বর্ষার বিস্তার জুনের প্রথমার্ধ্বে

13

তুষার দেব

এবার জুনের প্রথমার্ধেই দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু অর্থাৎ বর্ষাকালের বিস্তার ঘটবে বলে মনে করছেন দেশের আবহাওয়াবিদরা। প্রাপ্ত আবহাওয়া উপাত্ত, ঊর্ধ্বকাশের আবহাওয়া বিন্যাস, বায়ুমন্ডলের বিভিন্ন স্তরের বিশ্লেষিত আবহাওয়া মানচিত্র, জলবায়ু মডেল, ক্লাইমেট প্রেডিক্টিবিলিটি টুল (সিপিটি), বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুমোদিত গেøাবাল প্রডিউসিং সেন্টার বা জিপিসিএস থেকে প্রাপ্ত পূর্বাভাস, ‘এল নিনো ও না লিনার’ অবস্থা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে দেশের আবহাওয়াবিদরা বর্ষার আগমনের এই পূর্বাভাস দিয়েছেন।
আবহাওয়ার তিন মাস মেয়াদী পূর্বাভাসে এমন তথ্যের উল্লেখ করে বর্তমানে দায়িত্বরত অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আজিজুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, চলতি মে মাসে ভারী বৃষ্টিপাত ও নিম্নচাপের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কতিপয় স্থানে স্বল্প মেয়াদী আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে এবার জুন মাসের প্রথমার্ধেই সারাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষাকাল বিস্তার লাভ করতে পারে। এ মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিস্নাতের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দু’টি নিম্নচাপ সৃষ্টি পারে। পরবর্তী জুলাই মাসেও স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দু’টি নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ার আলামত বিদ্যমান রয়েছে।
এর আগে বিগত ১৯৯৭ সালের পর ২০১৯ সালের বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছিল দক্ষিণ চট্টগ্রাম। ভারী বর্ষণের পাশাপাশি উজান থেকে নদ-নদী দিয়ে নেমে আসা ঢলের পানিতে সড়ক-মহাসড়ক থেকে শুরু করে বাড়ি-ঘর ও মাঠ-ঘাট তলিয়ে যায়। মহাসড়কের ওপর দিয়ে কয়েক ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হয় বানের পানি। টানা ১০ দিনের ভারী বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, পটিয়া, আনোয়ারার পাশাপাশি উত্তরের ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী,বোয়ালখালী উপজেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ বাসিন্দাকে সপ্তাহকালেরও বেশি সময় ধরে পানিবন্দি অবস্থায় অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করতে হয়েছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, চট্টগ্রাম-বান্দরবান ও চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মহাসড়ক। সেসময় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু নদীর পানি কয়েকদিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। একইভাবে এবারও ভারী বর্ষণের পাশাপাশি উজানের পাহাড়ি ঢলের পানিতে দেশের অন্য অঞ্চলের পাশাপাশি চট্টগ্রামও বন্যার ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে আভাস দেয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, চার বছর আগে অর্থাৎ বিগত ২০১৯ সাল বা ১৪২৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখেই ‘শ্রাবণের উপস্থিতি’ আগাম বর্ষার একধরণের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। সেই বছর মধ্য বৈশাখ পর্যন্ত দেশে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, তা বিগত সাড়ে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে এবার কালবৈশাখী মৌসুমে প্রত্যাশিত স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়নি। মৌসুমজুড়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলই সবচেয়ে বেশি অনাবৃষ্টির কবলে পড়েছে। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে কয়েক দফায় দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। সার্বিকভাবে বিক্ষিপ্ত ঝড় ও শিলাবৃষ্টির চাইতে চলতি কালবৈশাখী মৌসেিম দাবদাহেই পুড়তে হয়েছে বেশিরভাগ এলাকার মানুষকে। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে, আষাঢ়-শ্রাবণকেই বর্ষাকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে, ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বর্ষার রেশ থেকে যায়। অর্থাৎ জুনের শেষ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্তই বর্ষা মৌসুম ধরা হয়।
আবহাওয়াবিদদের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, একটানা কয়েকবছর দেশে বর্ষাঋতুর দৈর্ঘ্য অনেকটা কমে এসেছিল। আর আগাম বন্যা ঠাঁই নিতে শুরু করেছিল ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু, ২০১৭ সালে বাঁক বদল ঘটিয়ে স্ব-মহিমায় আবির্ভূত হয় বর্ষাকাল। ওইবছর দেশে বন্যায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় অর্ধ কোটিরও বেশি বন্যাদুর্গত মানুষকে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়। হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে বন্যার পানিতে ফসল তলিয়ে যায়। এছাড়া, বন্যাকবলিত অন্তত ৩২টি জেলার বাড়িঘর ও ফসলাদি মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়। দেশের নদ-নদীর পানির ৯৩ শতাংশই আসে উজানের দেশগুলো অর্থাৎ নেপাল, ভারত এবং কিছুটা ভুটান থেকে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা এবং মেঘনা অববাহিকায় বৃষ্টিপাতের ওপরই বাংলাদেশে বন্যা হবে কিনা তা অনেকটাই নির্ভর করে। উজানের পাশাপাশি দেশে অতিবৃষ্টি হলে জুনের শেষ দিক থেকে ক্রমাগতভাবে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। আর নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে দেশের তিনটি নদী অববাহিকার ৩৪৩টি পানি সমতল পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রধান নদ-নদীর ৯০টি পয়েন্ট থেকে ৫৪টি পয়েন্টে পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করে বন্যার পূর্বাভাস দেয়া হয়। এবার হাওর অঞ্চলে উজানের পানি নেমে এনে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে।
প্রসঙ্গত, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংরক্ষিত তথ্যভান্ডারে উল্লেখ রয়েছে, দেশে ১৯৮৮ সালে প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার ১১২ সেন্টিমিটার এবং ১৯৯৮ সালে বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করেছিল। এর মধ্যে ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের ৬১ শতাংশ এবং ১৯৯৮ সালের বন্যায় ৬৮ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেলেও এরপর আর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি। এরপর ২০১৭ সালে হাওরে আগাম বন্যা ও উত্তরাঞ্চলে দুই দফা বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি ঘটে।