বৃক্ষের সাথে মিতালি শিরিষতলায়

3

মনিরুল ইসলাম মুন্না

সিআরবি শিরিষতলায় চলছে ‘বৃক্ষপ্রাণে প্রকৃতি-প্রতিবেশ, আগামী প্রজন্মের টেকসই বাংলাদেশ’ শিরোনামে বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের উদ্যোগে গত বৃহস্পতিবার থেকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও সিএমপি’র সহযোগিতায় আয়োজন করা হয় এ মেলা। আগামী ১৭ আগস্ট শেষ হবে এ মেলা।
মেলায় গিয়ে দেখা যায়, ফুল, ফল, বনজ, ওষুধি, অর্কিড, বনসাইসহ নানা রকমের গাছের সমাহার। দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে একেকভাবে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির চারা বিক্রির জন্য প্রদর্শনী রাখা হয়েছে স্টলগুলোতে। মেলায় চারদিকে যেন সবুজ আর সবুজ। পড়ন্ত বিকেলে অন্যরকম স্নিগ্ধতা। দর্শনার্থীদের সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো। সবমিলে জমজমাট এক বৃক্ষ মেলা। বেশি আকর্ষণ ছিল শেওড়া গাছের তৈরি নৌকায়। যার দাম ছিল এক লাখ টাকা।
গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। সরেজমিন দেখা গেছে, ডুরিয়ান, অলিভ, কাউ, পিচ, কিউই ফল, অ্যাভোকেডো, আলমন্ডা, ড্রাসিনা, চেরী ফল, পার্সিমন ফল, ড্রাগন, ট্যাং ফল, অ্যাপ্রিকট ফল, আদা জামির, স্ট্রবেরি পেয়ারা, বিলাতি গাব, রাম্বুটান, জয়ফল, সাদা নাশপতি, রাবাবা, মাল বেরি, লোকাট ফল, এবিউ ফল কালোজাম, সাতকরা, সফেদা, কদবেল, আতা, কুল, বড়ই, ডালিম, করমচা, বেল, জাম্বুরা, কাঁঠাল, লাল কাঁঠাল, চাম কাঁঠাল, ডুমুর, কাজু বাদাম, জবা ফুল, ম্যান্ডেভিলা, ফুল, হাসনাহেনা, পলাশ, কনকচাপা, বাসন্তি, মালতী, নয়নতারা, আঁশফল, ঘৃতকুমারী, লটকনসহ নাম জানা-অজানা হাজারো ফল ও ফলের দেশি-বিদেশি গাছ।
প্রতিটি স্টলের সামনে ভিড় জমিয়েছেন দর্শনার্থীরা। কেউ দরদাম করছেন, কেউ পরিচর্যার বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন আবার কেউ পোকামাকড় থেকে রক্ষার জন্য পরামর্শ নিচ্ছেন। মেলায় দেশি-বিদেশি ফুলের নানা জাত দেখা গেছে। ক্রেতারাও স্বাচ্ছন্দ্যে দোকানি থেকে জেনে নিচ্ছেন। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ঘুরতে আসছেন মেলায়। তবে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল শেওড়া গাছের তৈরি নৌকাতে। দর্শনার্থীরা এটা দেখে অনেকে কিনতে চাইলেও দামের দিকে তাকিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। দোকানি এর দাম দিচ্ছেন এক লাখ টাকা। তবে কেউ কেনার আগ্রহ করলে কিছুটা ছেড়ে দিয়ে বিক্রি করবেন বলে জানিয়েছেন চন্দন নগর বনফুল নার্সারির মালিক মো. জামাল।
তিনি পূর্বদেশকে বলেন, ‘নৌকাটি তৈরি করতে অনেক শ্রম ও মেধা গেছে। আর নৌকা হচ্ছে আমাদের দলের প্রতীক। তাই মনের আবেগ মিশিয়ে এটি তৈরি করেছি। তাই এর মূল্য টাকা দিয়ে হবে না। তবে নার্সারির উন্নয়ন ও আরও বেশি বেশি সৌন্দর্যবর্ধন গাছের জন্য এটা বিক্রি করতে চাই।’
নার্সারির দোকানি মো. জনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত ৭০টি বিভিন্ন প্রজাতির চারাগাছ এনেছি। নার্সারিতে ২০০ এর বেশি চারাগাছ আছে। কয়েকদিনের মধ্যে সব নিয়ে আসব।’
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্টলের সামনে বালির মাচার উপর দেখা গেল বাঁশের ডাল পোঁতা। সেখান থেকে নাকি নতুন করে বাঁশ উৎপন্ন হবে। আর সে বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন রিসার্চ অফিসার। শুধু বাঁশ নয়। গাছের চারা ও বীজ বিক্রি, বনজ গবেষণা সম্পর্কিত তথ্য ও প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ দিচ্ছেন কর্মকর্তারা।
বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের রিসার্চ অফিসার ছৈয়দুল আলম বলেন, ‘বিভিন্ন চারা, নার্সারি, বনজ, ওষুধি ও ফলজ উদ্ভিদ উৎপাদন বিষয়ক সব রকমের পরামর্শ, সেবা ও প্রশিক্ষণ আমরা দিচ্ছি। আগ্রহী যে কেউ আমাদের সাথে যোগাযোগ করে সেবা নিতে পারবেন।’
মেলায় গাছ কিনতে এসে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রকিবা সোলতানা রুফু বলেন, ‘করোনার কারণে মেলা হয়নি। এখন প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মেলা ঘুরে চেনা অচেনা নানা প্রজাতির ফুল ও ফলের গাছ দেখতে পাওয়া যাবে। এখানে এলেই মন ভালো হয়ে যাবে। পরিচিত হওয়া যাবে উদ্ভিদ রাজ্যের সঙ্গে।’
তিলোত্তমা চট্টগ্রাম স্টলের মালিক শাহেলা আবেদিন বলেন, ‘ঘর সাজানোর জন্য অনেকেরই পছন্দ টব কিংবা বনসাঁই। ফ্ল্যাট বাড়ির ছোট জায়গায় সবুজের ছোঁয়া আনতে গাছ লাগানো যায়। কোনো কোনো গাছে রয়েছে ওষুধিগুণ আবার কোনো গাছ বয়ে আনে সৌভাগ্য আর প্রাচুর্য। টবে লাগানো যায় পিস লিলি, গোলাপ, অর্কিড, ক্যাকটাস, তুলসী ইত্যাদি। আমার এখানে বনসাঁই, হরেক রকমের পাতা বাহার, দেশি বিদেশি অর্কিড, বাহারি রঙের এডেনিয়াম চেরি ফুল, মোসান্ডা ফুল, জবা ফুল, রঙ্গন ফুল রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাস, ওষুধি গাছ, আম, মাল্টা, পেয়ারা, কুল, সবেদা, লেবু ও কাঁঠালের চারা রয়েছে। অর্থাৎ, ১০ টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকার গাছ পাওয়া যাচ্ছে এ মেলায়।’
পুরো মেলায় ২২টি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল রয়েছে। রয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ ফাঁড়ি। উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রামের বন কর্মকর্তা মো. ছিদ্দিকুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘প্রকৃতিকে সংরক্ষণ, জলবায়ু মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষে বৃক্ষরোপণ করা আবশ্যক। কারণ আমাদের দেশে সুষ্ঠুভাবে জীবন ধারণের জন্য ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের রয়েছে মাত্র ১৭ ভাগ। আমরা বর্তমানে ২২ ভাগ বনভূমিতে রূপান্তর করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের দিকে লক্ষ্য করলে দেখবেন সেখানে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা কত। ৪২ থেকে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার বিপরীতে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়। তার একমাত্র কারণ গাছ-পালা। সেখানে গাছপালা না থাকাতে তাপমাত্রা বেশি আর আমাদের এখানে তাপমাত্রা কম। সুতরাং যত বেশি গাছ লাগানো হবে তত তাপমাত্রা কমবে। এজন্য আমরা দেশের বনভূমি রক্ষার্থে বিভিন্ন প্রোগ্রাম করে যাচ্ছি। যারা বন নিধন করছে তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করছি।’
দর্শনার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এ মেলায় নানা জাতের চারা বিক্রয় চলছে। দোকানিরা সূলভমূল্যে বিক্রি করছেন। পাশাপাশি কীভাবে চারা লাগানো হবে, এর পরিচর্যা কীভাবে করবেন তা নিয়েও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আপনারা আসেন, দেখুন, কিনুন। গাছ লাগিয়ে সবুজে সমৃদ্ধ করুন আমাদের এ দেশ।’