বিএনপির ১০ তারিখের জনসভা ও জনসভার রাজনীতি

13

স্বদেশ রায়

বিএনপি বিভাগীয় সমাবেশ শেষ করতে যাচ্ছে ১০ ডিসেম্বরের ‘ঢাকা সমাবেশের’ মধ্য দিয়ে। বিএনপি যে বিভাগীয় সমাবেশগুলো করেছে, সেখানে জনসমাগম যাই হোক তার থেকে তারা সমাবেশ নিয়ে প্রচার পেয়েছে অনেক বেশি। আর এ কাজে সরকারের অতি উৎসাহীরাই বিএনপিকে সহায়তা করেছে। এ কাজটি বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের অস্থিতিশীল ও অপরিপক্ব রাজনৈতিক পরিবেশে সবসময়ই সরকারি দল করে থাকে। বিএনপি তাদের বিভাগীয় সমাবেশগুলো নিয়ে যেমন মিডিয়া কভারেজ অনেক বেশি পেয়েছে বা একটি সমাবেশকে ঘিরে কয়েক দিন যাবৎ প্রচার পেয়েছে– এমনটি আওয়ামী লীগও পেয়েছিল বিএনপির ক্ষমতাকালে। আওয়ামী লীগের তৎকালীন জেনারেল সেক্রেটারি আব্দুল জলিল যখন কোনোরূপ পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি না করেই একটা নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে দিয়েছিলেন যে ওই দিনে বিএনপি বা চারদলীয় জোট সরকারের পতন ঘটবে। তার পরদিন থেকেই বিএনপি ব্যাপকভাবে ঢাকায় ঢোকার বিভিন্ন স্টেশনে ও হোটেল এবং মেসে থাকা মানুষ গ্রেফতার করতে থাকে। যার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়াতে ‘গণগ্রেফতার’ শব্দটি ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। এবং পরিস্থিতি এ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে কমলাপুর রেলস্টেশনে নামা সাধারণ তরুণ বা গাবতলীতে বাস থেকে নামা যুবক গণহারে গ্রেফতার হতে থাকে। সরকারের ওই কাজ দেখে সাধারণ মানুষ ভাবতে শুরু করে দেয়, তাহলে হয়তো জনাব জলিলের দেওয়া ওই তারিখে কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশগুলোর বেশিরভাগে সরকারের নানা শক্তি ব্যবহার করে বাধা দেওয়াতেও সাধারণ মানুষকে ১০ তারিখের জনসভা নিয়ে অনেক বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। অনেকেই উৎকণ্ঠিত, কী হবে ১০ তারিখে?
বিএনপি মাস কয়েক ধরে তাদের বিভাগীয় জনসমাবেশগুলো করছে। বলা যেতে পারে ২০০৬ সালে অনেকখানি অস্বাভাবিকভাবে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে আসার পরে এই প্রথম বিএনপি কিছুটা হলেও তাদের রাজনৈতিক আন্দোলন করতে পারছে। বিএনপির যারা বিবেচক রাজনীতিক তারাও কিন্তু স্বীকার করেন, ২০১৩ ও ১৪-তে তারা যে রাজনীতি করেছিল সেটা আর যাই হোক কোনও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের রাজনীতি নয়। বরং তা ছিল হঠকারিতা। ওই কাজ তাদের কোনও রাজনৈতিক লাভ দেয়নি। বরং এর বিপরীতে গত কয়েক মাসের বিভাগীয় সমাবেশের রাজনীতির যদি হিসাব করা হয় তাহলে এ রাজনীতি বিএনপিকে যেমন লাভবান করেছে তেমনি ক্ষমতাসীন সরকারি দলেরও রাজনৈতিক শক্তির লাভ হয়েছে।
বিএনপি ঢাকায় সমাবেশ করার আগেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ যশোর ও চট্টগ্রামে দুটো বিশাল আকারের জনসভা করেছে। জনসভার লোক সমাগমের হিসাবে না গিয়েও বিএনপি এখানে তাদের লাভের খাতাটি মেলাতে পারে। তারা সহজে দেখতে পাবে, বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে যে জনসভা হচ্ছে সেই জনসভার বিপরীতে কিন্তু আওয়ামী লীগের দুটো জনসভা হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মূল নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। রাজনৈতিকভাবে ২০১৩, ১৪ ও ১৫-তে বিএনপির মূল নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে কাউন্টার করতেন আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি সৈয়দ আশরাফ। আর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুলের বিপরীতে কথা বলতেন তৎকালীন দলীয় মুখপাত্র বর্তমানের যুগ্ম সচিব জনাব হানিফ। শেখ হাসিনাকে স্পর্শ করার মতো বা তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে টেনে আনার কোনও সুযোগ বিএনপি পায়নি। এমনকি ২০১৮-এর বিতর্কিত নির্বাচনের আগেও বিএনপিসহ অনেক দলের জোটের নেতা ড. কামাল সংলাপের জন্যে চিঠি দিয়েও কিন্তু শেখ হাসিনাকে অবস্থানচ্যুত করতে পারেননি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সংলাপের আহবান জানিয়ে নিজের অবস্থানকে সবার ওপরেই রেখেছিলেন। তাই ২০২২-এ এসে বিএনপির এই বিভাগীয় সমাবেশের বিপরীতে যখন শেখ হাসিনাকে নিজেই বিভাগীয় সমাবেশ করতে হচ্ছে তখন বিএনপি এটা তাদের সাফল্য না হোক, অগ্রগতি হিসেবে ধরতে পারে।
অন্যদিকে বিএনপি এই জনসভার রাজনীতি করার ফলে আওয়ামী লীগের জনসভা শেখ হাসিনাকে করতে হলেও আওয়ামী লীগেরও বেশ কিছু লাভ হচ্ছে। কারণ, ১৫ বছর টানা ক্ষমতায় থাকার ফলে আওয়ামী লীগ প্রশাসন, লুটেরা ব্যবসায়ী ও তোষামোদকারীদের বেড়াজালে আটকে গিয়েছে। কিন্তু বিএনপির এই সমাবেশের রাজনীতিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে তার সাংগঠনিক রাজনীতির কাছেই ফিরতে হচ্ছে। এবং বিএনপি যত বেশি এভাবে আন্দোলনের দিকে যাবে ততই আওয়ামী লীগকে তার সংগঠনের কাছে ফিরতে হবে। যা যেকোনও রাজনৈতিক দলের জন্যে লাভ। এবং আওয়ামী লীগকে যতই তার সংগঠনের কাছে ফিরতে হবে ততই তার প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মী, নেতা ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছেই ফিরতে হবে। প্রতাপশালী লুটেরা ব্যবসায়ী ও তোষামোদকারীরা স্বাভাবিকভাবেই এই দৌড়ে একটু পিছে পড়ে যায়।
তাই সত্যি অর্থে বিএনপির ১০ তারিখের ‘ঢাকা সমাবেশ’ যে সময়ে সামনে এ সময়টিতে দুটো দলই কিছুটা রাজনৈতিক লাভের গলিপথে হাঁটছে। উভয়ে যখন রাজনৈতিক লাভের গলিপথে হাঁটছে এই সময়ে বিএনপির ১০ তারিখের ঢাকা সমাবেশ নিয়ে যারা উৎকণ্ঠিত হচ্ছেন তাদের বাস্তবে উৎকণ্ঠিত হওয়ার কোনও কারণ না থাকাই যুক্তিযুক্ত। যারা উৎকণ্ঠিত হচ্ছেন তাদের উৎকণ্ঠার মূল উৎস সোশ্যাল ফোরামের নানান উসকানিমূলক খবর ও বক্তব্য। এ ধরনের উসকানি যে বিএনপির ভেতরে নেই তাও নয়। তবে বিএনপির প্রধান প্রধান নেতারা অবশ্যই চেষ্টা করবেন সব ধরনের উসকানিকে প্রশমিত করে অন্য বিভাগীয় সমাবেশগুলোর মতোই ঢাকা সমাবেশটি সফল করার। অন্যদিকে বিএনপির অতি উৎসাহী এবং আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীদের একটি আশা দুইভাবে একই মেরুতে এসে মিলবে। বিএনপির অতি উৎসাহীরা চাইবে আওয়ামী লীগ তাদের সমাবেশে বাধা দিক। যার ফলে একটা সংঘাত হয় এবং তারা তাৎক্ষণিক একটা রাজনৈতিক ইস্যু যাতে পায়। আর আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীরা চাইবে বিএনপির সমাবেশ যাতে ছোট আকারে হয় সে ব্যবস্থা করা। কিন্তু বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতা বলে দিচ্ছে, বিএনপির অতি উৎসাহীরা যতই আশা করুক আর আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহীরা যতই উৎসাহ দিক, রাজধানীতে এ ধরনের কোনও ঘটনা সরকার ঘটতে দেবে না। তাই ১০ ডিসেম্বর মূলত বিএনপির ঢাকা সমাবেশ অন্য বিভাগীয় সমাবেশগুলোর মতোই শেষ হবে।
তবে এটা সত্য, ১০ ডিসেম্বরের এই সমাবেশের রাজনীতির ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে সমাবেশের রাজনীতি শেষ হচ্ছে না। বরং এটা শুরু বলা যেতে পারে। এ পর্যন্ত বিএনপি আর আওয়ামী লীগ যা করলো তা ওয়ার্মআপ মাত্র। এই ওয়ার্মআপের পরে আগামী নির্বাচনের আগে এখনও সরকার ও বিরোধী দলকে পুরো এক বছর রাজনীতি করতে হবে। এই এক বছরের রাজনীতিতে অনেক অধ্যায় থাকবে। এই অধ্যায়গুলো রাজনৈতিক শক্তিগুলো কীভাবে পাড়ি দেবে সেটাই দেশের আগামী দিনের সব থেকে বড় প্রশ্ন। কারণ, বাংলাদেশে এখন রাজনৈতিক শক্তি, প্রশাসন ও ব্যবসায়ী মিলে অনেকটা হাতে তৈরি ওরস্যালাইনের মতো সেই এক চিমটি লবণ, একমুঠো গুড় আর এক গøাস পানির একটা মিশ্রণ তৈরি হয়েছে। এর ভেতর কে যে কখন এক চিমটি লবণ, কে এক মুঠো গুঁড় আর কে এক গøাস পানি তা বলা কষ্টকর। দ্রুতই অবস্থান পরিবর্তন হয় ও হবে।
অন্যদিকে এই ওরস্যালাইন শক্তির বাইরে বাংলাদেশে অন্য কোনও শক্তি এখন নেই। চল্লিশের দশক থেকে যে স্বাধীন সিভিল সোসাইটি এই ভূখন্ডে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল, যারা সবসময়ই সমাজ ও রাজনীতির অগ্রপথিক ছিলেন, তারা নিঃশেষিত। কোনও পেশারও এখন ওই অর্থে কোনও স্বাতন্ত্র্য নেই- তারাও ওই ওরস্যালাইনের অংশ। বাস্তবে মহাবিশ্বের ভারসাম্যর জন্যে যেমন অনেক শক্তির কেন্দ্র লাগে, রাজনীতি ও সমাজের ভারসাম্যর জন্যে অনেক শক্তির কেন্দ্রের দরকার হয়। এই কেন্দ্র কিন্তু এখন রাষ্ট্রে ও সমাজে নেই। অন্যদিকে সমাজের একটি বড় অংশ মনোজাগতিকভাবে পশ্চাৎপদ। মহাবিশ্বের নিয়মের বাইরের কোনও কিছু বড় আকারে সৃষ্টি হলে যেমন প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে চলে যায় অনেক কিছু, সমাজ ও রাষ্ট্রে তেমনটিই ঘটে থাকে। এমন একটি রাষ্ট্র সমাজে এক বছর ধরে রাজনীতিকে সুস্থ ও সঠিক পথে চালানো একটি দুরূহ কাজ। তাই ১০ ডিসেম্বর নয়, আগামী এক বছরের রাজনৈতিক পথচলার বাঁকগুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক