বুকার বিজয়ী উপন্যাসিক গীতাঞ্জলি শ্রী

13

নিজামুল ইসলাম সরফী

গীতাঞ্জলি শ্রী। মূলনাম গীতাঞ্জলিপান্ডে। হিন্দি-সাহিত্যের এ নামটি এ-বছর সংযুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারের তালিকায়। অথচ, গীতাঞ্জলির ঝুলিতে রয়েছে মাত্র পাঁচটি উপন্যাস আর কয়েকটি ছোট গল্পগ্রন্থ। উত্তর প্রদেশের মৈনপুরার আইএএস পরিবারে জন্ম নেওয়া এ নারী ২০১৮ সালে হিন্দিতে প্রকাশিতরেত সমাধি উপন্যাসের অনুবাদের জন্য এ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
মার্কিন লেখক ও অনুবাদক ডেইজিরক ওয়েলরেত সমাধি উপন্যাসকে হিন্দি থেকে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন। নাম দিয়েছেন টম্বঅবস্যান্ড। ২০২১ সালে লন্ডনের এক্সিসপ্রেস এবং ভারতের পেঙ্গুইন বুকস ৬৯৬ পৃষ্ঠার এই অনুবাদ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। হিন্দি ভাষায় এই উপন্যাস আত্মস্থ করেই অনুবাদে নামেন তিনি। সংস্কৃত, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি, ফরাসি ভাষার শব্দ যেমন অসাধারণভাবে এ অনূদিত গ্রন্থে সংযোজন করেছেন, তেমনি যোগ করেছেন সাহিত্যের ন্বতররস আস্বাদন।
টম্বঅবস্যান্ড পাঠে পাঠ কমনে উদিত হতে পারে বর্ডার শব্দটির বহুল ব্যবহার, তার নানা অন্তর্নিহিত অর্থ, ব্যঞ্জনা। সীমারেখা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, লৈঙ্গিক, বয়স, ভৌগোলিক এমনকি ভাষা তাত্ত্বিক অঙ্গনেও হতে পারে; তাই এ শব্দটিও এ উপন্যাসে শৈল্পিক বেশে অন্তর্নিহিতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। গীতাঞ্জলিশ্রী এসব নিয়ে চমত্কারশব্দ-নৃত্য-তরঙ্গ দেখিয়ে শুধু আন্তর্জাতিক সম্মাননা নিলেন না, ভারতীয় উপমহাদেশের যেকোনো আঞ্চলিক ভাষা সাহিত্য অঙ্গনকে আরো প্রসারিত হওয়ার দ্বার খুলে দিলেন।
টম্বঅবস্যান্ড এ যে গল্পটি গীতাঞ্জলি শুনিয়েছেন, তার মূল সুর হলো পথের শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে!… গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ৮০ বছরের একবৃদ্ধা। প্রেক্ষাপট দেশভাগের। ছত্রেছত্রে কাঁটা তারের রক্তাক্ত যন্ত্রণা। স্বামী হারানোর পর ঐ বৃদ্ধা সংসার- সন্তানের আপত্তি ফুত্কারে উড়িয়ে দিয়ে যেতে চান পাকিস্তানে। দেশ ভাগের ক্ষতের মধ্যে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা আর একজন নারীর উপলব্ধির পরিপূর্ণতাই ফুটে উঠেছে গীতাঞ্জলির দীর্ঘ উপন্যাসে। বুনোট, নিশ্বাসের ওঠাপড়ার মতো এগিয়ে যাওয়া এই উপন্যাস সম্পর্কে বুকারের চেয়ার অফজাজেস ফ্র্যাঙ্ক ওয়াইন বলেছেন, ক্যালাইডোস্কোপের কাচের মধ্যে দিয়ে সম্পর্ক, বয়স, নারী, পুরুষ, পরিবার এবং সর্বোপরি একটা দেশ, একটা জাতিকে দেখানো হয়েছে এই উপন্যাসে। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দেশ ভাগের প্রেক্ষাপটে জ্বলন্ত দলিলএটি। আর গীতাঞ্জলিশ্রী বুকার পেয়ে উচ্ছ¡সিত হয়ে বলেছেন বুকার পাব বলে কখনো কল্পনাও করিনি। পেতে পারি বলে মনেও হয়নি। এটা অসম্ভব একটা পাওনা। আমি অভিভূত, আনন্দিত, সম্মানিত এবং বিনীত। গীতাঞ্জলিশ্রীর সৌভাগ্য যে, এই প্রথম হিন্দি ভাষায় রচিত এবং ইংরেজিতে অনূদিত বইয়ের জন্য এককালের উপনিবেশিক দেশ থেকেই তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। হিন্দি-সাহিত্যের লেখালেখি আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনার বিষয় বস্তু হয়েছে, এমন ঘটনা খুবই কম। অন্যদিকে নিম্নবর্ণের মানুষের বিশেষ করে দলিত, নারী শ্রেণির সম্পৃক্ততাও অনেকটা ফাঁকা মাঠের মতো। আবার, উলটোদিকেএটাওসত্যযে, অনেক ভারতীয় সরাসরি উপনিবেশ ভাষা ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করে কেবল স্বদেশ-সীমানা নয়, সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিসরেও সম্মানজনক স্থান নিতে সক্ষম হয়েছেন। তার মধ্যে ভিএসনইপল, অরুন্ধতীরায়, কিরণ দেশাই, নীরোদ সি চৌধুরী, সলমান রুশদির নামউলে­খকরা যেতে পারে। এসব সাহিত্য ব্যক্তিত্ব ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করার জন্য স্বদেশ, স্বভাষীদের কাছে সমালোচিত হয়েছেন, তেমনি আবার বুকার কিংবা ম্যান-বুকার পুরস্কার লাভ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি, আলোচনা, সম্মাননার অংশীদারও হয়েছেন।
গীতাঞ্জলীশ্রীর জন্ম ১৯৫৭ সালের ১২জুন ভারতের উত্তর প্রদেশের মৈনপুরি জেলায়। তার বাবাছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। বাবার বদলি চাকরির সুবাদে ছোট বেলা কেটেছে উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। দেখেছেন মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবন। খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছেন ঘাটে ঘাটে বাঁধা জীবনের নানা বাঁকগুলো। আত্মার নিবিড়তম অনুভূতি দিয়ে উপলব্ধি করেছেন চারপাশের মানুষগুলোর সুখদুঃখের প্রকাশিত ও নিভৃত গল্পগুলো। শৈশব-কৈশোরের বৈচিত্র্যময় এক গুচ্ছ ঘটনার অনবদ্য শিল্পায়ন তাররেত সমাধি উপন্যাস।
গীতাঞ্জলীশ্রীর মতে-তখনকার সময়ে আজ কাল কার মতো ইংরেজির চেয়ে হিন্দি বই, পত্রিকা ও ম্যাগাজিনসহ জলভ্য ছিল বেশি। তাই হিন্দি ভাষায় লেখা বই-ই পড়া হতো বেশি। তখন থেকে হিন্দির প্রতি অনুরাগ আর ভালোবাসার জন্ম। আর মাতৃভাষা হিন্দি হওয়াতে লেখালেখির জন্য হিন্দি ভাষার ক্ষেত্রটি ছিল সুপরিসর ও স্বাচ্ছন্দ্যের। সেখান থেকে ইরেত সমাধি হিন্দিতে লেখা।
গল্পের মাধ্যমেই মূলত তার লেখালেখির সূচনা। ১৯৮৭ সালেহান্স ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় প্রথম ছোট গল্প বেলপত্র। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় ছোট গল্পের বই অনুগুঞ্জ’। এ পর্যন্ত তার মোট পাঁচটি উপন্যাস ও বেশ কিছু সংখ্যক ছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজিতে অনূদিত তার লেখা ‘মাই’ উপন্যাসটি ২০০১ সালে ক্রসওয়ার্ড বুক অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিল। গীতাঞ্জলীশ্রীর লেখা ইংরেজি ছাড়াও জার্মান, ফরাসি, কোরিয়ান ও সার্বিয়ান ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
বুকার প্যানেলের বিচারক ফ্রাংক ওয়েইনের মতে-বইটির চিত্রকল্প, কাহিনি ও চরিত্রা বলি খুব সহজে যেমনভাবে পাঠককে বিমোহিত করবে ঠিক তেমনি ঘটনা পরিক্রমা ও বর্ণনা নিমিষেই আবার শোক সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। দেশ ভাগও তার নীরব যন্ত্রণার অবারিত ঘটনার একটি হৃদয়গ্রাহী গল্প আত্মপোলব্ধির নিরিখে আবেগের কুশলতায় উপস্থাপিত করেছেন লেখক এ উপন্যাসে। শৈশবে উত্তর প্রদেশে থাকাকালীন সেখানকার স্থানীয় স্কুল থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করে নয়াদিল্লির লেডী শ্রী রাম কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করেন গীতাঞ্জলীশ্রী। তারপর জওহর লাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক ভারতের ইতিহাসের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পিএইচডি করেছেন বারোদার মহারাজা সায়াজিরাও ইউনিভার্সিটি থেকে। চৌষট্টি বছর বয়সি এ লেখক বর্তমানে দিল্লিতে বসবাস করছেন। লেখালেখিতেই নিবিষ্ট আছেন ৬৪ বছর বয়সে ও আর সাহিত্যের জন্য ত্যাগ করেছেন জীবনের যত ইচ্ছে কুঁড়ি।
তথ্যসূত্রঃ উইকিফিডিয়া থেকে ভাষান্তরিতঃ নিজামুল ইসলাম সরফী ।