বুদ্ধ পূর্ণিমা : বুদ্ধের জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ ও মহাপরিনির্বাণ

21

 

বৌদ্ধ ধর্মে ত্রিস্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমা একটি অন্যতম প্রধান পবিত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান যা তিনটি পুণ্যময় স্মৃতিকে কেন্দ্র করে উদ্ভাসিত, যথা জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ ও মহাপরিনির্বাণ। আলোকোজ্জ্বল বৈশাখী পূর্ণিমার শুভ দিনটিতে তিনটি কীর্তিময় ঘটনা মানব সভ্যতা তথা বৌদ্ধ ইতিহাসে এক বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। গৌতম সিদ্ধার্থের বোধি জ্ঞানলাভী বুদ্ধচরিত ধর্মানুসন্ধান ও ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে এক মহৎ গুণাবলি। বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আজ বুদ্ধ কর্তৃক আবিষ্কৃত এ ধর্মের মহিমান্বিত বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির বন্দনা, ধ্যান ও আরাধনায় সতত নিবেদিত। মহান বুদ্ধত্বলাভী বুদ্ধ সকল মহৎ গুণাবলির মূর্ত প্রতীক। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘আজিও জগৎ অর্ধ জুড়িয়া ভক্তি প্রণত চরণে তার’। আনন্দের বিষয় হচ্ছে যে বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমা আনুষ্ঠানিক ভাবে জাতিসংঘ কর্তৃক ‘জাতিসংঘ বেসক ডে’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। জাতিসংঘের ঘোষণা বৌদ্ধ ধর্মকে শান্তি, স¤প্রীতি ও মানবতার ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দান করেছে। বুদ্ধের শিক্ষার দর্শন মতে একজন মানুষকে সতর্কতার মাধ্যমে মনকে একাগ্র সাধনায় নিয়োজিত রেখে সত্যিকার মানসিক প্রশান্তি অন্বেষণে নিবেদিত থাকতে হবে। এটি অর্জনের একমাত্র উপায় হলো মনকে সকল পাপ কর্ম থেকে বিরত রাখতে হবে যথা রাগ (আসক্তি), দ্বেষ (হিংসা) এবং মোহ (অজ্ঞানতা)।
ধম্মপদে উল্লেখ আছে : ‘সব্ব পাপসস অকারনং কুসলস উপ্সম্পদা সচিত্ত পরিয়োদপনং এতং বুদ্ধান সাসনম’। মৌলিকভাবে বৌদ্ধ ধর্মের মহৎ শিক্ষা নাম রূপ (মন এবং দেহের) বিজ্ঞানমনস্ক আভিধানিক অর্থকে বুঝিয়ে থাকে। অর্থাৎ সমস্ত খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে, ভাল কাজ সম্পাদন করতে হবে এবং মনকে পবিত্র রাখতে হবে। দ্ব›দ্ব-কবলিত পৃথিবীতে বিশেষ করে বর্তমান যুদ্ধ বিক্ষুব্ধ বিশ্বে যেখানে মানবতার মহান মূল্যবান সম্পদ যথা জীবনবোধ ও মানবতা বোধ পশু শক্তির যাঁতা কলে নিষ্পেষিত হচ্ছে এবং যেখানে মারনাস্ত্রের থাবা ভয়, সন্ত্রাস, হিংসা বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের মনকে বিষিয়ে তুলেছে সেক্ষেত্রে বুদ্ধের অহিংসা বাণীর বাস্তবায়ন অনিবার্য ভাবে সময়োপযোগী দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধম্মপদে উল্লেখ করা আছে-
‘ন হি বেরন বেরানি সম্মন্তীদ কুদাচনং
অবেরন চ সম্মন্তি এসো ধম্মো সনন্তনো’।
জগতে কখনো শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার উপশম হয় না, মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতার উপশম হয়। আজকের দিনে তাই আমাদের ভাবতে হবে, ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, নিষ্ঠুরতার বিপরীতে মানবতা, যুদ্ধের বিপরীতে শান্তি, হিংসার বিপরীতে অহিংসার কথা। আর তাই যদি হয় তাহলে আমরা উন্নত পরিবেশে উন্নত বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবো এবং নরক সদৃশ পৃথিবীকে স্বর্গে রূপান্তরিত করতে পারবো।
বুদ্ধের শিক্ষা, বাণী এবং চিন্তাধারাই বৌদ্ধ দর্শনের উৎস ও ভিত্তি। বৌদ্ধ ধর্ম মতে মুক্ত চিন্তাধারা, স্বাধীন পক্ষপাতহীন চিন্তা চেতনার গতিধারা বৌদ্ধ জীবন ধারায় পরিচ্ছন্ন ভাবে প্রতিফলিত। ধর্মীয় কুসংস্কার এবং অন্ধ বিশ্বাস বৌদ্ধ দর্শনের মূল ভাবাদর্শকে কলুষময় ও মর্যাদাহীন করে।অতি প্রাকৃত কোন মতবাদ বা ধারণা, রহস্যঘন মতবাদ বা বিশ্বাসের স্থান বৌদ্ধ ধর্মে নেই। এ ধর্মে অলীক কোন বিষয়েরও স্থান নেই। তাই মানুষের প্রতি বুদ্ধের উদাত্ত আহবান ছিল ‘এস, দেখ, পরীক্ষা করে নাও, যাচাই বাছাই করো, তারপর গ্রহণ করো’। বুদ্ধ তাঁর অনুসারীদের মাঝে একজন চিকিৎসক সদৃশ ছিলেন। চতুরার্য সত্যে নিহিত (১) দুঃখ, (২) দুঃখের কারণ (৩) দুঃখ নিরোধ গামী এবং (৪) দুঃখ নিরোধের উপায় অর্থাৎ সর্বশেষ আর্য অস্টাংগিক মার্গ অনুসরণের পদ্ধতিটি একজন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু অনৈক্য ও সাযুজ্য নির্বিশেষে বৌদ্ধ ধর্ম বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রায়োগিক ও অভিযোজনীয় একটি বিষয়। আলবার্ট আইনস্টাইনের মতে পৃথিবীতে কোন ধর্ম যদি আধুনিক বিজ্ঞান মনস্কতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে তাহলে সেটি হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্ম। বুদ্ধের মহিমান্বিত উপদেশ সম্বলিত ধর্ম বুদ্ধের বুদ্ধত্ব লাভের সময় থেকেই প্রচারিত হয়ে আসছে। বুদ্ধের চার আর্য সত্যের মধ্যেই বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শনের মুলকথা নিহিত আছে। আর চার আর্য সত্য হচ্ছে বুদ্ধের সমগ্র ধর্ম ও দর্শনের সারকথা। পরিশুদ্ধ মন ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও অভাব হেতু বহু জাতি সভ্যতার উত্থান পতন দেখে আসছে, মুখোমুখি হয়েছে অনেক ধ্বংস ও অবক্ষয়ের, কিন্তু বুদ্ধের মৈত্রী, করুণা, মুদিতা (অপরের সুখে সুখী হওয়া) ও উপেক্ষার (সযত্ন প্রশান্তি) আলোকে উদ্ভাসিত পৃথিবী সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সমৃদ্ধির বিকাশে সততই অনুবর্তিত। করণীয় মৈত্রী সূত্রে উল্লেখ আছে, মা যেমন তাঁর জীবনের সর্বস্ব ত্যাগের মাধ্যমে পরম স্নেহে সন্তানের জীবন রক্ষা করেন, গভীর মমতায় সন্তানকে ভালবাসেন তেমনি সকল মানুষকে তথা জীবের মংগল সাধনের জন্য আমাদেরকে আত্মনিয়োগ করতে তথাগত বুদ্ধ উপদেশ দিয়েছেন, এমনকি শত্রæর প্রতি অনুকম্পা ও তাদের মংগল কামনায় সচেষ্ট থাকতে উপদেশ দিয়েছেন।
আজ বিশ্বব্যাপী মানবতা নির্মমভাবে বিপর্যস্ত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি অস্বাভাবিক ভাবেবিঘ্নিত ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। খুন, হত্যাযজ্ঞ, নিষ্ঠুরতার বিষবাষ্প অবিরত মানবতা ও প্রতিটি ধর্মের পবিত্রতা নষ্ট করে চলেছে। ধর্মীয় উন্মাদনা ও পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা প্রতিটি ধর্মের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ের উপর কালিমা লিপ্ত করে চলেছে। ধর্মের সত্যিকার ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ পার্থিব ও বৈষয়িক স্বার্থের কালোমেঘে ঢাকা পড়েছে। মানুষ তথা ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে ক্ষমতা ও যশ খ্যাতির পেছনে ছুটে চলেছে। অবক্ষয় ও অসমতা স্বাভাবিক ভাবে বিশ্বের শান্তি স্থাপনে বিঘ্ন ও অন্তরায় সৃষ্টি করে চলেছে। বিষময় কর্মকান্ড যেমন নিষ্ঠুরতা, হত্যা, কুসংস্কার, বৈষম্য সকল ধর্মের পবিত্রতাকে ম্লান করে চলেছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা সকল ধর্মের উপর কালিমা লেপন করে যাচ্ছে। সত্যিকার ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষ এবং ধর্মের ধ্বজাধারী ব্যক্তিদের মন থেকে দ্রæত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। সাধারণভাবে বিশ্বব্যাপী মানুষের মন থেকে ধর্ম ও ধার্মিকতা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এ অপ্রত্যাশিত প্রবনতা প্রতিহত করতে সকল ধর্মের অনুসারীদেরকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ধর্মের মূল্যবোধ সৃষ্টির মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আজকের বুদ্ধ পূর্ণিমার শুভ দিনে ধর্ম ও মানবতার কল্যাণে হাতে হাত, কাঁধে কাঁদ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
এ লক্ষ্যে সকল প্রকার ধর্মীয় অনৈক্য দূর করে শান্তি ও স¤প্রীতির বাতাবরণ সৃষ্টিতে আমাদেরকে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানবতার কল্যাণে সৌভ্রাতৃবোধ ও বন্ধুত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাই তাহলে ভালবাসার বন্ধন, করুণা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংহতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা সফল হবে। কাজেই আসুন আমরা সবাই একে অপরকে ভালোবাসি, পরস্পর পরস্পরের প্রতি যত্নশীল হই যাতে জীবনের প্রতিটি স্তরে শান্তির সুবাতাস সৃষ্টিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি। শান্ত সুন্দর বিশ্ব বিনির্মানে সকলের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাক। পৃথিবী কলংকমুক্ত হোক-সবার মনে ধর্ম ও ধার্মিকতা বোধ জেগে উঠুক। জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক