বিএনপির নিঃসঙ্গ পথ চলায় জামায়াতের অবস্থান কি?

36

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজপথের আন্দোলনে বিএনপি এখনো নিঃসঙ্গ। নানা কর্মসূচিতে জটিল ও সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এখনো একাই। এরমধ্যে ঘোষণা করেছে নতুন কর্মসূচি। পুরনো ও অবিচ্ছেদ্য মিত্র হিসাবে জামায়াত কোন পথে, কিংবা তাদের স্বতন্ত্র কোনো অবস্থান আছে কিনা এ নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতুহলও লক্ষ্যণীয়।
এদিকে দ্বিতীয় দফায় গতকাল আবারও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছে বিএনপি। প্রথম দফার সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব, আন্দোলনের বিষয়ে করণীয়, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্র পরিচালনায় গুণগত পরিববর্তন, খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ নানা ইস্যুতে একমত হতেই দলটি দ্বিতীয় দফায় সংলাপ করছে। এরপর নভেম্বরে যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা দিতে চায়। তবে এরই মধ্যে দলীয় এক নেতার বক্তব্যে কিছুটা বেঁকে বসেছে জামায়াতে ইসলামী। যদিও অনেকে বলছেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের ফাটল আগেই ছিল, এখন সেটা প্রকাশ্যে আসছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যেসব রাজনৈতিক দল আন্দোলন করছে, তাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করছি। আলোচনার মাধ্যমে আন্দোলনের একটি চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করব।
সূত্র মতে, চলতি মাসেই দ্বিতীয় দফার সংলাপ শেষ করা হবে। প্রথম দফার সংলাপ অনেক দলের রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে করা হয়েছে। কিন্তু এবার সব দলের সঙ্গে সংলাপ হবে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে। গতকাল কল্যাণ পার্টির পর আজ জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) এবং আগামীকাল মঙ্গলবার এলডিপির সঙ্গে সংলাপের কথা রয়েছে। মূলত যুগপৎ আন্দোলনের জন্য বিএনপি কিছু দাবি চূড়ান্ত করেছে। এসব দাবি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে উপস্থাপন করা হবে। দাবিগুলোতে সব দল একমত না হলে সংযোজন-বিয়োজন করে তাদের কিছু দাবি যোগ করে তা চূড়ান্ত করা হবে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো একই দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে নামবে- সে চেষ্টা করা হচ্ছে। বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ শেষে জানুয়ারিতেই সব দলের যুগপৎ আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা রয়েছে। সে লক্ষ্যেই বিএনপি কাজ করছে। দ্বিতীয় দফার সংলাপে ২২ দলের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বাম ও ইসলামী দলের সঙ্গেও বসবে বিএনপি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মতবিরোধ ১৪ দলের এমন দুটি দলের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। এছাড়া ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপির সমাঝোতা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু স¤প্রতি বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং এর আগে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে দু’দলের সম্পর্কে তিক্ততার ইঙ্গিত মিলছে।
গত সোমবার রাজধানীর একটি সমাবেশে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘জামায়াতও উর্দু শব্দ, আওয়ামী লীগও উর্দু। দুটি একসঙ্গে মিলবে ভালো। আওয়ামী লীগ জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে, কিন্তু বেআইনি ঘোষণা করেনি। তাহলে কি তলে তলে তাদের পরকীয়া প্রেম চলছে? এর অর্থ, আওয়ামী লীগ গোপনে জামায়াতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। সেজন্য নিবন্ধন বাতিল করে না। তাই আজকে থেকে আওয়ামী-জামায়াত হবে, বিএনপি-জামায়াত আর হবে না।’
জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট গঠনের পর এ রকম ঘটনা এটাই প্রথম। টুকুর ওই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছে জামায়াত। টুকুর বক্তব্যকে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত, অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে দলটি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ‘অসংলগ্ন’ বক্তব্য থেকে সবাইকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয় দলটির পক্ষ থেকে। তবে এ বিষয়ে এখনো বিএনপির কোনো নেতা মুখ খুলেনি।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ফাঁস হওয়া একটি ভিডিওতে বলেছেন, বিএনপি জোটের সঙ্গে তারা আর নেই। তবে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন হতে পারে। জামায়াত জোটে না থাকার জন্য বিএনপিকেই অনেকটা দায়ী করেন তিনি। এরপর জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় শফিকুর রহমান ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এ কথা বলেছেন। জামায়াতের এটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, এখন জোটগত কিছু নেই। যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্য নিয়েই সব কার্যক্রম চলছে। দ্বিতীয় দফায় সংলাপ শুরু হয়েছে। বিভাগীয় সমাবেশ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা প্রকাশিত হবে। যুগপৎ আন্দোলনে প্রত্যেক দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলন করবে। সবার একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, আন্দোলন হবে যার যার অবস্থান থেকে। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পদত্যাগ নিশ্চিত করা হবে। যেসব রাজনৈতিক দল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে থাকবে, তাদের সবাইকে নিয়ে বিরোধী জোট আসন বণ্টনের মাধ্যমে নির্বাচন করবে। নির্বাচনে বিরোধী জোট বিজয়ী হলে, জোটের কোনো দলের শীর্ষ নেতা পরাজিত হলেও তাকে সরকারের অংশীদার হিসাবে রাখার আশ্বাস রয়েছে।