বাহাত্তর বছরে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও উন্নয়নে দলটির অবদান অনস্বীকার্য

13

দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে ভারত উপমহাদেশে অবসান ঘটে ব্রিটিশ ঊপনিবেশবাদের শাসন আর শোষণ। সেইসাথে ১৯৪৭ সালে ১৪ ও ১৫ আগস্ট উপমহাদেশ ভেঙ্গে দুটি স্বাধীন দেশের উত্থান ঘটে। এর একটি ভারত অপরটি বাংলাদেশ। দ্বিজাতিতত্বের উপর ভিত্তি করে ধর্মের পরিচয়ে বিভক্ত রাষ্ট্র দুটির মধ্যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের ভাগে পড়ে; হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান। এসময় ঢাকা ভিত্তিক নেতৃত্ব পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছিলেন, পাকিস্তান অর্জনকে উচ্ছ¡াস ও উদ্দীপনায় গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য- এ উচ্ছ¡াস বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পাকিস্তান জন্মের কিছুদিন পরই কেন্দ্রীয় শাসকদের বিভিন্ন নীতি, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনসহ নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যে বাঙালির স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। এ পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল চিন্তার নেতৃত্ব শাসক দল ত্যাগ করে নিজেরাই একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন, যার ফলশ্রæতি ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের। নবগঠিত দলটির সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। কারাগারে থাকা শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর নির্বাচিত হন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। জন্মের ৬ বছরের মাথায় অসা¤প্রদায়িক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। সূত্র জানায়, ১৯৫৫ সালে এসে দলটির নাম পরিবর্তন করা হয়। নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। সূত্র জানায়, দলের নামের সঙ্গে মুসলিম শব্দটি থাকায় পরবর্তীতে কেউ কেউ আপত্তি করেছিলেন। এ নিয়ে দলে বেশ একটি বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যে মুসলিম শব্দটি থাকবে নাকি থাকবে না। তখন হিন্দু এবং মুসলিম আসনে আলাদাভাবে নির্বাচন হতো। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের (যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন হিসাবে পরিচিত) সময় সমঝোতা হয়েছিল যে, এই দলটি একটি অসা¤প্রদায়িক দল হবে। ওই নির্বাচনে ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পায় যুক্তফ্রন্ট, নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৯৫৫ আওয়ামী মুসলিম লীগে যে কাউন্সিল হয়, সেখানে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। ফলে অমুসলিমরাও এই দলে যোগ দেয়ার সুযোগ পান। তবে পূর্ব পাকিস্তান শব্দ দুইটি বাদ পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা পর থেকে প্রবাসী সরকারের সব কাগজপত্রে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নাম ব্যবহার হতে শুরু করে। ’৬৬তে বাঙালির বাঁচার দাবি ছয়দফা দেন বঙ্গবন্ধু। একহয় সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বাঙালি মুক্ত করে বঙ্গবন্ধুকে। ’৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু বিজয়ী দল আওয়ামীলীগকে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসকদের তালবাহানা শুরু হয়। বারবার সময় দিয়েও সরকার গঠন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ফলে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের সেনাবাহিনী দিয়ে অপারেশন সার্চলাইট নামে গভীর রাতে ঢাকাসহ সারা দেশে বাঙালিদের উপর নির্মম হত্যাকাÐ শুরু করলে ওই রাতেই বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে লিখিতভাবে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। যা ওয়ারলেসযোগে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয় পরের দিন এম.এ.হান্নানের নেতৃত্বে রেডিও এবং মাইকে প্রচার করা হয়। ২৬ মার্চ ভোররাত থেকে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। মুক্তিকামী বাঙালির বিশাল আত্মত্যাগে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে আসে স্বাধীনতা।
বঙ্গবন্ধু যখন দেশ গড়ার পথে, ঠিক সেই সময়ে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাঁকে। আবারও উল্টোপথে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা নির্বাসনে। কঠিন সময়ে দলের আহŸায়কের দায়িত্ব পালন করেন জোহরা তাজউদ্দিন। ’৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। ফিরে আসেন দেশে। ভোট-ভাতের অধিকার আদায়ে রাজপথে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ। শত নির্যাতনেও দমেনি দলটি। রোজ গার্ডেন থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ চলায় শুধুই সংগ্রাম আর ঐতিহ্যের গল্প। শেখ হাসিনা দুটোই করতে পেরেছেন। বহুদিন তিনি বিরোধী দলে ছিলেন, ক্ষমতার বাইরে ছিলেন এবং সর্বশেষ বহু প্রতিকূলতার মাঝে ১৯৯৬ সালে নির্বাচন করে প্রথমবার দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসতে পেরেছেন। সর্বশেষ আবারও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মিত্র সমেত সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। এখনও ধারাবাহিকভাবে আওয়ামীলীগ সরকার দেশ শাসন করে যাচ্ছে। বলা অপেক্ষা রাখেনা যে, আওয়ামী লীগের হাত ধরেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, এ দলটির হাত ধরেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধির পথে। আজ বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে মধ্যম আয়ের দেশ হিসাবে। বিশ্বে আজ বাংলাদেশকে উপস্থাপন করা হচ্ছে উন্নয়নের মডেল হিসাবে। এটি অবশ্যই দল হিসাবে আওযামীলীগের অর্জন। তবে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আওয়ামীলীগে কিছু অবাঞ্চিত লোকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে ওইসব লোকের বিতর্কিত কর্মকাÐের ফলে দলটির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ¤øান করারও অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এ ব্যাপারে বারবার সতর্কতার কথা বললেও কার্যক্ষেত্রে খুব একটি দৃশ্যমান নয়। আমরা মনে করি, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে দলটি ৭২ বছরে পা দিয়েছে। সরকার আর দল যদি একাকার হয়, তবে দল ও দেশের উন্নয়ন দুটিই বিঘœ ঘটবে। এখন সময় হয়েছে দলকে ঘোছানো আর দলে মেধাবী নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করার। আমরা আশা করি, উন্নয়নের পথে হাঁটা আওয়ামী লীগের লক্ষ্যই যদি হয়- উন্নত বাংলাদেশ তবে নেতৃত্বও সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। অভিনন্দন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ।