বিজয়া দশমীর তাৎপর্য

15

 

বিজয়া দশমী সম্পর্কে কিছু বলার আগে, শুরুতেই সবাইকে জানাচ্ছি একরাশ কাশ-শিউলি ফুলের সুরভিত শারদীয়া বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা। আজ বিজয়া দশমী পালনের মাধ্যমে পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে দশদিন ব্যাপী দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
‘দশম’ মানে হচ্ছে গাণিতিক দশ সংখ্যাটির ক্রমবাচক রূপ; আর ‘দশম’ শব্দের সাথে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে দশমী হয়েছে। যা একেবারে সহজবোধ্য বিষয় বলা যায়। কিন্তু শরতের বিজয়া দশমীর ‘দশম’ শব্দটির ভিন্ন অর্থ ও আলাদা তাৎপর্য বহন করে। এখানে দশমীর আগে বিজয়া শব্দটি যুক্ত হয়েছে। এই বিজয়া দশমীর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গেলে একাধিক পৌরাণিক কাহিনী সামনে চলে আসে। যেমন- ‘মহিষাসুর বধ’ কাহিনী অনুযায়ী দেবীদুর্গা মহিষাসুরের সাথে নয় দিন, নয় রাত যুদ্ধ করার পর, দশম দিন বিজয় অর্জন করেন। আবার ‘শ্রীশ্রী চন্ডী’ কাহিনী অনুযায়ী আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুদর্শীতে দেবী দুর্গা আবির্ভূত হন এবং একই মাসে শুক্লপক্ষের দশমীতে অশুভ শক্তি মহিষাসুর বধ করে বিজয় অর্জন করেন। সেই অনুযায়ী বাঙালি সনাতনী সম্প্রদায় প্রতিবছর শরতকালে সাড়ম্ভরভাবে আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজার সবশেষ আয়োজন বিজয়া দশমীর বিজয় উৎসব পালন করে থাকে।
আমরা জানি, মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষ শেষ হয়ে মাতৃপক্ষ বা দেবীপক্ষ শুরু হয়। আক্ষরিক অর্থে এই দিন থেকে দেবী দুর্গাপূজার সূচনা হয়ে থাকে এবং দশমীর মাধ্যমে পূজার পরিসমাপ্তি ঘটে। এরই মধ্যে ষষ্ঠীর দিন দুর্গাপূজার বোধনের মাধ্যমে দেবীদুর্গাকে আবাহন করা হয়। এইদিনে দেবী দুর্গা তাঁর চার সন্তান লক্ষী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিককে সাথে নিয়ে মর্তে অবতরণ করেন। এরপর মহাসপ্তমী দিন, সূর্য উঠার আগেই একটি কলাগাছ ম্লান করিয়ে নববধূর মত নতুন শাড়ি পরিয়ে ‘কলাবউ’ বানিয়ে গণেশের স্ত্রী কল্পনা করে পাশে স্থাপন করা হয়। এছাড়া নয় ধরনের গাছ একত্র করে নবপত্রিকা স্থাপন করা হয়। সপ্তমীর পরের দিন অর্থাৎ মহাঅষ্টমীর দিনে ৯ বছরের কম বয়সী মেয়েকে দুর্গারূপে কল্পনা করে পূজা করা হয়, যেটাকে ‘কুমারী পূজা’ বলা হয়ে থাকে। এরপর অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট এই মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যে সন্ধিপূজা করা হয়। সন্ধিপূজার মাধ্যমে শুরু হয় মহানবমী তিথি।
মহানবমী দিন একশ আটটি প্রদীপ জ্বালিয়ে একশ আটটি পদ্মফুল দুর্গার চরণে নিবেদন করে হোম যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। এইদিন ভক্তদের মাঝে শুরু হয় বিদায়ের করুণ সুর। কারণ পরের দিন দশমীতে মা দুর্গা মর্ত্যলোক থেকে বিদায় নিবেন। এই ভাবে মহালয়া থেকে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আশ্বিন মাসের শুক্লাপক্ষের দশমী তিথিতে শেষ হয় দেবীদুর্গা পূজার মহাঅনুষ্ঠান, বিজয়া দশমীর উৎসব। আগেই বলেছি, এই দশমী শব্দটির সাথে বিজয়া শব্দটি যুক্ত আছে; বিজয়ের আনন্দ থাকার সত্ত্বেও দশমী শব্দটি শুনলে মন অনেকটা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ এই দশমীর শব্দের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বাঙালির আনন্দের আবেগ আর মন খারাপের মিশ্রিত অনুভুতি। এই দিন মা দুর্গা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয়ীলাভের উৎসব হলেও একই দিনে মা দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাস পাড়ি দিয়ে থাকেন। অতঃপর পরিসমাপ্তি ঘটে দশ দিনব্যাপী মহান দুর্গোৎসব।
আবার দশমীদিন পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও পুরোদিন অনানুষ্ঠানিক আরো অনেক কার্যক্রম চলতে থাকে। যেমন- এই দশমী দিনে সকালে ম্লান সেরে নতুন পোশাকে পবিত্র মনে, নির্দিষ্ট সময় বা তিথির মধ্যে দেবীদুর্গার চরণে পুষ্পাঞ্জলি ও অপরাজিতা ফুল অর্পণ করা হয়। এরপর কেউ কেউ রাম মন্দিরে, রামের মূর্তি বা ছবির সামনে ঘি’য়ের বাতি প্রজ্জালন করে থাকে। এছাড়া মহিলারা তেল সিঁদুর নিয়ে দুর্গা মায়ের চরণে অর্ধেক অর্পণ করে, আর বাকী অর্ধেক চরণ ছুঁয়ে বাড়িতে এনে সাড়া বছর ব্যবহার করে। শুধু তা নয়, অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ভালো ভালো খাবার রান্না করা, একজন অন্যজনকে শুভেচ্ছা বিনিময় করাসহ নানা রকম প্রচলিত প্রথা আবহমান থেকে চলে আসছে। অতঃপর দশমীর সর্বশেষ ধাপ, অপরাহ্নে প্রতিমা বিসর্জন। প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে মাটির সাকার প্রতিমা পানিতে নিরাকার রূপে মিশে যায়। মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী রূপে পুনরায় হৃদয়ে স্থান পায়। এইভাবে দশমীর মাধ্যমে এক বছরের জন্যে পরিসমাপ্তি ঘটে দশদিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের অনুষ্ঠান।

লেখক: শিক্ষক ও সাহিত্যিক