বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ছালেহ একজন জাতীয় বীরের চির বিদায়

5

জামাল উদ্দিন

একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা, গণ পরিষদ সদস্য ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু ছালেহ আমাদের মাঝে আর নেই। তিনি গতকাল ৩ আগস্ট বিকেল চারটা ২০ মিনিটে সিএসসিআর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি জন্মেছিলেন ১৯ জুন ১৯৪৪ সালে সাতকানিয়া থানার দক্ষিণ ঢেমশা গ্রামে। তার পিতা আনু মিয়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক ও সর্বভারতীয় কংগ্রেসের একজন সদস্য ছিলেন। বড় ভাই আবু সুফিয়ান চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। আবু ছালেহ চট্টগ্রাম সরকারি বাণিজ্য কলেজ ও চট্টগ্রাম আইন কলেজে অধ্যায়ন করেন। ১৯৬১-৬২ সালে তিনি চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের কোষাধ্যক্ষ ও বাণিজ্য কলেজ ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৬২-৬৩ সালে সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৬৩-৬৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও চট্টগ্রাম আইন কলেজ ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
আবু ছালেহ বিদ্যালয়ে অধ্যায়ণকালে ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে নির্বাচনী কর্মকাÐে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের মার্শাল ল আন্দোলনে নেতৃত্বে এবং ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া মিস ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করেন। আবু ছালেহ ১৯৬৭-৭১ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ৬ দফা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম ও ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রাথী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদেও সদস্য ও স্বাধীনতাত্তোর কালে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলে চট্টগ্রাম দক্ষিন জেলা বাকশালের যুগ্ন সচিব হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট তিনি ঢাকার রাজপথে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ ও ৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তুখোড় সংগঠক এবং অসাধারণ তেজস্বী বক্তা আবু ছালেহ তার যে তেজোদীপ্ত বক্তৃতা স্রোতাদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দিত। তাঁকে এম.এন.এ. প্রার্থী মনোনয়নের পরে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয় সে এক কিংবদন্তী। চট্টগ্রামে তিনি স্বাধীকার ও স্বাধীনতা লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ হয়ে ওঠেন। তাঁর নেতৃত্বে জনগণও এক সংগ্রামমুখর অথচ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য একাট্টা হয়ে ওঠে। স্বভাবতই নির্বাচনে তিনি অভূতপূর্ব বিজয় অর্জন করেন। বাঙালিরা সারাদেশের মত নিজেদের কুঁড়েঘরের ছেলেকে নিজেদের মাথার মনি বানিয়ে নিল। কিন্তু সে সুখ তো বেশীদিন রইল না। সবাই জানেন, এরপরে কি ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশে। ২৫ মার্চের কালো রাত্রির পর বর্বর পিশাচের মত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নেমে এসেছিলো বাংলার শহর বন্দর মহকুমা, থানা ও গ্রাম গ্রামান্তরে। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে, খুন রাহাজানি ধর্ষণে বাংলার বুক তারা ছিড়ে খাবলে খাওয়া শুরু করল। বিদীর্ণ চিৎকারে হাহাকার করে উঠল চির দুঃখিনী বাংলা মা। কিন্তু না। বাংলার দামাল ছেলেরা মেনে নিল না সে অবিশ্বাস্য জঘন্যতম পৈশাচিক বর্বরতা ও হিংস্রতা। তারা সংগঠিত হতে থাকল অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্বে। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভ‚মিকে শত্রæর হাত থেকে মুক্ত করতে পুরো নয়টি মাস যুদ্ধের ময়দানে ছিল। আবু ছালেহ সাহেব তাদেরই একজন। আমার সেই কিশোর বয়সে যেভাবে তাঁকে দেখেছিÑ ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল ৯টা থেকে আনোয়ারা থানার আনোয়ারা গ্রামের দক্ষিণে বিলের মাঝে ধানক্ষেতে একের পর এক হেলিকপ্টার অবতরণ করতে থাকে। এভাবে হেলিকপ্টার অবতরণ করতে দেখে নিকটবর্তী শিলাইগড়া, সৈয়দকুচিয়া, বিলপুর ও আনোয়ারা গ্রামের জনসাধারণ ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে ধানক্ষেতে লুকোতে থাকে। তখন ফসলের ভরা মৌসুম। যেই হেলিকপ্টরটি অবতরণ করছে সেটি থেকে লোকজন নামতে দেখা গেলেও উড়াল দেয়ার পর নেমে পড়া লোকগুলো যেন ধানক্ষেতেই হাওয়া হয়ে যায়। এভাবে হেলিকপ্টার নামতে থাকায়, কেউ বলছে পাকিস্তানি সৈনিক নামছে, কেউ বলছে ভারতীয় সৈনিক। প্রায় ঘন্টাধরে বেশ কয়টি হেলিকপ্টার অবতরণ করল। ইতিমধ্যে আমাদের শিলাইগড়া গ্রামের লোকজন পুকুর পাড়ে জড়ো হয়ে বিষয়টি জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ে। বড়দের কেউ কেউ বয়সে যারা ছোট তাদেরকে কাছে গিয়ে দেখার জন্য উৎসাহ দিচ্ছে। সৈনিকরা পাকিস্তানি কিংবা ভারতীয় হউক ছোটদের কিছু করবে না। আমি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। আমার চাচাতো ভাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়–য়া আবুল কালামকে সাথে নিয়ে সামনের দিকে এগুতে লাগলাম। সামনে খাল। খালপাড়ি দিয়ে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যেতে হবে। খাল পাড় হয়ে ধানক্ষেতে মাথা গুজিয়ে আল ধরে ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। ততক্ষণে আরো কয়টি হেলিকপ্টার অবতরণ করেছে। আমরা আরেকটু সামনে যেতেই ধানক্ষেত থেকে ‘হল-হল’ শব্দ শুনতে পেলাম। অস্ত্রহাতে একজন সৈনিক আমাদেরকে হাত তোলার নির্দেশ দিলেন। আমরা দু’হাত তুলে ধরলাম। হাতের ইশারায় তিনি আমাদেরকে কাছে ডাকলনে। হিন্দি ভাষায় কি যেন বললেন, আমরা কিছুই বুঝিনি। এক পর্যায়ে বসে থাকার নির্দেশ দিলে আমরা বসে পড়ি। দেখতে পেলাম চতুর্দিকে আরো বহু সৈনিক ধানক্ষেতে অস্ত্র হাতে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। ততক্ষণে আরো একটি হেলিকপ্টার অবতরণ করল, হেলিকপ্টারের গায়ে ইংরেজীতে লেখা ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আমরা নিশ্চিত হলাম হেলিকপ্টার গুলো ইন্ডিয়া’র। একটু সাহস পেলাম, ইন্ডিয়ার সৈনিক তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। প্রায় সাড়ে দশটার দিকে আরেকটি হেলিকপ্টার অবতরণ করল, এভাবে ১০/১৫ বার হেলিকপ্টার উঠা-নামা করেছে। সর্বশেষ যে হেলিকপ্টার নামল ঐ হেলিকপ্টার থেকে প্রায় ১৫/২০ যাত্রী নামলেন, কিন্তু তারা কেউ ধানক্ষেতে আত্মগোপন করল না। দাঁড়িয়ে চতুদিকে কি যেন দেখছে। আমাদেরকে যেই সৈনিক বসিয়ে রেখেছে, তিনি দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন হেলিকপ্টারের দিকে। সুটামদেহি একজনের সাথে কি-যেন বললেন। ফিরে এসে আমাদেরকে নিয়ে গেলেন ঐ অফিসারের কাছে। অফিসারটি যেমনি লম্বা, তেমনি মাথায় দীর্ঘ চুল ও গোফ। তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন করলেন, তোয়ার নাম-কি? বললাম, জামাল উদ্দিন। এভাবে নানা প্রশ্ন, আমিও উত্তর দিলাম চট্টগ্রামী ভাষায়। শেষে তিনি বললেন, সাতকানিয়ার এম.এন.এ আবু ছালেহ সাহেবের নাম শুনেছো? বললাম শুনেছি। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা, নৌকা মার্কায় নির্বাচনে জিতেছেন। এবার তিনি বললেন- আমি- আবু ছালেহ। তখন আমার সাহস আরো বেড়ে গেল। ঐ সময় কয়েক অফিসার বড় একটি ম্যাপ খুলে কি যেন দেখছিলেন। ছালে সাহেব, আমাকে প্রশ্ন করলেন, থানা কোন দিকে? ডাক বাংলো? আনোয়ারা হাইস্কুলের ময়দান? বললাম এই তো সামনে, আমি আনোয়ারা হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। চলো আমাদের সাথে। ইতোমধ্যে এক অফিসার হাতে থাকা লাউডস্পিকারে কি যেন বললেন, মুহূর্তের মধ্যে হুহু করে ধানক্ষেত উঠে ধারালো সৈনিকরা। যেন, পুরো বিলজুড়ে সৈনিক। সে এক অভ‚তপূর্ব দৃশ্য। আমি সৈনিকদের পথ দেখিয়ে আগে আগে আনোয়ারা গ্রামের জয়কালি হাট পাড় হয়ে থানা সদরের দিকে রওয়ানা হলাম। স্কুলের ময়দানে অবস্থান নিলেন সৈনিকরা। আবু ছালেহ সাহেব এবং ভারতীয় অফিসাররা নিকটবর্তী ডাক বাংলোয় অবস্থান নেন। ডাক বাংলো দারোয়ানকে ডেকে ছালে সাহেব নির্দেশ দিলেন, সার্কেল অফিসারকে ডেকে আনতে। তখন প্রায় দুপুর। এমন মুহূর্তে যৌথবাহিনীর খাবারের আয়োজন পড়ল সার্কেল অফিসারের উপর। সার্কেল অফিসার পড়লেন চরম বেকায়দায়। এতগুলো লোকের জন্য খাবার আয়োজন কী-ভাবে করবে? তিনি ইতস্তত করলে, আবু ছালেহ সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আশে-পাশে কোন ধনী লোকের বাড়ি আছে কিনা, তাদের পাওয়া যাবে কিনা? আমি জবাবে বললাম, চতুদিকে হিন্দু বাড়ি, ওদের বাড়িঘর তো পাকিস্তানি সৈনিক ও রাজাকাররা পুড়ে দিয়েছে। ওরা বাড়িঘর ফেলে পালিয়ে গেছে। পাশের সৈয়দ কুচিয়া গ্রামে দেলোয়ার হোসেন নামক এক ধনী লোক আছেন, তিনি মুসলীগ নেতা, ওনার এক ভাই মুক্তিযোদ্ধা নাম হুমায়ুন কবির। এই প্রস্তাবটি তাকেই দেয়া যায়। অমনি ছালে সাহেব বললেন, তুমি কি ওনাকে চিন? বললাম চিনি। আমার সাথে অস্ত্রধারী ৫জন সাদা পোশাকের সৈনিক দিলেন, এবং বললেন, এম.এন.এ আবু ছালেহ সাহেব আপনাকে সালাম দিয়েছেন, ডাকবাংলায় যেতে অনুরোধ করেছেন। আমি সৈনিকদের সাথে সাথে সৈয়দকুচিয়া গ্রামে পৌঁছেই দেখি দেলোয়ার সাহেব পুকুরের পাকা ঘাটে অনেককে সাথে নিয়ে গল্প করছেন, আমার সাথে আসা একজন দেলোয়ার সাহেবকে এম.এ.এ আবু ছালেহ সাহেবের সংবাদ জানালেন। তিনি প্রথমে কি যেন চিন্তা করলেন, পরক্ষণে আমাদের সাথে ডাকাংলায় চলে আসলেন এবং আবু ছালেহ সাহেবের সাথে দেখা করলেন। ছালে সাহেব সামরিকদের খাবার আয়োজনের কথা বললে, তাতে তিনি রাজী হয়ে যান। বাড়ি ফিরে তড়িৎ গতিতে গরু ও খাসি জবাই করে বিকেল ৩টার দিকে গরুরগাড়ী যোগে ভাত-মাংস-তরিতরকারি নিয়ে আনোয়ারা হাইস্কুল ময়দানে পৌঁছলেন। এবং কয়েকশত সামরিক বাহিনীর সদস্য একযোগে খাওয়ার সেরে নিলেন। এই সময় ডাক বাংলোয় পৌঁছলেন আনোয়ারা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আবুল মনসুর চৌধুরী। তিনি ছালেহ সাবেকে নিজ পরিচয় দিলেন। ঐদিনই যৌথবাহিনীর সৈনিকরা মেরিন একাডেমিতে যাবেন। আবুল মনসুর চৌধুরী তাঁদের পথ প্রদর্শন করে মেরিন একাডেমির দিকে ছুটলেন। তাদের আগমনের পূর্বেই কমান্ডার শাহজাহান ইসলামাবাদীর নেতৃত্বে একাডেমির পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। এবং ফজলুল কাদের চৌধুরী সপরিবারে বার্মা পালিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়েছে, তাকে বটতলীর ইয়াকুব আলী চেয়ারম্যানের বাড়িতে রাখা হয়েছে। সবকিছু জানার পর কমান্ডার আবু সালেহ মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশ দিলেন আটক ফকা চৌধুরী ও তাঁর পরিবারকে যেন মেরিন একাডেমিতে তাঁর সামনে হাজির করে। সপরিবারে ফকা চৌধুরীকে বটতলীর এয়াকুব আলী চৌধুরীর বাড়ি থেকে নিয়ে এলেন মেরিন একাডেমিতে। ফকা চৌধুরী মেরিন একাডেমিতে প্রবেশ করে হাত বাড়িয়ে এম এন এ আবু সালেহ এর সাথে মোলাকাত করতে সামনে এগিয়ে আসলে, প্রতি উত্তরে আবু সালেহ বলেন- ও ধস াবৎু ংড়ৎু ভড়ৎ ুড়ঁৎ ধপঃরারঃরবং . সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফকা চৌধুরী হাত ফিরিয়ে নেন। বাংলার রাখাল রাজাদের সে-ই একজন ছিলেন আমাদের প্রিয় ছালেহ ভাই।
দিন যায়। বেশী দামে কেনা আমাদের স্বাধীনতা খুব কম দামে বেচা হয়ে যায়। হায়, বাঙালি তার বিজয় ধরে রাখতে পারে না। ১৯৭৫ এ নৃশংসভাবে খুন করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং তাঁর পরিবারের প্রায় সকল সদস্য এবং তার সাথে বাংলাদেশের গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, মূল্যবোধ, গণতন্ত্র, সভ্য বিবেক, জাতির শ্রেষ্ঠ বিজয় এবং বীর রাখাল রাজাদের। ফরাসী বিপ্লবের বিজয়ের পর মাত্র ৭৩ দিন সে বিজয় ধরে রাখতে পেরেছিল সে দেশের বিজয়ী শ্রমিক শ্রেণী। কিন্তু অচিরে তাদের ওপর নেমে আসে ভয়াবহ স্বৈরশাসনের দুঃসহ নিপীড়ন। বাংলাদেশের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার সূর্যটাও এক দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অমানিশায় ডুবে যায়। সেই স্বৈরশাসনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জন্ম নিতে থাকে ধূর্ত-দালাল, লম্পট খল নায়কেরা। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে নিয়ে যারা দেশের খোল নলচে পাল্টে দিতে থাকে এবং প্রতিশ্রæতিশীল প্রগতিকামী দেশটির মুখ ঘুরিয়ে দিতে থাকে সম্পূর্ণ উল্টো দিকে। সেই বাংলাদেশ উদ্ভট উটের পিঠে চড়ে নিশি পাওয়া যাত্রীর মত পিছনে ছুটে । আর তার মুক্তির সে মহান বিজয়ী নায়কগণ এখন বিধ্বস্ত ও বিপন্ন জীবনের বোঝা কাঁধে নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছে। ’৭১ এর যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দেওয়ার অপরাধে তাঁদেরকে খুন করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ওরা সহ্য করতে পারেনি। এ দু’টোকে নিঃশেষ করে দিয়ে তারা একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল।
পৃথিবীর আর কোন দেশে স্বদেশের স্বাধীনতার বীর সৈনিকদের এমন অপমানজনক অবস্থায় নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। কিন্তু এটি বাংলাদেশ বলে কথা। সব সম্ভবের দেশ যেন এই বিচিত্র দেশ। আফসোস! এত ভুলো কেন বাঙালির মন! কোথায় গেল তাদের সে তেজ, কোথায় গেল সে আত্মসম্মানবোধ। পরের লাথি খেতে এবং করজোড়ে কুর্ণিশ করতে তাদের এত আনন্দ কেন! কবি গুরুর সে আক্ষেপÑ ‘রেখেছ বাঙালি করে। মানুষ করনি’ই কি তাহলে চরম সত্যি। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উত্তর ঐতিহাসিক সে স্পর্ধিত উচ্চারণÑ ‘কবি গুরু তুমি দেখে যাও, আমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে, তারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে,’ ওই দৃপ্ত অহংকার কি মিথ্যা হয়ে গেল ! না সেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর স্বৈরশাসকদের আবারো জনগণ বিতারিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগই এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। এখন আমাদের সামনে আছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসনা। তাঁরই নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশাসনযন্ত্রের স্তরে স্তরে ঘাপটি মেরে বসে আছে স্বাধীনতা বিরোধী তথা তাদের প্রেতাত্বারা। দলের দুঃসময়ে যারা জেল-জুলুম অত্যাচার সহ্য করে দলকে ক্ষমতায় এনেছেন, তাদের এখন নিজ দলেই কোন মুল্যায়ন নেই। তৃণমূল আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা এখন সংগঠন কিংবা ক্ষতার বাইরে। গ্রাম, থানা পর্যায়ে কোথাও ত্যাগী নেতাকর্মীদের ঠাই নেই। তেমনি নানাভাবে অবহেলার শিকার জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারাও। এম.এন.এ আবু ছালেহ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের একজন। যুদ্ধকালে পূর্বাঞ্চলীয় ডেপুটি কমান্ডার আবু ছালেহ জীবন সায়াহ্নে অসুস্থ দেহমন নিয়ে দীর্ঘদিন কাল হরণ করেছেন তাঁরই গড়া বাংলাদেশে! জীবনভর সৎ ও নিষ্ঠাবান জীবন অতিবাহিত করে পরিণত বয়সে এসে তিনি বিত্তহীন। অবশ্য বিত্তহীন এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই। এদেশের সম্পদ তো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর পাচার হয়ে গেছে দুবর্ৃৃত্তদের হাতে। সামরিক দুঃশাসনের পা ছুয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে দুর্বৃত্তরা দেশটাকে ভাগ করে নিয়েছে নিজেদের মধ্যে। আবু ছালেহ-এর মতো নেতারা সে নোংরা সিঁড়িতে পা রাখতে পারেননি, আত্মবিক্রিত সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার কথা ভাবতেও পারেননি কোনোদিন। তাই ধুঁকে ধুঁকেই কাটাতে হবে তাদের এ জীবন!
‘প্রজন্ম একাত্তর’- এর একটি পোস্টারে লেখা রয়েছে ‘তোমাদের যা বলার ছিল, বলছে কি তা বাংলাদেশ?’ কী বলার ছিল বাংলাদেশের? কী ছিল ’৭১ এর অঙ্গীকার ? কথাটি ছিল এমনÑ একটি স্বাধীন দেশ হবে, যেখানে সব মানুষ তাদের ন্যায্য হিস্যা পাবে। পাবে ভাত, কাপড়, শিক্ষা, বাসস্থান আনন্দময় সচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তা। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ছালেহ সাহেব তাদেরই একজন। নগরীর চেরাগী পাহাড়ের নিকটে পুরনো একটি ভবনের ৩য় তলায় বয়সের ভারে নুয়ে পড়া স্বাধীনতার এই বীর যোদ্ধা দীর্ঘ বছর যুদ্ধ করছেন মৃত্যুর সাথে। যার খবর কয়জনই বা রেখেছেন! একগুচ্ছ ফুল নিয়েও কি কেউ তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন? তিনি আজ না ফেরার দেশে চলে গেলেন, কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিয়ে আমরা বলছি, একজন জাতীয় বীরকে আমরা হারালাম!
লেখক: প্রকাশক ও গবেষক