বালিশকান্ডে বড় দুর্নীতির প্রকাশ

76

টানা ১০ বছর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দুর্নীতি দমনে জোর দেওয়ার কথা বললেও বালিশকান্ডের মতো নতুন দুর্নীতির খবর ছিল বছরজুড়েই আলোচিত। বালিশকান্ডের পর পর্দা ও বই কেনায় একই ধরনের দুর্নীতির খবর এসেছে। দুর্নীতি দমনকারী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের ভেতরকার দুর্নীতির চিত্রও বেরিয়ে এসেছে ডিআইজি মিজানুর রহমানের ফাঁস করা এক অডিও টেপে। এরপর দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদকে সংস্থার কর্মীদেরই সতর্ক করে আসতে দেখা গেছে। নোটিশ আর তলবের মধ্য দিয়ে দুদক বছরজুড়ে হাঁকডাক দিয়ে এলেও তাদের কাজ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছে উচ্চ আদালত। নির্দোষ জাহালমের কারাবাস আর বেসিক ব্যাংক দুর্নীতির তদন্ত নিয়ে আদালতের তোপের মুখে পড়তে হয় দুর্নীতি দমন সংস্থাটিকে।
দুদককে নিয়ে এক বিচারকের এই মন্তব্যও আসে- ‘যে বিড়াল ইঁদুর ধরতে পারে না, সেই বিড়াল থাকার প্রয়োজন কি?’
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক উপস্থিত আছে কি না, চিকিৎসকরা কর্মস্থলে থাকে কি না, তা দেখতেও হাঁকডাক ছেড়ে নেমেছিল দুদক। এক পর্যায়ে আদালত এসবের চেয়ে বড় বড় দুর্নীতি ঠেকাতে দুদককে মনোযোগী হতে বলে দুদককে। সরকার ও দুদক তাদের নানা তৎপরতার খবর দিয়ে এলেও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ধারণা সূচকে দুর্নীতি বাড়ার চিত্রই বেরিয়ে এসেছে।
বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের ২০১৮ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বার্লিনভিত্তিক সংস্থাটি যে প্রতিবেদন এবছর প্রকাশ করেছে, তাতে সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৪৯ নম্বরে। গতবার ছিল ১৪৩ নম্বরে। আবার অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বিবেচনা করলে বাংলাদেশ আগের সপ্তদশ অবস্থান থেকে নেমে গেছে ত্রয়োদশ অবস্থানে। খবর বিডিনিউজের
বালিশকান্ড, এরপর পর্দা-বই :
প্রায় ৬ হাজার টাকার একটি বালিশ ভবনে ওঠাতে খরচ প্রায় ১ হাজার টাকা- রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মীদের আবাসন প্রকল্পের খরচের এমন হিসাব দেখে অনেকেরই চোখ কপালে উঠেছিল। ওই গ্রিনসিটি আবাসন প্রকল্পের ২০ ও ১৬ তলা ভবনের প্রয়োজনীয় মালামাল কেনা ও ভবনে তোলার কাজে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে বছরের মাঝামাঝিতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুর্নীতির এই চিত্র বেরিয়ে আসে।
এরপর গত ১৯ মে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করে। দুই কমিটির তদন্তেই রূপপুরে ৬২ কোটি ২০ লাখ ৮৯ হাজার টাকার অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। হাই কোর্টের নির্দেশে জুলাই মাসে আদালতে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতির জন্য ৩৪ জন প্রকৌশলীকে দায়ী করা হয়।
পরে গত ১৭ অক্টোবর ওই অভিযোগসহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের আবাসন প্রকল্পের আরও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এরপর ১২ ডিসেম্বর পাবনা গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমসহ ১৩ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে আসামি করে মামলা করা হয়। আসামিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারেও পাঠানো হয়েছে।
বালিশকান্ডে রেশ না কাটতেই ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেনাকাটায় আরেক দুর্নীতির খবর বেরিয়ে আসে। হাসপাতালের আইসিইউয়ের রোগীকে আড়াল করে রাখার এক সেট (১৬ পিস) পর্দা কেনা বাবদ খরচ দেখানো হয় ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অস্বাভাবিক ওই ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর উচ্চমূল্যে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনার মাধ্যমে সরকারের ১০ কোটি টাকা আত্মসাত চেষ্টার অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর বই কেনার ক্ষেত্রে ৫ হাজার ৫০০ টাকার বই ৮৫ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তার তদন্তে কমিটি করলেও তার অগ্রগতি আর জানা যায়নি।
ডিআইজি মিজানের ফাঁদে দুদকের বাছির :
বছরের মাঝামাঝিতে পুলিশের বরখাস্ত ডিআইজি মিজানুর রহমান একটি অডিও টেপ ফাঁস করলে শুরু হয় তোলপাড়। তাতে বেরিয়ে আসে দুদক কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছিরের থলের বেড়াল। মিজানের অভিযোগ, তার সম্পদ অনুসন্ধানে গিয়ে তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন দুদকের পরিচালক বাছির। দাবির সপক্ষে তাদের কথোপকথনের অডিও ক্লিপ গণমাধ্যমে সরবরাহ করেন মিজান।
পরে এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করার পাশাপাশি ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে ১৬ জুলাই মিজান ও বাছিরকে আসামি করে কমিশনের পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্যা মামলা করেন। এরপর উচ্চ আদালতে জামিন চাইতে গেলে মিজানকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় হাই কোর্ট। অন্যদিকে ২২ জুলাই এনামুল বাছিরকে দারুসসালাম এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে দুদক।
এই ঘটনা কমিশনকে অনেকটা আস্থার সংকটে ফেলে দেয় বলে সমালোচনা উঠলে ঘর সামালাতে নড়েচড়ে বসে দুদক। যার ধারাবাহিকতায় ২২ অক্টোবর চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সভাপতিত্বে দুদকের ‘অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন কমিটির’ এক সভায় সংস্থাটির তিনজন উপ-পরিচালক, দুইজন সহকারী পরিচালক ও তিনজন উপ-সহকারী পরিচালকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়।
জাহালমকান্ডে দুদকের ভুল স্বীকার :
জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের প্রায় ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১২ সালে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক। এরপর সালেককে তলব করে দুদক চিঠি দিলে সেই চিঠি পৌঁছায় জাহালমের টাঙ্গাইলের বাড়ির ঠিকানায়। নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলের শ্রমিক জাহালম তখন দুদকে গিয়ে বলেছিলেন, তিনি আবু সালেক নন, সোনালী ব্যাংকে তার কোনো অ্যাকাউন্টও নেই। ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য আবু সালেকের যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটাও তার নয়।
কিন্তু দুদকে উপস্থিত বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা জাহালমকেই ‘আবু সালেক’ হিসেবে শনাক্ত করেন। পরে ২০১৬ সালের ফেব্রূয়ারি মাসে ঘোড়াশাল থেকে জাহালমকে গ্রেপ্তার করে দুদক।
পরে বিচারিক আদালতেও জাহালম দুদকের পরিচয় বিভ্রাটের বিষয়টি তুলে ধরে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। কিন্তু কেউ তার কথা কানে তোলেনি। তিন বছর ধরে জাহালমের কারাভোগের খবর গণমাধ্যমে এলে হাই কোর্ট ২৮ জানুয়ারি স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি রুল জারি করে। কারাগারে থাকা ‘ভুল’ আসামি জাহালমকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হবে না, তাকে মুক্তি দিতে কেন ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং তাকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় ওই রুলে।
উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে গত ৪ ফেব্রূয়ারি মুক্তি পান জাহালম। গত ১১ জুলাই আদালতে দাখিল করা নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে দুদক জানায়, তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলের কারণে আসামি না হয়েও জাহালমকে কারাভোগ করতে হয়েছে। এ ঘটনায় নিজেদের ১১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার তথ্য পরে হাই কোর্টকে জানায় দুদক।
‘ক্যাসিনো হোতাদের’ সম্পদের খোঁজে :
১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের বেশ কয়েকজন নেতার এই অবৈধ কর্মকান্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই সময় দাপুটে অনেক নেতা গ্রেপ্তারের পর তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে মামলা হয়। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যাসিনোর মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে নামে দুদক। দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়।
অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিত্তবান হওয়া ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। তাদের মধ্যে আলোচিত ঠিকাদার জি কে শামীম, বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূইয়া, অনলাইন ক্যাসিনো হোতা সেলিম প্রধান, বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূইয়া, কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি ও কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ, ঢাকার তিন কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান, তারেকুজ্জামান রাজীব ও এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ, ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, তার সহযোগী এনামুল হক আরমান, যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন, যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী সুমি রহমান। তাদের কয়েকজনকে রিমান্ডে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে দুদক। এছাড়া আওয়ামী লীগের তিন সংসদ সদস্য নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন, সামশুল হক চৌধুরী ও মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের প্রায় ২০০ জনের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে দুদক।
এস কে সিনহার বিরুদ্ধে মামলা ও অন্যান্য :
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সরকারের সঙ্গে টানাপড়েনের ঘটনাক্রমে প্রবাসে থিতু হওয়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির মামলায় বছরের শেষ ভাগে এসে অভিযোগপত্র দিয়েছে দুদক। বিচারপতি সিনহা বিদেশে পাড়ি জমানোর পর দুদক অভিযোগ পায়, তিনি ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ব্যবসায়ী পরিচয়ে দুই ব্যক্তির নেওয়া ঋণের চার কোটি টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে নিয়েছিলেন। এই অভিযোগের দীর্ঘ তদন্তের পর গত ১০ জুলাই সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন। ৪ ডিসেম্বর এস কে সিনহার জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়ে অভিযোগপত্র অনুমোদন করে কমিশন। আর ১০ ডিসেম্বর সেই অভিযোগপত্র আদালতে জমা পড়ে।
রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ের এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর ভবনটির নকশা জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় ভবন মালিক, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ন গ্রæপের চেয়ারম্যান এবং রাজউকের সাবেক দুই চেয়ারম্যানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক। নকশা জালিয়াতির এক মামলায় নভেম্বরের শুরুতে অভিযোগপত্রও আদালতে দাখিল করেছে দুদক।
বিদায়ী বছরের বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য খাতের নানা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে দুদক। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থেকে অবৈধ পন্থায় ‘অঢেল সম্পত্তির মালিক’ হওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২৩ কর্মকর্তা-কর্মকাচীকে দুদকের সুপারিশে বদলি করা হয়।
বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দুদক চেয়ারম্যান ও একজন সংসদ সদস্যের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও এবছর ছিল আলোচনায়। সংসদের স্থায়ী কমিটি দুদককে তলবের উদ্যোগও নিয়েছিল। কিন্তু দুদককে তলবের এখতিয়ার সংসদীয় কমিটির আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠায় বিষয়টি কেঁচে যায়।