বিশ্ব রাজনীতি ও বহু-মেরু বিশ্বব্যবস্থা

5

অমল বড়ুয়া

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই বিশ্বরাজনীতির পরাশক্তি বলতে বোঝানো হতো ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়া- এসব রাষ্ট্রকে। রাশিয়া তখনও ততটা শক্তিশালী ছিল না। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আন্তর্জাতিক সংঘাত থেকে সযত্নে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধজনিত বিধ্বস্ত সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে সংঘটিত হয় বলশেভিক বিপ্লব। এরই ধারাবাহিকতায় পূর্ব ইউরোপীয় ১৫টি রাষ্ট্র নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের পর থেকেই বিশ্বের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ লক্ষ করা যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন বলশেভিক বিপ্লব সংঘটিত হলে উক্ত বিপ্লবের নেতা লেনিন বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয় ঘটে। এর বেশ কিছুকাল পর ১৯৬৪ সালে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ব্রেজনেভ একটি নতুন মতবাদ নিয়ে হাজির হন, যার মূল কথা ছিল- ‘যদি কোন সমাজতান্ত্রিক দেশে কমিউনিস্ট পার্টি হুমকির মুখে পতিত হয় তবে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি উক্তদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে।’ ব্রেজনেভ নীতির সফল প্রয়োগ ঘটানো হয় ১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ায়।
১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতায় আসীন হয়ে তার পূর্বসূরি ব্রেজনেভের নীতি পরিত্যাগ করেন। ১৯৮৯ সালের ৯ই নভেম্বর পূর্ব জার্মানি বার্লিন প্রাচীর খুলে দেয়। তবে তখন পূর্ব জার্মানি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্র। সেই পূর্ব জার্মানি পশ্চিম জার্মানির সাথে একত্রিত হয়ে ন্যাটো জোটে যোগদান করলে স্নায়ুযুদ্ধের প্রথম পর্বের দ্বিতীয় নাটকটি মঞ্চস্থ হয়ে যায়। পূর্ব ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রুশ-মার্কিন স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল। ১৯৯০ সালে ওয়ারশ প্যাক্ট এর পতন ঘটে। বস্তুত এর ফলেই পাশ্চাত্য শক্তি ইউরোপে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এরপর পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরে আধিপত্য বিস্তারের জন্য সেনা মোতায়েন করতে সমর্থ হয়। ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই ১৫টি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠন করে। ১৯৯১ সালের ৩১ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষিত ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ছিল বিশ-শতকে বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক দুর্যোগ। এর ফলে রাশিয়ার প্রায় ১ কোটি জনগণ বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়। বিছিন্নতাবাদী আন্দোলন মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে বিশ্ব দ্বিমেরু-বিশিষ্ট রাজনৈতিক পরাশক্তি বলের বিভক্তি থেকে একক পরাশক্তি বলে রাজনৈতিক বিশ্বব্যবস্থায় প্রবেশ করে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবেলা করার জন্য আর কোন দেশ বা সংস্থার অস্তিত্ব থাকল না। এতে পূর্ব ইউরোপে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়ে যায়। ন্যাটোর প্রভাব অপ্রতিদ্ব›দ্বী হয় এবং সোভিয়েত প্রভাব বিলুপ্ত হওয়ায় পূর্ব ইউরোপ বাল্টিক অঞ্চল প্রভৃতি স্থানে মোতায়েনকৃত বিপুল মার্কিন সৈন্য ও সরঞ্জাম সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পুনঃ মোতায়েনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে লাভবান হলেও অর্থনৈতিকভাবে এখনো পর্যন্ত পূর্ণ সুবিধা গ্রহণ করতে সমর্থ হয়নি। এ সুবিধাটুকু গ্রহণ করতে সমর্থ হয় চীন। ফলে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সম্প্রতি চীন বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রথম স্থন অধিকার করেছে। তাছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে সবচেয়ে সুবিধা হয়েছে চীনের। চীন একদিকে সোভিয়েত মডেলের সমাজতন্ত্রের বদলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। অপরদিকে তার সমাজতান্ত্রিক পার্টি শৃংখলায় সামান্যতম শিথিলতা প্রদর্শন করেনি। তারা চীনে কমিউনিস্ট শাসন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে আর্থিক দিক থেকেও লাভবান হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন শক্তিশালী হয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র সংযুক্ত হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক জোন তৈরি করেছে। তারা অভিন্ন মুদ্রা ইউরো প্রচলন করেছে যা অত্যন্ত শক্তিশালী মুদ্রা হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি আদায় করতে সমর্থ হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে মধ্য এশিয়ায় কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। মস্কো অতীতে তার মধ্য-এশীয় মুসলিম দেশগুলোর দ্বারা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে চলত। