বাংলার দার্জিলিং ‘সাজেক ভ্যালি’ ট্যুরে

27

সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের কাছে বর্তমান সময়ের আলোচিত স্পট হচ্ছে ‘সাজেক ভ্যালি’। দৃষ্টি নন্দন প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার এই স্পটকে ভারতের দার্জিলিং এর সঙ্গে তুলনা করা হয়।
বৈশ্বিক মহামারী করোনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভ্রমণপিপাসু অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান ও অ্যাডভোকেট অজয় কর্মকার এর নেতৃত্বে মিরসরাই আইনজীবী কল্যাণ সমিতি সাজেক ট্যুরে বেরিয়ে পড়ে ৩৫ জনের এক বহর নিয়ে। ট্যুর অর্গানাইজিং এর দায়িত্বে পরীক্ষিত সেই ট্যুর অপারেটর অথেনটিক ট্যুরিজম নেটওয়ার্ক যার কর্ণধার সবার প্রিয় লায়ন আনোয়ারুল আজিম চৌধুরী। অথেনটিক ট্যুরিজম এর মাধ্যমে এর আগে এ সংগঠনটি দার্জিলিং, কাশ্মিরসহ দেশে-বিদেশে ডজনাধিক ট্যুর সম্পন্ন করেছিল। সুতরাং কোন ইভেন্ট মানেই ‘অথেনটিক’। এবারও তাই, নির্ভরতার নাম আজিম ভাই।
২৫ মার্চ সকাল সাড়ে ৫ টায় চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং চত্বও থেকে শান্তি পরিবহনের বাসটি ছাড়ার কথা থাকলেও দু’একজনের একটু দেরির কারণে অ্যাডভোকেট মান্নান ‘ওয়ান’ কল দেন ১৫/২০ মিনিট দেরিতে। গাড়িতেই ব্রেকফাস্ট। সাড়ে ৯টা নাগাদ আমরা খাগড়াছড়ি পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে নিই। আগেই বলেছি, নির্ভরযোগ্য ট্যুর অপারেটর অথেনটিক ট্যুরিজম দায়িত্বে থাকায় আমরা নিশ্চিন্ত ছিলাম- কোর্ট বিল্ডিং থেকে গাড়িতে উঠব আর কোর্ট বিল্ডিংয়েই নামিয়ে দেবে, সব দায়িত্ব তাদের। আমরা শুধু ‘এনজয়’।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন সাজেক রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে অবস্থিত। সাজেক ভ্যালির উত্তর-দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা ও লংগদু এবং পূর্ব-পশ্চিমে ভারতের মিজোরাম ও খাগড়াছড়ি। রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও খাগড়াছড়ির দীঘিনালা হয়ে সাজেক ভ্যালি পৌঁছাতে হয়।
খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের দূরত্ব ৬৫ কিলোমিটার। দীঘিনালা থেকে সাজেক যাওয়ার পথে আর্মি ক্যাম্প অথবা ১০নং বাঘাইহাট পুলিশ ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হয়। ১০টায় (আরেকটি ৩ টায়) আর্মি ক্যাম্প থেকে এক যোগে বের হবার নিয়ম, তাই সময় নষ্ট না করে চাঁদের গাড়িতে আসন নিয়ে নিলাম।
খাগড়াছড়ি থেকে দিঘীনালা হয়ে বাঘাইহাট, মাচালং পেরিয়ে সেই মায়াবী সাজেক। পথের দু’পাশের আদিবাসীদের বাড়িঘরের সামনে ছোট্ট শিশুদের অনবরত হাত নেড়ে স্বাগত জানানোকে সাড়া দিতে দেখা যায়। অনেকে সাথে নিয়ে যাওয়া চকলেট ও শুকনো খাবার ছুড়ে দিয়ে থাকেন ওইসব শিশুদের দিকে। মান্নান ভাই আর অজয় দা বিপুল পরিমাণ শিশুখাদ্য বিলিয়ে দারুণ আনন্দ পেয়েছেন।
যেতে যেতে চোখে পড়ে কিছুদূর পর পর পাহাড়িদের ঘরবাড়ি, তাদের প্রাত্যহিক সহজ-সরল জীবনযাত্রা। সুন্দর মসৃণ আঁকা বাঁকা রাস্তা, গগনস্পর্শী পাহাড়, মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে গভীর খাদ, বহু নীচ দিয়ে চলা সরু নদী। ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা কিন্তু চাকমা ড্রাইভারের চালনা দেখে মনে হল সে যেন ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে গাড়ি চালাচ্ছে। সারাক্ষণই দোয়া পড়েছি। সে এক ভয় ধরানো রোমাঞ্চকর অনুভূতি যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
দেড়টার দিকে আমরা বহুল প্রতীক্ষিত সাজেক পৌঁছলাম। দিগন্তবিস্তৃত পাহাড়শ্রেণি,পরিষ্কার নীলাকাশ, সবুজ বনানীর এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভব করার, স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার যা কোনো ভাবেই ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট উচুঁতে অবস্থিত সাজেক ভ্যালি থেকে রাঙামাটির অনেকটা অংশই দেখে যায়। অধিকাংশই কাঠের তৈরি হলেও সাজেকের রিসোর্টগুলো বেশ সুন্দর এবং পরিপাটী। তবে এখানে পানির নিদারুণ সংকট। তাই প্রত্যেক হোটেলেই পানি ব্যবহারে যতœবান হবার অনুরোধ লেখা থাকে। বিদ্যুতের সমস্যা থাকলেও এখন প্রায় সব রিসোর্টেই সোলার সিস্টেম থাকায় মোটামুটি চলে যায়। মোবাইল নেটওয়ার্ক সবার নাই, শুধুমাত্র রবি ও টেলিটক কাজ করে সেখানে।
