বাঙালির আত্মগৌরবের মাস

4

রতন কুমার তুরী

চলছে বাঙালির চিরকালীন আবেদনের মাস ফেব্রুয়ারি। এ মাসটি আসলেই বাঙালি জাতি ফিরে যায় সেই ১৯৫২ সালের মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় ঘটে যাওয়া বহু স্মৃতি বিজড়িত ঘটনাবলীতে। মূলতঃ ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির প্রথম সোপান। যে আন্দোলন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। পূর্বপাকিস্তানের বীর জনতা সেদিন সালাম, রফিক,বরকতের রক্তের বিনিময়ে অর্জন করে নিয়েছিল মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার।
সে যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্বপাকিস্তানিদের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন এবং শোষণ শুরু করেছিল তাদের সে অত্যাচার, জুলুম শেষ হয়েছিল এদেশ মুক্তি লাভ করার পর। এদেশের সাত কোটি মানুষ সেদিন তাদের রিরুদ্ধে পূর্বোকিস্তানের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক হয়ে মুক্তি সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এদেশকে স্বাধীন করেছিল। প্রকৃতপক্ষে ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই বাঙালি আবেক তাড়িত হয়। ভাষার জন্য শহীদ হওয়া বিভিন্ন শহীদদের স্মরণ করে নানা ধরনের অনুষ্ঠান সাঁজায়। দেশের প্রতিটি জায়গায় মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এ মাসটি বাঙালির হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে সেই ১৯৫২ সাল থেকেই। এ মাসটিতে যেহেতু আমরা আমাদের প্রাণের ভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্টিত করেছি সেহেতু এ মাসটি আমাদের জাতীয় জীবনে আশার মাসও। এ মাসে বাঙালি জাতি সবসময় আশা করে বাঙালি জাতিসত্তার সব মানুষ এক হয়ে দেশের জন্য কাজ করবে। এ মাসটি আসলে স্বাধীনতার সপক্ষের মানুষরা এক হয়ে আশায় বুক বাঁধে। এদেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের আস্ফালন বন্ধ হবে এবং একদিন এরা রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ থেকে বিদায় নিবে এবং রাষ্ট্র গঠনে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিরা আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে। আমরা লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাঁচ দশকেরও অধিক সময় পাড় হয়ে গেছে কিন্তু এখনও বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে স্বাধীনতা বিরোধীরা বহাল তবিয়তেই রয়ে গেছে। এর বাইরে এদের প্রজন্মরাও এখনও বুক ফুলিয়ে স্বাধীনতার বিপক্ষে কথা বলছে। এ মাসে এসব স্বাধীনতা বিরোধী প্রজন্মদের রুখে দেয়ার শপথ নিতে হবে কারণ এরা যদি এভাবে বুক ফুলিয়ে স্বাধীনতার বিপক্ষে সবসময় কথা বলতে থাকে তাহলে কিছু তরুণ অবশ্যই বিভ্রান্ত হবে। তাই এদের আটকানো খুবই জরুরি। এ মাসে আমরা যেমন মাতৃভাষা বাংলাকে অর্জন করেছি তেমনি আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এ মাস থেকে ভাষা আন্দোলনের সাথে সাথে আমাদের মুক্তির আন্দোলনও শুরু হয়েছিল। যদিও এ মুক্তি পেতে আমাদের আরো বেশকিছু দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল তব্ওু বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুটা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। যদি ভাষার জন্য সেদিন আন্দোলন না হতো তাহলে বাঙালিদের সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানিরা চিনতোনা। তারা বুঝতে পারতোনা পূর্বপাকিস্তানিরাও বীরের জাতি। যারা সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাংলা ভাষার জন্য রাজপথে নেমে মিছিল করেছিল এবং যারা বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বুলেটের আঘাতে শহীদ হয়েছিল তাদের ঋণ কখনও শোধ হবার নয়। মূলতঃ এরাই আমাদের শিখিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়। কীভাবে আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায় করে নিতে হয়। এ মাসে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের কথা মনে করে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের পরপরই ১৯৭২ সাল থেকে শুরু হয় বইমেলা উৎসব। মূলতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ধমান হাউস সংলগ্ন বটতলায় বাবু চিত্তরঞ্জন সাহা কলকাতা থেকে ৩২ টি বই এনে একটি চটের বস্তায় বিক্রি শুরু করেছিলেন সেই থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এ বইমেলা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমি উক্ত বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত করে। বর্তমানে এ বইমেলাও ফেব্রুয়ারি এলে বাঙালিদের প্রাণের মেলায় রূপান্তরিত হয়। পুরো ফেব্রুয়ারিজুড়ে চলে এ বইমেলা। তার সাথেসাথে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয় ভাষা শহীদদের। মূলতঃ যে জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয় সেজাতিকে দাবিয়ে রাখা কার সাধ্য। আর তাই সেই ভাষা আন্দোলনের বীজ পত্রপল্লবে বিস্তৃতি লাভ করেছিল ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। একটি নতুন দেশ হিসেবে আমরা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করলাম। এর জন্য হারালাম আমরা আমাদের অসংখ্য দেশপ্রেমিক মানুষকে। নিপীড়িত মানুষের রক্তের বন্যায় ভেসে গেলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মসনদ। এ মুক্তির আন্দোলনে কেউ হারালো পিতাকে, কেউ হারালো ভাইকে, কেউবা হারালো তার মা-বাবাকে। তবুও বাংলার বুকে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হলো। বাংলাদেশ পেলো একটি লাল সবুজের পতাকা। প্রকৃতপক্ষে এসব কিছু সম্ভব হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেরণায়। ১৯৫২ সালে পূর্বপাকিস্তানের দামাল ছেলেরা যদি তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ভাষার অধিকার আদায় করতে না পারতো তাহলে সম্ভবতঃ আমাদের মুক্তিও বিলম্বিত হতো। তাই এ মাসটি আমাদের জাতীয় জীবনে বেশ অর্থবহ এবং আত্মগৌরবের । কারণ এ মাসে ভাষার জন্য প্রাণ উৎস্বর্গকারী শহীদরা যুগেযুগে আমাদের কাছে আন্দোলন সংগ্রামের প্রেরণার উৎস হয়ে আমাদের পথ দেখিয়ে যাবে অনন্তকাল।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক