বাড়ছে বজ্রপাত ও প্রাণহানি পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিন

4

 

শরতের হিমেল হাওয়া শীতের বাতাবরণ করে, শান্ত রাখে প্রকৃতিকে। স্বস্তিতে থাকে মানুষ। কিন্তু আশ্বিনের শুরু থেকে তার উল্টোটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে। দিনের শুরু থেকে সন্ধ্যা নাগাদ প্রচÐ তাপদাহে জ্বলছে দেশ আর রাতের প্রথম বা দ্বিপ্রহর থেকে শুরু হয় প্রচÐ বজ্রপাতসহ বৃষ্টি ও বাতাস। প্রকৃতির এ বৈরী আচরণের ফলে একদিকে জনজীবনে নেমে আসছে চরম অস্বস্তি। অপরদিকে বজ্রপাতে কেড়ে নিচ্ছে নিরীহ অনেক প্রাণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতাসহ জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমে বেড়ে চলেছে। বছরে সহস্রাধিক মানুষ বজ্রপাতে মারা যাচ্ছে। গত সোমবার রাতে চট্টগ্রামে একই পরিবারের দুই সদস্যসহ সারাদেশে ৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রামে ২জন, আগস্ট মাসে দেশের উত্তরাঞ্চলে চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে ১৭ জনের মৃত্যু এবং আরো ৯ জন আহত হয়েছে। এর আগে কিশোরগঞ্জের নিকলিতে হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে ২ নিহত ও আরো কয়েকজনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এভাবে বৈশাখ থেকে হেমন্ত পর্যন্ত চলতে থাকে বজ্রপাতের তান্ডব। ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি বজ্রপাত কমিয়ে আনতে তালগাছ রোপণের মত প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধনের ফলে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তা নিরসনে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিতে হবে। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে পরিকল্পিতভাবে তালগাছ রোপণের একটি জাতীয় পরিকল্পনার কথা জানা গেলেও বাস্তবতা হচ্ছে, গত ৫ বছরে তাল গাছ রোপণের কোন কর্মসূচি তেমন দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। প্রাকৃতিক সনাতন পদ্ধতি হিসেবে তালগাছ দীর্ঘমেয়াদে বজ্রপাত নিরোধসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হলেও ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর করাল গ্রাস এই বজ্রপাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে আরো কার্যকর প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষত বজ্রপাতের কয়েকদিন বা কয়েক ঘণ্টা আগে মানুষকে সতর্ক করার ব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ এবং বজ্রপাত নিরোধক পোল বসিয়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে শুধু তালগাছ রোপণে কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন নয়। বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে উন্নত বিশ্ব বজ্রপাত প্রতিরোধে বিভিন্ন উপায় বের করছে, আমাদেরকে সেইদিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে, কঠোর আইন পদক্ষেপের মাধ্যমে বনায়ন ধ্বংস ও বৃক্ষ নিধন প্রতিরোধ, পাহাড় কাটার উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ ও গণসচেতনতা সৃষ্টি করা। আমরা জানি, বিশ্বের বজ্রপাতপ্রবল দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় সারাবিশ্বেই বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে গেলেও সেটেলাইট ও উন্নত প্রযুক্তির থান্ডারর্স্টম ডিটেকটিভ সেন্সরের মাধ্যমে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিয়ে প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। কয়েক বছর আগে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৮টি অঞ্চলে আটটি ডিটেক্টিভ লাইটেনিং সেন্সর বসিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, প্রতিটি সেন্সরের আড়াইশ কিলোমিটার এলাকা কভার করার ক্ষমতা থাকায় ৮টি সেন্সর যন্ত্রে দেশের অধিকাংশ এলাকার বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হওয়ার কথা। কিন্তু এসব সেন্সর যন্ত্রের যথাযথ মনিটরিং এবং সতর্কবার্তা সাধারণ মানুষের কাছে সময়মত পৌঁছে দেয়ার কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বজ্রপাত সতর্কতা ও পূর্বাভাস ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পাশাপাশি বজ্রপাত নিরোধ ব্যবস্থা ও আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। দেশের মোবাইলফোন অপারেটরদের টাওয়ারগুলোতে আর্থিং পদ্ধতি সংযোজনের পাশাপাশি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে লাইটেনিং অ্যারেস্টার বসানোর কথা বেশ কয়েক ছর ধরে বলা হলেও আদতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। শুধুমাত্র পূর্বাভাস ও সতর্কিকরণ ব্যবস্থা জোরদার করে বজ্রপাতে মৃত্যু অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তিগত সময়োপযোগী পরিকল্পনাগুলোকে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত করে এখনই কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় কংক্রিটের তৈরি বজ্রপাত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোতে বজ্রপাত সতর্কীকরণ অ্যাপ চালু হয়েছে। বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দেয়ার আধাঘণ্টা-একঘণ্টা আগেই অ্যাপের মাধ্যমে সতর্ক সংকেত পাচ্ছে মানুষ। আবহাওয়া অধিদফতরের সতর্কিকরণ ব্যবস্থায় বজ্রপাতের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। রেডিও-টেলিভিশনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মত মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বজ্রপাত সতর্কিকরণ ও নিরাপত্তামূলক সচেতনতা জোরদার করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার বজ্রপাত প্রতিরোধে একটি কার্যক্রর ব্যবস্থা গড়ে তুলবে-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।