দার্জিলিং রিসোর্টে চেক আউট করে রুমে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ সেরে খুব একটা রেস্ট করা গেল না। মান্নান ভাইয়ের, ঐতিহাসিক ‘ওয়ান’ শোনার সাথে সাথেই সবাই লবিতে চলে এলো। দেরি করা যাবে না। চাঁদের গাড়ি ৩টি অপেক্ষমান ছিল। চাঁদের গাড়িতে রুইলুই পাড়া থেকে ২০ মিনিটের পথ কংলাক পাড়া। কংলাকের পাহারচূড়ায় দাঁড়িয়ে পুরো সাজেক ভ্যালি চমৎকারভাবে দেখা যায়। ফটোসেশন ছাড়াও এখানকার ‘ব্যাম্বো টি’ অনেকেই উপভোগ করলেন। সাজেকের হেলিপ্যাড থেকেও আশেপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। সেনাবাহিনীর উন্নয়ন কর্মকান্ডে এ স্থানটি এখন আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট। সন্ধায় ফিরে এসে রুমে রেস্ট করা বাদ দিয়ে মান্নান ভাইয়ের নেতৃত্বে নারী-শিশুসহ অনেকেই সাজেক ভ্যালির সবচেয়ে প্রাচীন গ্রাম রুইলুই পাড়ায় হাঁটলেন। সাজেকের একমাত্র মসজিদটির অবস্থান রুইলুই পাড়ার শেষ প্রান্তে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে। ঐতিহ্যবাহী ব্যাম্বু চিকেন সহযোগে ডিনার সবাই সানন্দে গ্রহণ করলেন আর ধন্যবাদে সিক্ত করলেন ট্যুর আয়োজককে।
খুব ভোরেই উঠতে হবে। মান্নান ভাইয়ের সোজা কথা-এখানে ঘুমাতে আসিনি, ঘুরে দেখতে হবে। সাড়ে ৭টাতেই ‘ওয়ান’। গন্তব্য আমাদের রিসোর্টের পাশেই ঐতিহ্যবাহী লুসাই পাড়া। ৩০ টাকা প্রবেশ ফি দিয়ে ঢুকতে হয়। এখানে লুসাই জনগোষ্ঠীর ধারণ করা কিছু পোশাক ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র আছে। দোকানদারবিহীন একটি দোকান আছে এখানে। ফলমূলাদি বা অন্যকিছুও কিনতে পারবেন। দোলনায় দুলতে বেশ ভালোই লাগে। নবদম্পতির জন্য আদর্শ জায়গা। সাজেক এলাকার একমাত্র গাছ বাড়ি বা ‘ট্রি হাউস’ লুসাই গ্রামেই। গাছবাড়ি থেকে রাতে আকাশের তারা গোনার চেষ্টাও করা যায়। আরও কটেজ আছে। রাত্রিযাপনের পাশাপাশি খাওয়া-দাওয়া, বারবিকিউ, ঐতিহ্যবাহী লুসাইদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ রয়েছে আরও অনেক আয়োজন।
সদ্য বিবাহিত দম্পতি থেকে শুরু করে দলবেঁধে আনন্দ করতে যাওয়া সকলের জন্য দারুণ উপভোগ্য অপরুপ সৌর্ন্দয্যের মায়াবী ‘সাজেক ভ্যালি’ ভ্রমণ শেষে ব্রেকফাস্ট সেরে ১০ টার ট্রিপে ব্যাক টু খাগড়াছড়ি। পথে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিদর্শন বাড়তি আনন্দ দেয়।
সাজেকে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল হোটেলে। তবে খাগড়াছড়ি এসে নিজেদের তৈরি ঘরোয়া খাবার সবাই মনভরে খেলেন। এটিএন ক্যাটারিং এর ভর্তা, ডাল, হাঁসের মাংস, ফিরনিসহ নানা পদের খাবার খেতে গিয়ে মনে হল যেন নিজের ঘরেই খাচ্ছি। খাবার শেষ হতে না হতেই মান্নান ভাইয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়ান’। সেই চাঁদের গাড়িতেই আলু টিলা আর জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক ভ্রমণ, ঝুলন্ত ব্রিজ দর্শন-অসাধারণ। রাতে ডিনার শেষে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র‌্যাফেল ড্র।
সকালে ছিল ফ্রি টাইম। কিন্তু ভ্রমণ পাগল মান্নান-অজয় শপিং করা বা ক্লান্তি দুর করতে রুমে বসে থাকতে রাজি নন। তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্তে পানছড়িতে অবস্থিত মায়াবিনি লেক ও অরণ্য কুঠির যাবার জন্য দু’টি বড় আকারের চাঁদের গাড়ি ঠিক করে দিলেন আজিম ভাই। সাজেক ও খাগড়াছড়ি ভ্রমণের শতভাগ মজা লুটে নিয়ে বেলা দুইটায় আবারও ‘শান্তি’ বাসে করে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। তবে ঘওে ফেরার ট্রিপটা নির্বিঘœ হলনা।
হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনে রাস্তা বন্ধ থাকায় রাঙ্গামাটি হয়ে চট্টগ্রাম আসতে হয়েছে আমাদের, দু’ঘন্টা বেশি সময় লেগেছে। তাতে অবশ্য কারোরই মুখে একটুও বিরক্তি দেখা যায়নি। বরং মান্নান ভাই বাসের জানালা দিয়ে বিভিন্ন জায়গা নির্দেশ করে বারবার বলছিলেন, আমাদের প্যাকেজে কিন্তু রাঙ্গামাটি ছিল না, বোনাস হিসেবে তাও দেখালাম।