বহুবীজি পুরুষ

17

ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী

অবশেষে রুকুর সন্ধান পাওয়া গেল। শহরে এসেছিল এক দূর সম্পর্কের চাচার হাত ধরে। ঘরে তার ভাই-বোনের সংখ্যা দিয়ে একটা ফুটবল টিম তৈরি করা যেতো। অনেকটা সেকারণে, কোনো দিন ভাত জোটে কোনো দিন ভাতের মাড়। তাই রুকুর মা অনেক কাকুতি-মিনতি করে, তাকে চাচার হাতে তুলে দেয়-ছোট সন্তানটা অন্তত যেন দুই বেলা খেতে পারে।
সরকার চাচা, চাটগাঁ শহরের রিকশা চালক। তিনিও ১৭-১৮ বছর বয়সে এখানে এসেছিলেন প্রায় শূন্য হাতে। এখন শহর-বস্তিতে একটা বাড়ি করেছেন, তিনটা রিকশার মালিক হয়েছেন। মোটামুটি স্বচ্ছল অবস্থা।
চাচা শক্ত সোমত্থ রুকুকে নিজের রোজগারি পথেই নিয়োগ করলেন। সুবিধা এই-বাংলাদেশে রিকশা চালাতে কোনো ট্রেনিং-ট্রুনিং লাগে না। শুধু দুটো সবল পা থাকলেই হলো। পিচ্ রাস্তা যেন উজানের ¯্রােত। প্যাডেল ছুটতো ক্ষিপ্র ঘোড়ার গতিতে। রুকু সবচে বেশি ভড়কে যেতো গোল চত্বরে এসে। প্রথম প্রথম সিগন্যাল না বোঝার কারণে কয়েকবার ঘটেছে যাত্রীসমেত রিকশা ওল্টানোর ঘটনা। বড় দুর্ঘটনার হাত থেকেও অলৌকিক রেহাই পেয়েছে দু’একবার।
চাচার ছোট মেয়ে চঞ্চলতা। রুকুর সাথে তার ভাব-তরঙ্গ জমে ওঠে। সরকার ও তাঁর স্ত্রী একমত হয়ে সাদ্যের সবটুকু দিয়ে খোশ মেজাজে রুকুর সাথে মেয়ের বিয়ে দেন। সম্প্রদান হিসেবে সবচেয়ে দামী রিকশাটা রুকুকে পুরোপুরিভাবে লিখে দেন। কয়েক বছরের মাথায় দুই সন্তানের বাবা হয় রুকু। ইতোমধ্যে তার আচার-আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। শোনা যায়, খারাপ বন্ধুর পাল্লায় পড়ে বস্তির অদূরে রেল লাইনের ঝুপড়িতে কী-সব নেশা করে আসে। বাসায় এসে বউ পেটায়, ছেলে-মেয়েদের মারধর করে। বাসন-কোসন, আসবাবপত্র এদিক-ওদিক ছুঁড়ে মারে, ভাঙচুর করে। চাচা বহু চেষ্টা-চরিত্র ধর্ণা দিয়েও ুকুকে সঠিক পথে ফেরাতে পারলেন না। এরপর একদিন উধাও হয়ে যায় রুকু।
নাম বদলে রুকু ঠাঁই নেয় বান্দরবানে। এক কাঠমিস্ত্রীর দোকানে। নতুন নাম সুকু। পরিশ্রমী হওয়ার কারণে দোকানের মালিক তাকে পছন্দ করতে শুরু করে। কয়েক মাসের মাথায় এখানে নতুন করে সংসার পাতে সুকু। এমন শক্ত-সামর্থ্য জোয়ান পাত্র হাতছাড়া করতে রাজী নন মালিক। তাই তিনি নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে আপন ছোট ভাইয়ের কিশোরী কন্যার সাথে সুকুর শাদি সম্পন্ন করেন। দেখতে দেখতে শিউলির কোলজুড়ে আসে সন্তান। কিন্তু প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ার কারণে সুকুর ভীষণ রাগ। দুর্ভাগ্যক্রমে শিউলির সংসারে দ্বিতীয় সন্তান-ও মেয়ে। এবং এ অজুহাত ধরে একদিন স্ত্রী শিউলি বেগমের উপর শুরু অত্যাচার-নির্যাতন। এবং পুনর্বার নিরুদ্দেশ ।
এবার রুকু ওরফে সুকুর গমন আরও গহীন অরণ্যে। এক সময়ের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্তি¡ক গোষ্ঠীর একচ্ছত্র বনভ‚মিতে এখন হাজারো ভবঘুরের আস্তানা। নাইক্ষ্যংছড়ির দক্ষিণ প্রান্তে একটা ছোট বাজারে নতুন নাম টুকু ধারণ পূর্বক সুকু এখন গাছের কারবারি। বলিষ্ঠ দেহ, পেটানো শরীর। সহসা উঠতি মেয়ে ও তাদের অভিভাবকদের চোখ পড়ে তার উপর। সুতরাং এখানে আসার অল্প দিনের মাথায় তার জন্য চারদিক থেকে আসতে থাকে বিবাহের ঝাঁক ঝাঁক প্রস্তাব।
কিন্তু সন্তান স্ত্রী পরিবার ঘিরে কোনো মায়া টুকুর দিলে নেই। তার রক্তে কেবল নতুন বিয়ে নতুন মেয়ে পাওয়ার টগবগ মাদক নেশা। নেই জন্ম নিয়ন্ত্রণের পরোয়া। এ ঘরে ও ঘরে সন্তান জন্মদান কর্মযজ্ঞ সেরে সটকে যাবে টুকু। শুধু চঞ্চলতা, শিউলি, অনামিকা’রা বহন করে চলবে সন্তানভার। কোমরে কলসী নেওয়ার মতো। কখনোবা এরাও ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে লড়াইয়ে পিছুটান দেয়। আর সন্তানেরা অনাথ পথশিশু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এখানে-ওখানে। উপহার পায় শীর্ণ-দীর্ণ, রোগে-অপুষ্টিতে জর্জরিত শিশুজীবন। এরকম রুকু ওরফে সুকু ওরফে টুকু কি জনগণনায় আছে? বহুবীজি পুরুষ সংখ্যা!

লেখক- প্রফেসর ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।