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে সে ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। এর ফলে বিশ্বের নানা স্থানে মুক্তিকামী রাষ্ট্রগুলোতে বিভিন্ন সম্প্রদায় বিদ্রোহ করে বসে। সিংহভাগ মুসলিম দেশ এই বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এদের চিহ্নিত করে ইসলামিক টেররিস্ট গ্রæপ হিসেবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভব ঘটায়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী দেশে দেশে বৈদেশিক নীতি পরিবর্তিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি, রাজনীতি ও মার্কিন মূল্যবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের এক নজিরবিহীন আধিপত্য তৈরি হয়। সে সময়টাতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক কোনো দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিদ্বন্ধী ছিল না। বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে তা নির্ধারণ করার একক অধিকার যুক্তরাষ্ট্র নিজ কাঁধে তুলে নেয়। একক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে এই সময়ের মধ্যে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবিকৃত ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশে দেশে ক্ষমতার পরিবর্তনে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন উদ্যোগের বলি হয়েছে ইরাক, সাবেক যুগোস্লাভিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তান এবং সিরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে সরকার, শাসনক্ষমতা বদলে দিয়েছে। এর বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন বৈশ্বিক সংগঠনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ওয়াশিংটনের ইচ্ছার বাইরে কাজ করা বিভিন্ন দেশকে শায়েস্তা করতে চেয়েছে, করছে। যেমন জাতিসংঘকে ব্যবহার করে ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মূল্যবোধের আলোকে নকশা করা ছিল মুক্তবাণিজ্য এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বায়ন প্রকল্প। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যে বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল তা ভেঙে ফেলতে চ‚ড়ান্ত আঘাতটি হেনেছে রাশিয়া। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর) নামের থিংকট্যাংক পরিচালিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে- গণতন্ত্র ও ক্ষমতার বৈশ্বিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভৌগোলিক পার্থক্য রয়েছে। রাশিয়ার আগ্রাসন হতে পারে নতুন ‘পশ্চিমা পরবর্তী’ এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা উত্থানের ঐতিহাসিক মোড়।’ ‘ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রচলিত মতের বিরুদ্ধ মত হলো- একই সঙ্গে পশ্চিমারা আগের চেয়ে অনেক বেশি একত্রিত এবং তারা বিশ্বে কম প্রভাবশালী।’ যুগ পরিবর্তনের এই খেলায় মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ক্ষমতা-প্রভাব ফিরে পেতে আবারও পুরোনো লড়াই শুরু করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভ‚রাজনৈতিক দ্বন্ধ-সংঘাত উসকে দিতে শুরু করেছে। এই মনোভাব এখন বাইডেন প্রশাসনের একমাত্র পররাষ্ট্রনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার উদাহরণ হলো ইউক্রেন এবং তাইওয়ান সংকট। যুক্তরাষ্ট্র এই নীতির কারণেই যেকোনো ম‚ল্যে ন্যাটো জোটের স¤প্রসারণের (এ কারণেই ইউক্রেন সংকটের শুরু হতে পেরেছে) বিষয়ে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি ‘অকাস (অটকটঝ)’ জোট গঠন এবং তাইওয়ান প্রণালিতে সংকট উসকে দিয়ে চীনকে আটকে রাখার কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন। এসব কর্মকাÐের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বিশ্বব্যবস্থা বদলে দিয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধটা এড়াতে ফ্রান্স আর জার্মানির ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছিল। শুধু আমেরিকা চেয়েছে যুদ্ধটা লাগাতে। তারাই যুদ্ধের দামামা বাজিয়েছে আর বরাবরের মতো, সেই সঙ্গে সুর মিলিয়েছে যুক্তরাজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে- যুদ্ধে রাশিয়াকে নামিয়ে পরাস্ত করতে পারলে বিশ্বব্যবস্থার ওপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো হবে; দমে যাবে চীনের অগ্রগতিও। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ‘সিকিউরিটি ডেলিম্মা’ তত্ত¡ অনুযায়ী প্রত্যেক রাষ্ট্রই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে থাকে উদ্বিগ্ন, সর্বদা থাকে সজাগ। রাশিয়া, ইউক্রেন, উত্তর কোরিয়া, এমনকি একসময়ে দাপটে বিশ্ব শাসন করা ব্রিটেন, বর্তমানের পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে নয়। পশ্চিমা বিশ্বকে টেক্কা দিতে পাল্টা অর্থনৈতিক, সামরিক জোট গঠন করা বেড়েছে। যেমন ব্রিকস, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন এবং অন্যান্য জোট গঠিত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বহু চেষ্টা করেছে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দিতে। তবে তারা যে সেটা পারেনি, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। বিশ্লেষকগণ মনে করেন, রাশিয়ার উত্থান বিশ্বব্যবস্থায় শক্তি-সাম্য প্রতিষ্ঠা করলেও পরিপূর্ণ শক্তি-সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে না, যেমনটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময়। কারণ বর্তমানে কমিউনিস্ট বিশ্বের মধ্যে সুপার পাওয়ার রয়েছে, যাদের প্রভাবও রাশিয়া খাটো করে দেখতে পারবে না। আবার রাশিয়ার পরাজয় বহু-মেরুর বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করলেও সেই বিশ্ব ম‚লত পরিপ‚র্ণ বহু-মেরু বিশ্ব হবে না। কারণ আমেরিকা ও রাশিয়ার মতো অন্য কোনো সুপার পাওয়ার নিজেদের ক্ষমতা খাটাতে পারবে না।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট