বিমানবন্দরে আবারও স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালান রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনতে হবে

7

 

স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানের নিরাপদ প্রবেশদ্বারই পরিণত হয়েছে যেন দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম হজরত শাহ আমানত (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরদ্বয়ে ইয়াবাসহ কেজি কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধারে সংবাদে তাই মনে হচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃক্ষের দাবি চোরাচালনের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর নজরদারিতে কোন ঘাটতি নেই। কিন্তু সরিষায় ভুত রেখে নজরদারি করলে কি আর ভূত তাড়ানো যায়! শনিবার চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশনের এক নিরাপত্তা কর্মীকে আশি পিস স্বর্ণের বারসহ আটকের ঘটনায় বিমানবন্দরের দায়িত্বশীলদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর নয়। অতীতেও সোনা ও মাদক চোরাকারবারিদের সাথে বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের যোগসাজসের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু মাঝেমধ্যে অপরাধীদের গ্রেফতার ও জামিনের মধ্যে ঘটনার ইতি টানলেও বাস্তবে যারা এসব কাজে জড়িত সেই সব অপরাধিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। ফলে বিমানবন্দর হয়ে উঠেছে চোরাকারবারিদের মূল ট্রানজিট। গতকাল রবিবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয, দেশে-বিদেশে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক মাফিয়াচক্র স্বর্ণ ও মাদক পাচারের জন্য বিমানবন্দরগুলোকে ব্যবহারের দিকেই ঝুঁকে পড়েছে। সা¤প্রতিক সময়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চোরাপথে পাচারকালে স্বর্ণের বার, ইয়াবা ও সিগারেটের একাধিক চালান জব্দ করা হয়েছে। একের পর এক স্বর্ণ ও ইয়াবার চালান জব্দের ঘটনায় মাফিয়াচক্র বিমানবন্দরকে চোরাকারবারের নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, শনিবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল ও বন্দরনগরীর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়াবা ও স্বর্ণের পৃথক দুটি চালান জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর। এর মধ্যে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে এক হাজার আটশ’ ৭৮ পিস ইয়াবাসহ সৌদিগামী সোহেল রানা নামে এক যাত্রীকে আটক করা হয়। তার জাজিরা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে কুয়েত হয়ে সৌদি আরব যাওয়ার কথা ছিল। একইদিন সকালে নগরীর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮০টি স্বর্ণের বারসহ মো. বেলাল উদ্দিন নামে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে এক কর্মচারীকে আটক করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৮ হাজার পিস ইয়াবাসহ মো. স্বপন মাতব্বর নামে সৌদি আরবের দাম্মামগামী এক যাত্রীকে আটক করা হয়। একই সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে চোরাপথে নিয়ে আসা স্বর্ণের বার ও সিগারেটের পাশাপাশি দেশ থেকে নিয়ে যাওয়ার পথে ইয়াবার একাধিক চালান জব্দ করা হয়েছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মাফিয়ারা আকাশপথকেই তাদের পণ্য পাচারের জন্য ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, বিমানবন্দর দিয়ে কেবল স্বর্ণের বার ও ইয়াবা নয়, গত কয়েকবছর ধরে বিমানবন্দর দিয়ে লাগেজের আড়ালে ভিনদেশি বা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সিগারেট নিয়ে আসার পরিমাণও জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে মোট পাঁচটি পৃথক চালানে দুই হাজার পাঁচশ’ ২৩ কার্টন বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট জব্দ করা হয়েছে।
উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমার পর যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করার সাথে সাথে বিমান বন্দর দিয়ে স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানীও বেড়ে গেছে। এসব চোরাকারবারি বা স্বর্ণ ও মাদক পাচারের সঙ্গে রাঘব বোয়ালরা জড়িত। তাদের অনেকেই গ্রেফতার হচ্ছে না। বিমানে করে স্বর্ণ আসলেও জড়িতরা শনাক্ত হচ্ছে না। দু’চারজন আটক হলেও রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আমরা মনে করি, অহেতুক চুনো পুটির পেছনে দৌঁড়ে সোনা চোরাচালান দমনের কাক্সিক্ষত সফলতা পাওয়া যাবে না, যতক্ষণ না এর মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা না যাবে। দেশ ও জাতির স্বার্থের বিরুদ্ধে, মানুষের অকল্যাণে সোনা ও মাদক চোরাচালান ব্যবসা করেও যারা সমাজের মধ্যমণি হয়ে বসে আছে তাদের কালো হাত আগে ভাঙতে হবে। পালের গোদাকে সোজা করতে না পারলে অন্য কেউ সোজা হবে না। একজন ধরা পড়বে তো শতেকজন উদয় হবে। একথা সত্য যে, বেকার জীবনে লোভনীয় পারিশ্রমিকে কাজের সুযোগ পেলে চুনো পুটিরা এদিকে ঝুঁকবেই। এ কারণে চোরাচালানে বিনিয়োগকারীদের আগে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। বিমান বন্দরগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারিসহ দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।