বার আউলিয়ার অন্যতম হজরত শেখ কুতুব (রহ.) এর ইসলাম প্রচার

18

অধ্যক্ষ মাওলানা আব্বাস আনোয়ারী

ইতিহাস পাঠে জানা যায়, আমাদের ভারতবর্ষে ইসলামের প্রাথমিক যুগে দু-চারজন সাহাবীর পদার্পন হয়। এরপর তাঁদেরই অনুসারী-বংশধর এবং পরবর্তীতে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসারী আরব বণিকগণ-ইসলামপ্রচারক সুফিয়ায়ে কেরাম ও আউলিয়ায়ে কেরাম বন্দর কেন্দ্রিক বিভিন্ন দেশে ব্যবসা ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন যুগের চাহিদা মোতাবেক। তাঁরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে এসে শুধু অর্থকড়ি কামাই করে চলে যান নি ; বরং মনের ভিতর থাকা নির্ভেজাল ইলমে দ্বীন,শরীয়ত-তরীকত প্রচার-এ আত্বত্যাগে নিজেদেরকে মনোনিবেশ করেন এবং পরিবারের সদস্যদেরকেও মনোনিবেশ করান। এ ধারার একজন মহান সাধক ও ইসলাম প্রচারক ছিলেন, হযরত শেখ কুতুব(রহ.)।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কট্টর বৌদ্ধ আর হিন্দু ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠ এ এলাকায় (ডুমুরিয়া-রূদুরায়) হযরত শেখ কুতুব রহমাতুল্লাহি আলায়হি বহু কারামতি প্রদর্শনপূর্বক অনেক সংগ্রাম,ত্যাগ ও কষ্টের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করেন সুচারুরূপে। আল্লাহ ও রাসূল সর্ম্পকে তাঁর বিশদ ওয়াজ-নছিহত, বয়ান, সুন্দর ব্যবহার এবং কেরামতি দেখে ইসলামের প্রতি এতদ অঞ্চলের মানুষ ঝুঁকে পড়ে। ফলে এ অঞ্চল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। । ‘দেয়াং পরগনার ইতিহাস আদিকাল’ গ্রন্থের ৩০৯ পৃষ্ঠায় রয়েছে, চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার রুদুরা গ্রামে শেখ কুতুব রহ. এর প্রাচীন মাজার হযরত শাহ মোহছেন আউলিয়া রহ. এর সমসাময়িক কালের এবং তাঁর সফর সঙ্গীও। (তথ্য: জামাল উদ্দিন, বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম, পৃ.৫৮) একসাথে তাঁরা আনোয়ারায় ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। তবে শাহ মোহছেন আউলিয়া রহ. বটতলীতে আশ্রয় নেন। আর শেখ কুতুব রহ. রুদুরা গ্রামে অবস্থান করেন এবং এখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। (তথ্য- পীর আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রাম,পৃ.৫১) ইসলামের ইতিহাসের (পূর্ব বাংলায়) সুস্পষ্ট বক্তব্য হল- আরকান শাসনামলে মগ (বৌদ্ধ) পর্তুগীজদের বাণিজ্য বন্দর ছিল দেয়াং বন্দর। তৎকালে রুদুরা নামক এ এলাকাটি ছিল শঙ্খ ও চাঁনখালী নদী পরিবেষ্টিত একটি দ্বীপ। এ দ্বীপটি মগ, পর্তুগীজরা ছোট বন্দর হিসেবে ব্যবহার করত। দ্বীপাকৃতির জনবহুল এই ছোট্ট বন্দরটিকে হযরত শেখ কুতুব রহ. বসবাসের স্থান হিসেবে বেঁচে নেন। এখানেই তিনি ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন এবং বিপুল সংখ্যক মগ উপজাতীকে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। ১৪শ সালের মাঝামাঝি সময়ে শেখ কুতুব রহ. এই এলাকায় আসেন। (তথ্য- পীর আউলিয়ার পূণ্যভূমি চট্টগ্রাম,পৃ.৫৯) চট্টগ্রামের ইতিহাস গবেষক ড. এনামুল হকের তথ্য মতে জানা যায়, সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ এর যুগে (১৩৯০-১৪১০) শেখ কুতুব রহ. এই এলাকায় আসেন। তাঁর ধর্ম প্রচার শুধু ডুমুরিয়া-রুদুরা গ্রামে সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং পার্শ্ববর্তী গ্রাম কৈখাইন, ভিংরোল, সৈয়দ কুচাইয়া, বিলপুর, শিলাইগড়া, শোলকাটাসহ আনোয়ারার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সর্বব্যাপী ছিল। তাঁর ইসলাম প্রচারে ব্যাপক সফলতা লাভ করায় তৎকালিন সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ- এর প্রতিনিধি খুশি হয়ে এতদ অঞ্চলকে হযরতের আওতাভুক্ত এরিয়া ( অর্থ্যাৎ-পরগনায়ে শেখ কুতুব ) ঘোষণা করেন। যেমন- এখনও জায়গা-জমির খতিয়ান-সীটে সুস্পষ্ট করে লেখা রয়েছে ‘জিম্মায় শেখ কুতুব’ নামটি। এ লেখা দ্বারাও বুঝা যায়, তাঁর প্রভাব- প্রতিপত্তি আর ধর্ম প্রচারে যতেষ্ট অবদান রয়েছে। দ্বীন-এ ইসলামের সু-বিশাল খেদমত করে ইন্তেকাল করলে এখানে তাঁর মাজার গড়ে উঠে। তাঁর বংশধরগণ এ এলাকা ছাড়াও চন্দনাইশের কানাইমাদারী এবং হাটহাজারীর ছিপাতলীতে রয়েছে । (তথ্য- প্রাগুক্ত,পৃ.৫৮)
রুদুরা গ্রামের উত্তর পশ্চিম শেষ সীমান্তে নীরবে-নিভৃতে অবস্থিত উক্ত মাজারের তেমন প্রচার-প্রসার ঘটেনি। ফলে মাজারের তেমন উন্নয়ন হয়নি। মাজার দেখতে একটি সাধারণ কবরের মত। তাঁর কবরের উপর ছাতার মত বিশাল আকৃতির একটি গাব গাছ ডাল-পালা ছড়িয়ে স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৬/৭ শত বছর ধরে। হযরতের অনেক কারামাত রয়েছে। তাঁর মাজারের উপর থাকা গাছেরও অনেক ইতিহাস ও কেরামত রয়েছে। ১৯৯১ সালের প্রলংকারী ঘূর্ণিঝড়ে অত্র এলাকার শতশত গাছপালা, বাড়িঘর, দুমড়ে- মুচড়ে গেলেও মাজারের উক্ত গাছের একটা সবুজ পাতাও ঝরেনি। এভাবে তাঁর কেরামতির অনেক প্রমান ও জনশ্রতি রয়েছে। (তথ্য- প্রাগুক্ত,পৃ.৫৯) ইতিহাস থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের কুতুবদিয়া উপজেলায় ও খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায়ও তিনি ইসলাম প্রচার করেছেন এবং তথায় উক্ত অলির আস্তানা শরীফ রয়েছে। ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, কুতুবদিয়া নামকরণটি এই অলির নামেই হয়েছে। আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া গ্রামের পূর্বাংশে শেখ কুতুব রহ. দীঘিনামের প্রকাান্ড এক প্রাচীন দীঘি রয়েছে। জনগণের পানীয় জলের প্রয়োজনে তিনি নিজেই দিঘিটি খনন করান। (তথ্য: দেয়াং পরগনার ইতিহাসি আদিকাল, পৃ-৩১২) । ইতিহাস গবেষক ড. সেলিম জাহাঙ্গীর সাহেবের ‘আন্দরকিল্লাহ শাহী মসজিদের ইতিহাস ’ বইয়ে ও গবেষক অধ্যাপক আবু তালেব বেলালের ইসলামিক ফাউন্ডেশন,চট্টগ্রাম.২০১৩ ইং, অক্টোবর মাসের ‘মাসিক সাম্পান’ পত্রিকায় বার আউলিয়ার ইতিহাস সম্বলিত প্রকাশিত প্রবন্ধের তথ্যানুসারে জানা যায়, ‘খ্রিষ্টীয় ৮ম/৯ম শতাব্দীতে আরব ভূগোলিকদের ভ্রমণ বিত্তান্তে আরব বণিকদের চট্টগ্রাম যোগাযোগের বিশদ বিবরণ রয়েছে। এরপর থেকে অলি-আল্লাহগণ চট্টগ্রাম আসতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় বার আউলিয়াগণও ১৪শ সালের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। এদের মধ্যে শাহ মোহছেন আউলিয়ার সাথী হয়ে শেখ কুতুব মতান্তরে কুতুব আলম রহ.ও এসেছিলেন। (তথ্য- পীর আউলিয়ার পূণ্যভূমি চট্টগ্রাম,পৃ.৫৮) ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, বার আউলিয়ার অলিগনের সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত/তালিকা রয়েছে। ইতিহাস গবেষক সাংবাদিক জামাল উদ্দিনের ‘বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম’ বইয়ের ৫৭ পৃষ্ঠার তথ্যমতে এক তালিকায় কুতুব আলম বা শেখ কুতুবের নাম বার আউলিয়ার ১৩ নং-এ। অন্য এক তালিকায় ৫৪ নং-এ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত বার আউলিয়ার ৪৪ পৃষ্টার আরবি/ ফার্সী পান্ডুলিপিতে তাঁর নাম ৪র্থ নং-এ রয়েছে। (তথ্য- চ.বি ইতিহাস বিভাগ)
হযরতের উল্লেখযোগ্য কারামতসমূহ থেকে এখানে শুধুমাত্র একটি উল্লেখ করা হল: যা জনশ্রতিতে এখনো শুনা যায়। বর্ণনা হল, হযরতের মাজারের উত্তর পার্শ্বে একটি বিরাট পুকুর ছিল (এখন অর্ধেক পরিমান আছে)। তৎকালিন যুগে ডেকোরেশনের সরঞ্জাম তেমন বেশি ছিল না। ফলে বিবাহ-শাদী ও মেজবান-এ সরঞ্জাম জোগার করা কঠিন হয়ে যেতো। এ অবস্থা দেখে হযরত শেষ বয়সে বংশধরকে ওসিয়ত করে যান; তোমাদের কারো বিবাহ-শাদী ও মেজবান উপস্থিত হলে আমার ইন্তেকালের পরে হান্ডি-ডেকসি এবং এ জাতীয় সরঞ্জামের যা যা দরকার এজন্য যদি আমার পার্শ্বস্থ পুকুর পাড়ে সন্ধ্যায় একটি কাগজে লিখে তালিকা রাখো তাহলে তা যথাসময়ে পাবে। হযরতের কথামতো ইন্তেকালের পরে পুকুর পাড়ে সন্ধ্যায় একটি কাগজে লিখে রেখে দিলে পর দিন সকালে লিখা মোতাবেক প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র উঠে যেত পুকুর পাড়ে। বিবাহ-শাদী ও মেজবান শেষ হলে উক্ত সরঞ্জামগুলো আবার পুকুর পাড়ে রেখে আসলে তা গায়েব হয়ে যেত। হযরতের এ কেরামতটি কয়েকশত বৎসর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে ছিল। পরবর্তীতে কোন এক পরিবারের বিবাহ অনুষ্ঠান শেষ করে লোভে উক্ত সরঞ্জামের একটি সুন্দর লবণের দানী রেখে দিলে আর এই সরঞ্জাম উঠেনি। এভাবে তাঁর অসংখ্য কারামত রয়েছে। এখনও অনেকে তাঁর সাথে দেখা/দর্শন লাভ করে বলে জনশ্রতি আছে। (তথ্য- প্রাগুক্ত) আসলে ইসলামের প্রচারকদের ইতিহাস জানা আমাদের মুসলিমদের নেহায়াত জরুরি এবং উচিত। অতীত ইতিহাসকে ভুলে আজ আমাদের সমাজের মধ্যে সঠিক ইসলামের নিয়ম-নীতি মানা হচ্ছে না। ফলে বিভ্রান্ত আর পদভ্রষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের নবীর হাদিস অনুযায়ী অলিগন হলেন নবীর উত্তরসূরী। তাই অলিদের পথ, মত ও দিক-নির্দেশনা (শরীয়ত-তরীকত) অনুযায়ী চলা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব ও সঠিক পথ প্রাপ্তির ঠিকানা। আমাদের জানা উচিত,আমাদের পূর্বপুরুষদের ইসলাম গ্রহনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান হল হযরত শেখ কুতুব রহ.। তার ওসিলায় এখানে ইসলাম পেয়েছি। আজ-কাল আমাদের দেশবাসী তা সহজে অনুভব করতে চায় না। তবে, এ ক্ষেত্রে আমি তার অবদানকে স্বীকার/স্বরণ করার অনুরোধ করছি। কারণ, আল্লাহ স্বরণকারীদেরকে স্বরণ করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন-‘কোন বান্দা আমার নিয়ামতের শুকরিয়া করলে আমি তা’তে বরকত দিই। আর আমার নিয়ামতের নাশুকরিয়া করলে আমি সে জাতির উপর লা’নত অর্পন করি। (তথ্য: আল-কোরআন) । হযরত শেখ কুতুব রহমাতুল্লাহি আলায়হি শেষ বয়সে অত্র এলাকা থেকে বিবাহ করেন। সেই বংশে আমরা (এলাকাবাসি) জম্ম গ্রহন করি। তিনি ১৩০ বছর জীবিত ছিলেন। মুগল সম্রাট সফল ইসলাম প্রচারক হিসেবে তাকে ৮০ শাহী ধোন সম্পত্তি প্রদান করেন। চট্টগ্রামের কাট্টলী,হাটহাজারী ও চন্দনাইশ-এ হযরতের সম্পত্তি রয়েছে। (তথ্য- পি.এস/সি.এস সিট সহ বেশকিছু উপাদন পূর্ণাঙ্গ জীবনিতে.)। ধর্ম মন্ত্রনালয়ের অধিনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক ২০১০ সালে প্রকাশিত. আল-কুরআনুল করীম সংক্ষিপ্ত বিশ^কোষ এর ২২ ক্রম লেখক (মুফাসসির)। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক ২০০৯ সালে ‘বার আউলিয়া গবেষণা তথ্য কমিটি’ গঠন হয় আন্দরকিল্লাহ ইফা অফিসে। (এ কমিটিতে কাজ করার সুভাগ্যে বেরিয়ে আসে আমার পূর্বসুরী বার আউলিয়ার ওলি হযরত শেখ কুতুব রহমাতুল্লাহি আলায়হির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য)। আল্লাহ আমাদের সকলকে অলি-আল্লাহর মর্যাদা ও কদর বুঝার তাওফিক দান করুক এবং তাদের পথের পথিক করুক। যেমনটা আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ফরিয়াদ করেছেন- ‘চালাও সে পথে, যে পথে তোমার প্রিয়জন গেছেন চলি’। আমিন।।
লেখক: বংশধর, শিক্ষক ও গবেষক