বিইআরসি আইনের সংশোধন ভোক্তা স্বার্থ সুরক্ষার দায় সরকারের

8

গণশুনানি ছাড়াই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণ করতে পারবে সরকার-এমন বিধান রেখে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন-২০০৩ এর সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২২ জারি করেছেন। এর আগে গত সোমবার বিশেষ পরিস্থিতিতে সরাসরি জ্বালানির দাম সমন্বয় করার বিধান রেখে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অধ্যাদেশ ২০২২ খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এ অধ্যাদেশের ফলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন-২০০৩ এর সংশোধন হলো, এখন থেকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসির) পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে সরকারও বিদ্যুৎ-জ্বালানীর দাম বৃদ্ধি কিংবা কমাতে পারবে। সূত্র জানায়, সংসদ অধিবেশন না থাকলে জরুরি কোনো প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেন। পরে সংসদের প্রথম বৈঠকে তা উপস্থাপন করা হয়। আগের আইনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো বা কমানোর এই ক্ষমতা ছিল বিইআরসির। এটি সংশোধনীর কারণে বিইআরসির পাশাপাশি সরকার ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে ট্যারিফ নির্ধারণ, পুনঃনির্ধারণ বা সমন্বয় করতে পারবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) জ্বালানির দাম বাড়ানোর আইনগত ক্ষমতা ছিল। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণের আগে অংশীজনদের (স্টেকহোল্ডার) নিয়ে গণশুনানি করত বিইআরসি। ২০০৩ সালের প্রণীত আইনের ৩৪ ধারায় সংশোধনের পাশাপাশি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে বলা হয়, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা ভর্তুকি সমন্বয়ের লক্ষ্যে জনস্বার্থে কৃষি, শিল্প, সার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গৃহস্থালি কাজের চাহিদা অনুযায়ী এনার্জির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন, পরিবহন ও বিপণনের নিমিত্তে দ্রæত কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার সুবিধার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদন, এনার্জি সঞ্চালন, মজুদকরণ, বিপণন, সরবরাহ, বিতরণ এবং ভোক্তা পর্যায়ে ট্যারিফ নির্ধারণ, পুনঃনির্ধারণ বা সমন্বয করতে পারবে। তবে সরকারের হাতে এনার্জির দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করেন রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধিত আইনে সরকারের হাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর দাম নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, এতে সাধারণ ভোক্তাদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা হব না। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের যে জবাবদিহিতার বিধান ছিল তাও আর অবশিষ্ট থাকবে না। তারা মনে করেন, আগে জনমত জরিপ যাচাইয়ের মাধ্যমে দাম বাড়ানো-কমানো গেলেও এখন সেটা আর থাকবে না। ফলে সুশাসন ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে মানুষ।
অপরদিকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় সরকার এমন উদ্যোগ নিয়েছে। বিইআরসি থেকে বাস্তবায়ন হয়ে আসতে একটি দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হলেও এখন থেকে তা আর হবে না। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মাধ্যমে এতদিন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম নির্ধারণ হলেও জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম সরকার নির্ধারণ করে আসছিল। কিন্তু এবার বিইআরসি থেকে তাও তুলে নেয়া হলো। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) (সংশোধন) আইন, ২০২২ এ বলা হয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বা সমন্বয় করতে পারবে। তবে আগের মতো শুনানিসহ মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির হাতেও থাকবে। বিদ্যমান আইনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বিইআরসি ৯০ দিন সময় নিয়ে নির্ধারণ করে। বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকারও যেন তা নির্ধারণ করতে পারে, এ জন্যই প্রস্তাবিত এ সংশোধনী মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদন করে।
সূত্র জানায়, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের মূল্য সমন্বয় করা প্রয়োজন। অর্থনীতির গতি চলমান রাখার সঙ্গে নিয়মিত ও দ্রæততম সময়ে মূল্য সমন্বয়ের লক্ষ্যে বিইআরসির পাশাপাশি সরকারেরও ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য আইনটি সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে জানা যায়। আমরা মনে করি, সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধিত আইনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর মুল্য নির্ধারণে যে ক্ষমতা পেয়েছে, তা জনস্বার্থেই ব্যবহার হবে। সম্প্রতি এনার্জি রেগুলেটারি কমিশনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ভোক্তা সাধারণের স্বার্থের বাইরে গেছে- একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। যদিও কমিশনটি জবাবদিহিতার আওতায় থেকে মূল্য নির্ধারণ করতো, তবুও সংকটকালে কমিশনটি জনস্বার্থ বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এসময় কমিশন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে তা রোধ করার জন্য সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। আমরা আশা করি, সাধারণ মানুষের জ্বালানির নিরাপত্তাসহ ভোক্তা পর্যায়ে ন্যায্য ট্যারিফ নির্ধারণে সরকার ভোক্তা সাধারণের আর্থিক অবস্থাকে বিবেচনায় রাখবে।