বাস বন্ধ করে কাঠের মতো শক্ত হয়ে রইলো।” যুদ্ধকালীন পাকহানাদার বাহিনীরা নির্যাতন করে নিয়ে গিয়ে নারীদের ওপর যে পৈশাচিক নির্যাতন করেছে তার বাস্তাব রূপটি গল্পে ওঠে এসেছে।
লেখক নিজেই একজন শরণার্থী ছিলেন বলেই বোধকরি মুক্তিযুদ্ধের আর এক বড় অংশ শরণার্থীর দেশ আগের করুন এবং হৃদয়গ্রাহী চিত্র ও শরণার্থী জীবনের নানা অনুসঙ্গ নিপুনভাবে চিত্রায়িত করেছেন। “রোজ গিয়ে দেখতাম ট্রাক বোঝাই করে গরু-ছাগলের মতো অগনিত যেসব বাস্তুহারা শরণার্থীর দলকে এনে জমা করা হয়েছে দুর্গাবাড়ি, রাজবাড়ি, কলেজ টিলা সহ শহরের বিভিন্ন ক্যাম্পে, সেখান থেকে আবার তাদের ট্রাকে তুলে এয়ারপোর্টে নিয়ে গিয়ে মালবহনকারী কার্গো বিমানে তুলে দেয়া হচ্ছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গড়ে ওঠা শরণার্থী ক্যাম্পে রাখার জন্য” ( যে গল্পের শেষ নেই)। গল্পের এই দৃশ্য লেখকের কোন কল্পনা প্রসুত নয়। শরণার্থী ক্যাম্পের বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে লেখক তাঁর গল্পের পটভূমি তৈরি করেছেন। স্বভাবতই মুক্তিযুদ্ধে যারা শরণার্থী হয়ে দেশ ত্যাগ করতে হয়নি তাদের কাছে এ-ধারার গল্পের পটভূমি হৃদয়কে আন্দোলিত করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট যে অনেক ব্যাপক ও বিস্মৃত তাও এ গল্পে অনুধাবন করা যায়। অনুরূপভাবে যুদ্ধকালীন সময়ে স্বদেশের মাটি আকড়ে ধরে শহর থেকে গ্রামে গিয়ে ও যে আত্মরক্ষা হয়নি পাকহানাদার বাহিনীর রোষানল থেকে তারও বিভৎস রূপ উদ্ভাসিত হয়েছে অনেক গল্পের পটভূমিতে। “আমি বীরঙ্গনা একথা আজ আর কোন নারী বুক ফুলিয়ে বলতে পারেনা কেন? পারেনা এই কারনে যে, ‘বীরঙ্গনা’র অর্থই হলো সে যুদ্ধকেষত্রে ধর্ষিত। তাই অনেকে আমাদেরকে দেখতে এস অশ্লীল ইঙ্গিত করতেও দ্বিধা করেনা। এমনি লুকোচুরি খেলার যন্ত্রণা থেকে অনেকে মুক্তি পেয়েছে আত্মহত্যা করে। কিন্তু আমি ও পথে গেলাম না। আমার ভেতরে যে নতুন বিদ্রোহী চেতনা জেগে উঠলো। সেই চেতনা আমাকে ওপথে নিয়ে এলো। ব্যাস ব্যাস রওশন, চুপ কর। অনেক বলেছো। আমি আর শুনতে চাইনা। রাশেদ যেন আর্তনাদ করে ওঠে” (দুটি নারী একটি যুদ্ধ)। যুদ্ধপরবর্তী সমাজ ব্যবস্থার মূর্ত প্রতীক হয়ে থাকবে বীরঙ্গনাদের নিয়ে রচিত এসব গল্পের চিত্রায়ন।
বেগম মুশতারী শফীর মুক্তিযুদ্ধের গল্পের অধিকাংশই কিন্তু কোন না কোন সত্য ঘটনা অবলম্বন করে শিল্পীত রূপ পেয়েছে। এসব গল্পপাঠে আমাদের অনেক সময় সংবাদ প্রতিবেদন পরছি বলেই মনে হতে পারে। সংবাদ প্রতিবেদনের মতো এই বিষয়টি মূলত ওঠে এসেছে তাঁর সেই ডায়েরী থেকে। ‘অতপর আমি লেখক হলাম’ গল্পের পটভূমিতে তার বহিপ্রকাশ রয়েছে। “কল্পনার আশ্রয়ে মিথ্যে কাহিনী সাজিয়ে লেখার আগ্রহ আমার নেই। আমি খুঁজি কেবল বাস্তব। আমি চাই আমার লেখনীতে পুরোপুরি সত্য এবং বাস্তবকে তুলে ধরতে। ———— আজকাল খবরের কাগজের পাতায় নিত্য দেখতে পাই হত্যার খবর। কত রকমের হত্যা গুলি করে হত্যা। চুরিকাঘাতে হত্যা, গলাটিপে হত্যা, পিটিয়ে হত্যা, ঘুঁচিয়ে হত্যা, ডুবিয়ে হত্যা- আরো কত রকমের কত ভাবে মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে।” ডায়েরি, আত্মকথা কিম্বা সংবাদ প্রতিবেদন যাই কিছু আমরা ভাবিনা কেন মূলত ব্যক্তি লেখকের হৃদয় থেকে উৎসারিত ষোলটি ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথাসাহিত্য এক অনন্য সংযোজন। মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধত্তোর সময়ের এক সংবেদনশীল প্রতিচ্ছবি নিয়েই তার গল্পের কাঠামো নির্মীত। আর সে কারণেই গল্পকার মুশতারী শফী মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুলো প্রজম্মের পর প্রজম্ম পাঠক সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আন্দোলিত করবে।