বীর মুক্তিযোদ্ধা এম.এ হান্নান স্মরণে

28

মো. খোরশেদ আলম

১৯৭৪ সালের ১২ জুন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রামের কাছে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম এম.এ হান্নান। জন্ম ১৯৩০ সালের ৩০ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের তেহট থানার ঘাসপুর গ্রামে। তাঁর পিতা মাওলানা মোহাম্মদ মুহিবুর রহমান ব্রিটিশ-ভারত কংগ্রেসে ও পরে মুসলিমলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি সপরিবারে মেহেরপুর জেলার আমঝুপিতে এসে বসতি স্থাপন করেন। ১৯৪৯ সালে মেহেরপুরের দরিয়াপুর হাইস্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন এবং ১৯৫১ সালে কুষ্টিয়া কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন। ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে বি.এ অধ্যয়নকালে তিনি ’৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। পরে চট্টগ্রামে এসে সিটি কলেজে নৈশ বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সম্মেলনে (আই.এল.ও কনভেনশনে) যোগ দেন তিনি। জাতীয় শ্রমিক লীগ কেন্দ্রিয় কমিটির সহ-সভাপতি বাংলাদেশ রেল শ্রমিকলীগের সভাপতি ও চট্টগ্রাম জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিশাল রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবনের কথা এ প্রজন্ম আদৌ জানে কিনা আমার সন্দেহ ? ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ’৬২ এর কুখ্যাত হামিদুর রহমানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ’৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন আগরতলার ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে আন্দোলন ’৬৮ ও ’৬৯ এর গণআন্দোলন, ’৭০ এর নির্বাচন ’৭১ এর মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ২৬ মার্চ বিকাল বেলায় প্রথম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা প্রচারকারী এই মহান নেতা বহু আন্দোলন সংগ্রামে প্রতিকৃত ও দলের কাÐারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয়জন ও আস্তাভাজন ছিলেন। চট্টল সার্দুল মরহুম এম.এ আজিজের সাথে মূলত তিনি রাজনীতি করতেন। মরহুম এম.এ হান্নান আমার পরম আত্মীয়। তাঁর ৪র্থ ছেলে মাহফুজ ছিলেন আমার ছোট বেলার বন্ধু। আন্দরকিল্লা এম.ই.এস স্কুলে আমরা একসাথে লেখাপড়া করতাম। ১৯৮২ সালে স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে একসাথে দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলাম। বছর সাতেক পরে আমার ছোট বোন শাহানার সাথে তার বিয়ে হয়ে। কাতালগঞ্জ বৌদ্ধ মন্দিরের পার্শ্বে বঙ্গবন্ধুর দেয়া একটি বাড়িতে এম.এ হান্নান সপরিবারে থাকতেন। তাঁর বড় ছেলে মারুফ ভাই, ফারুক, মাসুদ, মাহফুজ, মাসুম ও মামুন, বড় মেয়ে রোজী আপা, ডেজী, মুক্তি, লাকী আমরা সবাই একসাথে আড্ডা দিতাম। ডেজীর স্বামী এফ.আই কামাল বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। এছাড়া ফারুক ভাই রাশিয়ান একটি মেয়েকে বিয়ে করে দেশে এনেছিলেন, অত্যন্ত মিশুক ছিলেন ভাবী। খালাম্মা আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তাঁর জন্মও ছিল মাদারবাড়ীর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। নিউ মার্কেটের নিচ তলায় বিকিকিনি নামে তাদের একটি কাপড়ের দোকান ছিল। মাঝে মধ্যে গিয়ে আমি সেখানেও আড্ডা দিতাম। কিছুদিন পর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ফারুক ভাই রাশিয়া চলে যান। মাসুদ ভাই কানাডায়। তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বর্তমানে সামাজিক ও ব্যবসায়িকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। মেয়েরা সবাই দেশের বাইরে কানাডা, আমেরিকাতে সবাই সপরিবারে ব্যবসায়িক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
আমার ছোট বোন শাহানাকে খালাম্মা অত্যন্ত স্নেহ করতেন ছেলের বউ হিসেবে নয় যেন নিজের গর্ভে ধারণ করেছেন। এম.এ হান্নানের স্ত্রী হিসেবে তাঁর মাঝে কোন অহংকার ছিল না। তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও একই রকম। এম.এ হান্নান বেঁচে থাকলে হয়তো বা এমপি হয়ে মন্ত্রী হতেন। বেঁচে থাকা অবস্থায় কোন দিন তাঁর মাঝে কোন উচ্চ বিলাসী চিন্তা ভাবনা ছিল না। ৭০ ও ৭৩ এর নির্বাচনে তিনি ব্যতীত সকলেই দলীয় মনোনয়ন নিয়েছিলেন। দলের প্রতি সদা আনুগত্য ছিল তাঁর। এটি রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য যা এখনকার নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে আশা করা যায়না।
তিনি যে গাড়িতে সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন সেই। ‘ভক্সেল ভিভা’ গাড়িটি তাঁর কাতালগঞ্জ বাড়িতে দীর্ঘদিন পড়েছিল। আমি সব সময় সে গাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করতাম। কারণ, তাঁর মৃত্যুটি আমার কাছে স্বাভাবিক ছিল না। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম বিমান বন্দরের নামকরণ করেন মরহুম এম.এ হান্নানের নামে। কিন্তু, অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বসবতী হয়ে পাঁচ বছর পর খালেদা জিয়া সরকার গঠন করে এম. এ হান্নানের নাম পরিবর্তন করে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর নামকরণ করেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন, তিনি যেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম এম.এ হান্নানের নামে একটি বড় ধরনের স্থাপনা তৈরি করেন। যাতে এ প্রজন্ম জানতে পারে এ মহান নেতা সম্পর্কে। পরিশেষে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ করি তিনি যেন তাঁকে জান্নাতবাসী করেন।

লেখক : শ্রমবিষয়ক সম্পাদক
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