বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপকূলীয়বাসীর দুঃখ ঘুচাবে

8

আনোয়ারা ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অভাব ও দারিদ্র্যতার সাথে যুদ্ধ করে দুই উপজেলার ছয় ইউনিয়নের লাখো বাসিন্দাকে টিকে থাকতে হয়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আনোয়ারা-বাঁশখালীর উপকূলীয এলাকার মানুষ। জানা যায়, এ সময় শুধু বাঁশখালীতে ৪০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। যার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়ায় উপক‚লের মানুষ। তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সেই লক্ষে প্রকল্প গ্রহণ এবং শতকোটি টাকা ব্যয় করে বাস্তবায়নও করেছে, তবে বেড়িবাঁধ হয়েছে কিন্তু স্থায়ী হয়নি। সামান্য জোয়ার-ভাটায় বাঁধটিতে ফাটল ধরা দিলে এলাকার মানুষ সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। বাঁধটি নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। গত বছর সেপ্টেম্বরে বাঁধের ভাঙ্গন নিয়ে কয়েকটি জাতীয় সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, উপক‚লবাসীর জানমালের নিরাপত্তায় বাঁশখালী স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের (২০১৫-১৭) বাঁধটি জলোচ্ছ্বাস ছাড়াই ভাঙতে শুরু করেছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০২২ সালে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাঁধটি বুঝিয়ে দেয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো)। এরই মধ্যে খানখানাবাদ উপক‚লের কদমরসুল গ্রামে ১০ দিন ধরে জোয়ার-ভাটার স্রোতে বেড়িবাঁধটি ভাঙতে শুরু করায় এলাকাবাসী আতঙ্কে রয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করছে, বেড়িবাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি এবং নকশায় ত্রুটি থাকায় শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা স্থায়ী বেড়িবাঁধটি ভেঙে যাচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি ও স্বজন হারানো মানুষগুলো স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ হওয়ায় নানা স্বপ্ন দেখছিল। গ্রামে গ্রামে নতুন ঘরবাড়ি তোলা হয়েছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধটির খানখানাবাদ কদমরসুল গ্রামের অংশ ভাঙতে শুরু করায় উপক‚লজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ আতঙ্কের সাথে যোগ হয়েছে, সাঙ্গুনদীর মোহনার গতিপথ পরিবর্তন। জানা যায়, পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ‘বাঁশখালীর খানখানাবাদে নির্মাণ করা নতুন বেড়িবাঁধের পাশে বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা বালুচরের কারণে সাঙ্গু নদীর পানির গতিপথ পাল্টে বেড়িবাঁধে ঢেউ আছড়ে পড়ায় বাঁধ ভাঙছে। বাঁধ নিয়ে লোকোচুরি খেলার অবসান ঘটাতে চান নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পরই বাঁশখালীর উপক‚লীয় এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় পাউবির কর্মকর্তাদের একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের উপর জোর তাগিদ দেন। কয়েকদিন পর বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের সাথে বৈঠক করে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করেন। গতকাল বুধবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলার ছয় ইউনিয়নের অরক্ষিত উপকূল রক্ষায় ৯১৩ কোটি ৪০ লক্ষ টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। বুধবার পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পের মূল্যায়ন (পিইসি) কমিটির সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে প্রকল্পটি একনেকে উঠবে। আগামি তিন বছরের মধ্যেই ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলায় টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। দুই উপজেলার সমন্বয়ে প্রকল্পটির ডিপিপি প্রস্তুত করা হলেও অরক্ষিত বেশি অংশের কাজ হবে বাঁশখালী উপক‚লে। প্রতিবেদনে সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘আমি শপথ গ্রহণের পরপরই প্রকল্পটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যা যা করা প্রয়োজন সবই করবো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বাঁশখালী উপক‚লের মানুষ অনেক স্বস্তি পাবে’। জানা যায়, আনোয়ারা ও বাঁশখালীর চারটি পোল্ডার নিয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়/সাইক্লোন এবং পূর্ণিমা ও অমাবস্যায় সাগরের উঁচু জোয়ারের আঘাতে এই দুই উপজেলার উপকূল ব্যাপক ভাঙ্গনের সম্মুখীন হয়। অনেক স্থানে বাঁধ টপকে জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। এছাড়াও সাঙ্গু নদীতে জিওমরফোলজিক্যাল (ভূ-রুপতাত্ত্বিক) পরিবর্তনের ফলে কিছু কিছু স্থানে তীব্র নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপকূলে শিল্প কারখানা এবং গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসহ অন্যান্য অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধনের মাধ্যমে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে গুরুত্ব বেড়েছে। যে কারণে আনোয়ারা উপজেলায় ৫ দশমিক ১৭৫ কিলোমিটার ও বাঁশখালী উপজেলায় ৭ দশমিক ৫১০ স্থায়ী তীর প্রতিরক্ষা কাজ করতে ডিপিপিটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এরমধ্যে ১১ দশমিক ৫৮৫ কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ এবং ১ দশমিক ১০ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণ করা হবে। বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। তিনি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। জানা যায়, তাঁর উদ্যোগের খবরে উপকূলীয় এলাকার মানুষ আনন্দিত ও পুলকিত। তবে অতীতের মত যেন না হয়। স্থায়ী বেড়িবাঁধের নামে দুর্নীতি ও অনিয়ম থেকে সতর্ক থাকতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করি, এ বাঁধটি নির্মাণ হলে, প্রকল্প এলাকার মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে।