বিরলপ্রজ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত : একটি সমীক্ষা

21

কায়সার কবির

‘দাদামণি’ খ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত ১৯৩৬ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগে ২০২১ সালের ১০ জুলাই নিজ গ্রামের বাড়িতে তাঁর প্রয়াণ হয়। প্রয়াণকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। অরুণ দাশগুপ্তের পিতার নাম অবিনাশ গুপ্ত, মাতার নাম হেমেদপ্রভা দাশগুপ্ত এবং পিতামহ ছিলেন কৃষ্ণকুমার দাসগুপ্ত। তরুণ দাশগুপ্ত নামে তাঁর এক ছোট ভাই ছিলেন যিনি কলকাতায় বসবাস করে যাচ্ছিলেন। গ্রামের বাড়িতে তিনি ছাড়া আর কোনো বংশধর ছিলো না। বংশ পরম্পরায় নামের শেষে গুপ্ত পদবী ব্যবহৃত হতো। তাঁর নামের ক্ষেত্রেও এর ব্যতয় ঘটেনি। চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ সাংবাদিক মহলে অতি পরিচিতমুখ ছিলেন চিরকুমার অরুণ দাশগুপ্ত।
অরুণ দাশগুপ্তের পিতার অঢেল ধন- সম্পদ ছিল। বলা যায়, সামন্ত- জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। তাই বেশিদিন তাঁকে গ্রামে থাকতে হয়নি। ধলঘাটের পাঠশালায় হাতেখড়ি হওয়ার পর চলে যান কলকাতায়। সেখানে কালাধন ইনস্টিটিউশন, সাউদার্ন থেকে মাধ্যমিক এবং স্কটিশচার্চ কলেজ, কলকাতা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। তারপর বিশ্বভারতী লোকশিক্ষা সংসদের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যবনিকাপাত টানেন। শিক্ষাজীবন শেষে কলকাতার ‘দৈনিক লোকসমাজ’ পত্রিকায় কিছুদিন সাংবাদিকতা করেন। যৌবনকালে সেখানে তিনি বাম ঘরনার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন – যুক্ত হয়ে পড়েন কলকাতার ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকান্ডের সাথে। কলকাতায় থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে বহু খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিকের। কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত ছিলেন তাঁর অত্যন্ত প্রিয়জন। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘পরিচয়’ পত্রিকার নিয়মিত পাঠক ছিলেন তিনি, অফিসেও অবাধ যাতায়াত ছিল তাঁর। হয়ত এখান থেকেই তিনি মনন ও বোধের যৌক্তিক চর্চার উৎস খুঁজে পেয়েছিলেন।
দেশ স্বাধীনের পরপরই অরুণ দাশগুপ্ত নাড়ির টানে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। ‘এসে যুক্ত হন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। কয়েকটি গণসঙ্গীত স্কোয়াডে সদস্য হিসেবে কোরাস গানে বড় বড় গুণী শিল্পীদের সাথে গলা মিলিয়ে ছিলেন।’ (জামাল উদ্দিন, “প্রণম্য দা’মণি’, ‘িৈনক পূর্বদেশ’, ১১ জুলাই ২০২১, পৃ.৪) তারপর শিক্ষকতাকে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। মিরসরাই ও ফটিকছড়ির প্রতিষ্ঠিত উচ্চ বিদ্যালয়ে বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করে অবশেষে ‘দৈনিক আজাদী’র প্রয়াত সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের হাত ধরে ১৯৭৩ সালে যোগ দেন ‘দৈনিক আজাদী’তে । প্রথমে সহ-সম্পাদক, তারপর সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন সুদীর্ঘকাল— সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে। ২০১৫ সালে কাগজে- পত্রে ‘দৈনিক আজাদী’ থেকে অবসর গ্রহণ করলেও চট্টগ্রামের প্রাচীনতম পত্রিকাটি তাঁকে কখনো অবসর দেয়নি। তাঁর জগৎ ও জীবন ছিলো এই পত্রিকাটিকে ঘিরে— অরুণ দাশগুপ্ত যেন আজাদী আর আজাদী যেন অরুণ দাশগুপ্ত। ‘দৈনিক আজাদী’র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম চলচ্চিত্র কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন ‘আপাতত’ বাংলাদেশ প্রথাবিরোধী আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য সংযোজন।
অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন জীবন ও জগতের ধীমান পর্যবেক্ষক— জ্ঞান ও মননের প্রবীণতম প্রদীপ— সৃজনশীল ও মননশীল কর্মের একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি- সংগীত- রাজনীতি- দর্শন- ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিলো অসাধারণ। মানুষের সৃজনী প্রতিভায় অরুণ দাশগুপ্তের ছিলো অখন্ড বিশ্বাস। এই বিশ্বাস প্রসারিত ছিলো তাঁর আপন অস্তিত্বের অনিবার্যতায়ও। ‘তাঁর হাত ধরে দেশের অনেক খ্যাতিমান লেখক তৈরি হয়েছে। অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখা যেমন তিনি প্রকাশ করেছেন তেমনি নবীন লেখক- কবিদের লেখাও যত্ন নিয়ে সম্পাদনাকরেছেন।’ (জামাল উদ্দিন, ঐ) তিনি আলোকিত করে রেখেছিলেন এই শহরের শিল্প-সাহিত্যকে। তাঁর বৌদ্ধ মন্দির সড়কস্হ ‘কল্যাণী’ বাড়িটি ছিলো কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীদের পরিচিত ঠিকানা। ‘কবি শামসুর রাহমান, আসাদ চৌধুরী, মুহম্মদ নুরুল হুদা, আবু বক্কর সিদ্দিকী, মনিরুজ্জামান, শিল্পী মর্তুজা বশীর, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, প্রফেসর ড. অনুপম সেন, আবুল মোমেন, আলাউদ্দিন আল আজাদ, রশিদ আল ফারুকী থেকে শুরু করে মুক্তবুদ্ধি চর্চার নবীন পর্যন্ত সবাই তাঁর ঘরে যেতেন। শুধু তাই নয় দেশের বরেণ্য রাজনীতিবিদদের অনেকেই তাঁর বাড়ি যেতেন।’ (জামাল উদ্দিন,ঐ) এই ‘কল্যাণী’তে তাঁকে মধ্যমণি করে সরস আড্ডা হতো। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি আবার কখনো রাজনীতিও উঠে আসতো আড্ডার বিষয়- আশয় হিসেবে। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিলো বহুমাত্রিক। ‘যেকোনো বিষয়ে কথা উঠলে তিনি অনর্গল বলে যেতে পারতেন। তাঁর সে বলা ভাসা ভাসা নয়, গভীর জ্ঞান ও পান্ডিত্য থেকেই তিনি বলতেন।’ (কামরুল হাসান বাদল, ‘‘আমাদের নগরের এক সুবাসিত কবি’’, ‘দৈনিক আজাদী’, ১১ জুলাই ২০২১, পৃ,৪) কী বিষয়বস্তু কী প্রকাশভঙ্গি সর্বত্র অভিনবত্বের, গাঢ়বদ্ধতার এক অনায়াস অভিযাত্রা ছিলো তাঁর।
অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন স্বাপ্নিক-ব্যক্তিত্ব । তিনি স্বপ্ন যেমন দেখতেন তেমনি স্বপ্ন দেখাতেও পারঙ্গম ছিলেন। তিনি ভেবেছেন প্রচুর, লিখেছেনও প্রচুর। তাঁর অসংখ্য কবিতা, বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ দৈনিক পত্রিকাগুলোতে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে আছে। খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি এতটাই নির্মোহ ছিলেন যে, নিজের লেখা নিয়ে বই প্রকাশ করা ছিলো তাঁর এক ধরনের অনীহা – তিনি তা শুধু বিড়ম্বনাই মনে করতেন। এপর্যন্ত চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশন থেকে ‘রবীন্দ্রনাথের ছয় ঋতুর গান ও অন্যান্য’(২০১৭) এবং ‘যুগপথিক কবি নবীনচন্দ্র সেন’ (২০১৮) নামে দুটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ নেই (যদিও কবিতা লিখেছেন প্রচুর)। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সমকালীন কবিতার সংকলন গ্রন্থ ‘নিসর্গের প্রতিবেশী’ তে তাঁর ৪ টি কবিতা স্থান পায়। কবিতাগুলো হচ্ছে: ‘নির্দ্ধিধায় যাওয়া যাক’, ‘পিতৃশোক’, ‘প্রপেলার’ ও ‘শাবরীর প্রার্থনা’। এই হচ্ছে তাঁর গ্রন্থবদ্ধ কবিতা। উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত গ্রন্থে ১৯ জন কবির ৮৮ টি কবিতা রয়েছে । অবশ্য প্রথমেই রয়েছে অরুণ দাশগুপ্তের কবিতা। তারপর আবুল মোমেন, তারপর অন্যান্য কবিদের কবিতা। অরুণ দাশগুপ্তের কবিতা সম্পর্কে এখানে যে গঠনমূলক ব্যাখ্যা-বিশ্লেণ রয়েছে তা প্রণিধানযোগ্য : ‘কবি অরুণ দাশগুপ্ত অন্তর্লোক অবলোকন করেন কবিতায়। তাঁর ভাষারীতি ও আঙ্গিক ধ্রæপদ মার্গের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় প্রতিমুহূর্তে। শব্দ ও বোধ যোজনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বরের কাব্যকলা নির্মাণে সচেষ্ট রয়েছেন তিনি। তৃতীয় বোধনের স্ফুরিত কবিতায় তিনি মূলত মানবিক আকুলতা আর যাপিত জীবনের স্বপ্নকথা বলেন রূপকথার আঙ্গিকে। ঋদ্ধ জীবনবোধ কবিতাকে আপাত দুর্বোধ্যয় আকীর্ণ করছে বলে মনে হলেও স্বীকার্য সত্য এই যে, তাঁর কবিতা নিবেশ-অভিনিবেশ দাবি করে এবং বোধের অন্য জগতে দূরগামী অভিযাত্রী করে অনুরাগীকে।’ কবিতার প্রচলিত নিয়মরীতিকে উপেক্ষা করে তিনি মূলত পৃথক এবং নিজস্ব প্রকরণ রীতির আদলে কবিতার ভুবন বিনির্মাণ করেছেন।
অরুণ দাশগুপ্তের লেখা ‘রবীন্দ্রনাথের ছয় ঋতুর গান ও অন্যান্য’ গ্রন্থটির ভূমিকায় শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. অনুপম সেন লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের ঋতুর গান ও কবিতা সীমাহীন সুন্দর। সুর বাণীতে এবং বাণী সুরে মিলেমিশে আমাদের দু’চোখে দেখা বিভিন্ন ঋতুর দিনগুলো অন্তরের চোখেও কানে অপরূপ রূপে ও মাধুর্যে মূর্ত হয়েছে তাঁর গানে; কীভাবে, তা’ই বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করেছেন কবি অরুণ দাশগুপ্ত তাঁর এই ঋদ্ধ গ্রন্থে।’ অরুণ দাশগুপ্ত নিজেই লিখেছেন,‘গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির মূল্যাতীত সম্পদ। অনন্য সংগীতস্রষ্টা তিনি। রবীন্দ্রনাথের তুল্য কম্পোজার পৃথিবীর সংগীতের ইতিহাসে বিরল। সংগীতস্রষ্টা হিসেবে তিনি বিটোফেন ভাগনার, মোৎসার্ট, সেবাস্টিয়ান বাখ, হান্ডেল, চাইকফ্স্কি-র সঙ্গে তুলনীয় হলেও সংগীতের নৈর্ব্যক্তিক চরিত্রকে ব্যক্তিক (চবৎংড়হধষ) করেছেন তিনি। সংগীতের বিমূর্ততাকে মূর্ত করা ও সুরের মানবয়ান ঘটানোতে তাঁর তুল্য কোনো সংগীতস্রষ্টা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। রবীন্দ্রনাথ উৎকৃষ্ট সুর ও অত্যুৎকৃষ্ট কবিতাকে মিলিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতো সংগীতের মানবয়ান আর কেউ ঘটাতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। রবীন্দ্রনাথের ঋতুর গানগুলোর দিকে নজর দিলে আমরা সেটা অনেকটা বুঝতে পারি। গানের বাণী ও সুরের এমন যুগল সম্মিলন রীতিমতো বিস্ময়কর।’ অরুণ দাশগুপ্তের ‘যুগপথিক নবীনচন্দ্র সেন’ প্রবন্ধগ্রন্থের ভূমিকায় গবেষক ও প্রাবন্ধিক ড. ইলু ইলিয়াস লিখেছেন, ‘অরুণ দাশগুপ্ত তাঁর গ্রন্থে নবীনচন্দ্র সেনের কেবল কাব্যকৃতির স্বরূপ বিশ্লেণে সীমাবদ্ধ থাকেননি, অপরাপর সৃজনশীলতা-অনুবাদকাব্য, চরিত সাহিত্য, জীবনী সাহিত্যেসহ প্রায় সমুদয় সৃজন সম্ভারের তাৎপর্য উন্মোচন করেছেন। এভাবে তিনি এক মলাটে সমগ্র নবীনচন্দ্র সেনকে অনুধাবনের সুযোগ করে দেন একালের অনুরাগী ও কৌতুহলী পাঠকদের।’ অরুণ দাশগুপ্ত এগ্রন্হের নিবেদন- এ বলেন, ‘উনবিংশ শতাব্দী বাঙলা ও বাঙালির গর্ব ও গৌরবের শতক। এই শতাব্দীর মধ্যভাগে ইংরেজি শিক্ষার ক্রমপ্রসারের ফলে পাশ্চাত্য সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষিত যুবমানসে এক নবচেতনার সঞ্চার হয়। এই নবচেতনার স্পর্শে এই যুবকেরা একেকজন হয়ে ওঠেন নূতন যুগের নূতন মানুষ। এতদিন যে জীবনরস নানা বাধানিষেধের পঙ্ককুন্ডে শিলীভূত হয়েছিল, নব যুগের নব মানুষেরা সেই পঙ্কশয্যা ছেড়ে উঠে আসেন আত্মস¤প্রসারণের রণাঙ্গনে, মুক্ত আকাশের নিচে। পাখা মেলতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন নূতন দিগন্তে। কী ব্যক্তিজীবন, কী সমাজজীবন সর্বত্র শ্রুত হলো নবচেতনার নব নব রাগ-রাগিনী। এর প্রতিচিত্র প্রতিফলিত হলো সাহিত্যে-প্রবন্ধ, কথাসাহিত্যে কবিতা-নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের সকল শাখায়; আর এই সৃজনকর্মের স্রষ্টা হলেন নূতন যুগের নূতন মানুষেরা। তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হয় আধুনিক জীবনোল্লাসের। বাংলা কবিতায় ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি রেনেসাঁসের নান্দীপাঠ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেন। মধুসূদনের সাহিত্যে উনিশ শতকীয় রেনেসাঁসের যে ঢেউয়ের দোলা এসে লেগেছিল এবং তার ফলে তাঁর সাহিত্যে যে নতুন জীবনবোধ ও চেতনার রূপায়ণ ঘটে চট্টগ্রামের কবি নবীনচন্দ্র সেন তারই উত্তর সাধক। নবীনচন্দ্র ছিলেন একটি বিস্ময়কর কবিচরিত্র।’
জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেও বিত্ত-বৈভবের মোহ তাঁকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। ‘আজীবন তিনি দেশ -সমাজ- জাতির আধুনিক বিনির্মাণে সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন। ছিলেন নির্মোহ, প্রগতিশীল ও বাস্তববাদী, সাহিত্যাঙ্গনের অকুতোভয় কলমসৈনিক ও সাদামনের মানুষ।… তাঁর প্রচুর লেখালেখিতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ও সৃষ্টি থাকলেও কোনপ্রকার স্বীকৃতি তাঁর মেলেনি। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনেক স্বীকৃতি তিনি পেলেও রাষ্ট্রীয় কোন পুরস্কার বা সম্মাননার তিনি ভূষিত হতে পারেননি।’ (শ্যামল চৌধুরী, “চেতনার দীপশিখা”, ‘দৈনিক আজাদী’, ১১ জুলাই ২০২১, পৃ. ৪) এ নিয়ে তাঁর কোনো ধরনের দুঃখ ছিলো না, অনুশোচনাও ছিলো না। জীবনের চরম সত্য ও বাস্তবতাকে বুকে ধারণ করে তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন নির্ভীক সৈনিকের মতো।
অরুণ দাশগুপ্ত ছিলেন একজন নিরহংকারী, অতিথিবৎসল ও নিষ্ঠাবান মানুষ। ‘বহু গুণ থাকা সত্তে¡ও কোন অহংকার তাঁকে কখনো স্পর্শ করেনি। ফলে আনত বৃক্ষের মতো মৃত্তিকার প্রতি নতজানু ছিলেন। (জামাল উদ্দিন, ঐ) অপাপবিদ্ধ এ মানুষটি তাঁর দুটি ঠোঁটের স্মিত হাসিতে আজীবন ধরে রেখেছিলেন রাষ্ট্রমন, সমাজমন ও ব্যাক্তিমন। সহগ্র প্রণাম দাদামণি।