বাড়ছে সামাজিক অপরাধ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর দিন

6

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে সামাজিক অপরাধ প্রবনতা। তবে দেশ ও কালভেদে সামাজিক অপরাধের ভিন্নতা রয়েছে। আমাদের দেশে যা অপরাধ অন্যদেশে তা কালচারই হতে পারে। অথবা এমন অনেক অপরাধ রয়েছে যা অনেক দেশে বৈধতার স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন সমকামিতা, গর্ভপাত, বিবাহপূর্ব মিলন ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো ইসলামেতো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধই তবে অন্যান্য ধমেও এসব অপরাধ নিষিদ্ধ। কিন্তু কথিত সভ্যতার নামে এসব অপরাধগুলোকে স্বীকৃতি দিয়েছে আমেরিকাসহ অনেক ইউরোপীয়ান দেশ। প্রকৃতপক্ষে এগুলো সামাজিক অপরাধ। এধরণের অপরাধের কারণে প্রাচীন যুগে অনেক সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। সমকামিতার মত অবাধ সামাজিক অপরাধের কারণে প্রকৃতির অভিশাপে একটি সাগর ডেড সী (মৃত সাগর) হয়ে গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে এ জাতীয় অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে এবং তা কথিত ধর্মীয়াঙ্গনে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে বেশ কিছু শিশু বলাৎকারের ঘটনা পত্রিকায় এসেছে, যার বেশ কয়েকটি ছোট ছোট মাদ্রাসায় সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া, শিশু হত্যা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, আত্মহত্যার মত ঘটনা ঘটছে অহরহ। এসব ঘটনাগুলো থেকে প্রমাণিত হচ্ছে, সামাজিক অবক্ষয় কোন পর্যায়ে গেছে। বৃহস্পতিবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বৈষয়িক অপ্রাপ্তি ও বৈষম্যের পরিণতিতে অনেকটা নিয়মিতভাবেই পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্ব›দ্ব কিংবা পারিবারিক বিষয়ে তর্কাতর্কির জেরে ছেলের হাতে খুন হতে হয়েছে মা- বাবাকে। এছাড়া, স্বার্থের সংঘাতে খুনোখুনির ঘটনা তো লেগেই রয়েছে। সর্বশেষ গত ৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে পটিয়া উপজেলার জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের লড়িহড়া এলাকায় বিমান ধর (৪০) নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের বণিকপাড়ার বাসিন্দা। নগরীর বাকলিয়ায় তার একটি স্বর্ণের দোকান আছে। ওইদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সীতাকুÐ উপজেলার ভাটিয়ারি ইউনিয়নের পূর্ব হাসনাবাদ গ্রামের বাপ্পি কলোনিতে পারিবারিক বিষয় নিয়ে তর্কাতর্কির জের ধরে বাবা বেলাল হোসেনকে (৫৫) ছুরিকাঘাতে খুন করে পালিয়ে যান ছেলে মোহাম্মদ হেলাল (১৭)। এ ঘটনায় বেলালের মেয়ে খতিজা বেগম বাদী হয়ে সীতাকুÐ থানায় ভাই হেলালের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। রাত একটার দিকে উপজেলার ভাটিয়ারি ইউনিয়নের মাদামবিবিরহাট এলাকা থেকে পুলিশ হেলালকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তার কাছ থেকে হত্যাকাÐে ব্যবহৃত ছুরিটিও জব্দ করা হয়েছে।
এর আগে ১৬ আগস্ট দিনেদুপুরে নিজের বাড়িতে নিজের সন্তানের গুলিতে খুন হন একমাস আগে স্বামীকে হারানো জেসমিন আক্তার (৫০)। তিনি পটিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জাপা নেতা শামসুল আলম মাস্টারের স্ত্রী। এ ঘটনায় মেয়ে শায়লা শারমিন নিপা বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মঈনুদ্দিন মোহাম্মদ মাঈনুর (৩২) কে গ্রেপ্তার করে। এ ধরনের হত্যাকাÐের পাশাপাশি আত্মহত্যাও বাড়ছে পাল্লাদিয়ে স¤প্রতি নগরীতে এক কলেজ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা সর্বমহলে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আট বছরের ব্যবধানে একই পরিবারের দুই ছেলেই বেছে নিয়েছে আত্মহননের পথ। গত ৩১ আগস্ট রাতে নগরীর আসকার দিঘির পাড় কাঁচাবাজার এলাকার ভাড়া বাসায় ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেন অরিত্র ঘোষ (২০)। তিনি সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। এর আগে ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারি অরিত্রের বড় ভাই অন্তু ঘোষ (১৮) নগরীর দেওয়ানজি পুকুর পাড় এলাকার ভাড়া বাসায় গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। তিনি তখন সরকারি সিটি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পূূর্বদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেও পাশবিকতার লাগাম টানা যাচ্ছে না। শিশু কিংবা নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে আবার সা¤প্রতিক সময়ে দলবেঁধে সংঘটিত হচ্ছে একের পর এক ধর্ষণকাÐ। এমন জঘন্য পাশবিকতার ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। গত পয়লা আগস্ট পটিয়ায় সংঘটিত দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনা সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাশবিকতার অধিকাংশ ঘটনার পরপর জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হলেও শেষপর্যন্ত তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারছে না। আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যাচ্ছে অনেকেই।
একটি বেসরকারি সংস্থার প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, চলতি বছরের বিগত আট মাসে সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে নয় শতাধিক। তার মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে একশ’ ৭৭টি। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৩৮টি। ধর্ষণের শিকার হওয়া অন্তত ১২ জন নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর ধরেই সংস্থাটি এসব তথ্য জানিয়েছে ওই সংস্থাটি। এর বাইরে অজানা কিংবা প্রকাশ্যে না আসা যৌন নিপীড়নের ঘটনা অসংখ্য বলেও তারা দাবি করেছে। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এসব অপরাধপ্রবনতা বৃদ্ধির অন্যতম সামাজিক বন্ধন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়। একটি অসুস্থ ধারা যেন সমাজে বিস্তৃত হতে শুরু করেছে। দেখা দিচ্ছে অস্থিরতা। সামাজিক পরিবর্তনের যে অসুস্থ ধারা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সবখানে। সামান্য কারণেই খুনাখুনিসহ যেসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে-এর প্রতিরোধ শুধু আইন দিয়ে হবে না। প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা ও আন্দোলন। আইনি প্রচেষ্টার পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। সমাজ থেকে অপরাধ দূর করা না গেলে অস্থিরতা কমানো যাবে না। এর জন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেরও প্রয়োজন রয়েছে।