বাড়ছে করোনার সংক্রমণ ১১ দফা বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে

8

 

বৈশ্বিক মহামারি করোনা নতুন ঢেউ আবারও বিশ্বব্যাপী নতুনভাবে সংকট সৃষ্টি করে চলছে। উদ্বেগ্ন ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে শতকোটি মানুষ। বড় উদ্বেগের বিষয় ওমিক্রন নামক করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ( ডব্লিওএইচও) তথ্য অনুযায়ী এই ধরনটি আগের সব ধরনের চেয়ে দ্রæত ছড়ায়। বাংলাদেশেও ওমিক্রনে আক্রান্ত ৩৯ জন রোগী পাওয়া গেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনা সংক্রমণ আবার ব্যাপক হয়েছে। দেশটিতে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজারের নিচে নেমে এসেছিল। সেই সংখ্যা গত রবিবার ছিল প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার। ওমিক্রনে আক্রান্তের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও দৈনিক নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ১ শতাংশের নিচে নেমেছিল, রবিবার তা আবার সাড়ে ৮ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে এবং প্রতিদিনই এই হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত শনিবার পর্যন্ত এক সপ্তাহে তার আগের সপ্তাহের তুলনায় সংক্রমণ বেড়েছে ১১৫ শতাংশ। এ অবস্থায় করোনার নতুন ঢেউ কিভাবে মোকাবেলা করা হবে, তা নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা চলছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শক ও টেনিক্যাল কমিটি ইতোমধ্যে নতুন ভ্যারিয়েন্ট ঠেকাতে সরকারকে বেশকিছু পরামর্শ ও জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের কথা বলেছেন বলে সূত্র জানায়। এর প্রেক্ষিতে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ গত সোমবার ১১ দফা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, যা আগামী ১৩ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ নির্দেশনায় রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়ার ক্ষেত্রে কোভিড টিকা সনদ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। টিকা সনদ ছাড়া ১২ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারবে না বলেও জানানো হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনই বন্ধ হচ্ছে না বলে আগেই জানানো হয়েছে। তবে একেক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একেক দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরাসরি ক্লাসে যাবে। আর অনলাইন ক্লাস চলবে। খবর বিডিনিউজের। বাস, ট্রেনের মতো লঞ্চেও সক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চালাতে বলা হয়েছে। সব ধরনের যানের চালক ও সহকারীদের বাধ্যতামূলকভাবে টিকার সনদধারী হতে হবে। অফিস-আদালতসহ ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক থাকবে বলে জানানো হয়েছে। এই নিয়ম না মানলে শাস্তির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরু হলে মার্চের শেষ দিকে দেশজুড়ে লকডাউন জারি করা হয়, যা দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলে। সেই লকডাউনে জরুরি সেবার পরিবহন এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যে কারও চলাচল ছিল বারণ। পরিস্থিতির উন্নতিতে পরে সেই বিধি-নিষেধ শিথিল হয়। ডেল্টা সংক্রমণের পর গত বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট অবধি বিভিন্ন সময় লকডাউনের বিধি-নিষেধ ছিল। এরপর সংক্রমণের হার দ্রুত কমে এলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলে; জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টির পর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাস সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করেছে। দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সোমবার দেশে একদিনে শনাক্ত কোভিড রোগীর সংখ্যা এক ধাক্কায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ২২শ ছাড়িয়ে গেছে, সেই সঙ্গে দৈনিক শনাক্তের হার ছাড়িয়ে গেছে সাড়ে ৮ শতাংশ। দৈনিক শনাক্তের হার ৫ শতাংশের বেশি হলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে বলে মনে করা হয়। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করোনা ভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের প্রাদুর্ভাব ও দেশে এই রোগের সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা সিদ্ধান্ত, দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সচল রাখা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছে। আগামী ১৩ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সার্বিক কার্যাবলী/চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হল।
বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, দুই বছর ধরে চলা করোনা মহামারি বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রায় বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই সরকার এখনই নতুন করে লকডাউন বা কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করতে চাচ্ছে না। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এখনই বন্ধ না করার পক্ষে সরকার। কিন্তু পরিস্থিতি যদি খারাপের দিকে চলে যায়, তখন হয়তো সরকারের সামনেও অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না। সরকার এখন চাচ্ছে টিকা প্রদানের গতি বাড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে। কিন্তু এসব করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কি?
ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি, দুই ডোজ টিকা নেয়ার পরও করোনায় আক্রমণ হচ্ছেন অনেকে। সুতরাং টিকা দিলেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হবে না এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞানীরাও বলছেন, টিকার মতোই জরুরি মানুষের সচেতনতা। মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ও বারবার হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধিগুলো যথাযথভাবে মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, করোনার এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও বহু মানুষের আচরণে ন্যূনতম সচেতনতা পরিলক্ষিত হয় না । এসব কারণে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সংক্রমণ আবার লাগামছাড়া হয়ে পড়তে পারে।