বরেণ্য চিকিৎসক ও সমাজসেবী ডা. নজরুল ইসলাম চৌধুরী

34

আবু ওবাইদা আরাফাত

এক এক করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছেন বাঁশখালীর সোনার সন্তানেরা। প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিদের তিরোধানে আমরা হয়ে পড়ছি অভিভাবকশূন্য। যাদের মেধা মনন ও অধ্যাবসায় আত্মকেন্দ্রিকতার সংকীর্ণতা জয় করে নিজ জনপদ ও মানুষের কল্যাণে উৎসর্গিত তাঁরা নিঃসন্দেহে মহানুভবী ও মহান ব্যক্তি। কিন্তু অবাক করা হলেও সত্য যে, প্রচার বিপ্লবের এই কোলাহল সময়ে অনেক মহান ব্যক্তিত্বই রয়ে যান পর্দার অন্তরালে, নীরবে নিভৃতে। তাদের বিগত বর্ণাঢ্য জীবনের ইতিহাসে পড়ে যায় স্মৃতির আস্তরণ৷ নতুন প্রজন্মের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা কিংবা সংশ্লিষ্টজনদের নির্মম উদাসীনতায় অনেকটা চাপা পড়ে যায় শত সহগ্র গৌরব গাঁথা। কেবল সেই ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদের মধ্য দিয়েই আমাদের চেতনা জাগ্রত হয়; প্রকাশের আলোতে আসে, আমরা জানতে পারি তাঁদের গৌরবদীপ্ত অতীতের কথা।
ঠিক এমন এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী বাঁশখালীর কৃতিসন্তান বরেণ্য চিকিৎসক ও সমাজসেবী ডা. নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম অবৈতনিক পরিচালক এবং বাঁশখালী উপকূলীয় ডিগ্রী কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।
তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ছাত্র সংসদের প্রাক্তন নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও ভি পি ছিলেন। প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নজরুল ইসলাম চৌধুরীর দেশপ্রেম, জীবনবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানবিকতা ও সমাজসেবায় উদ্ভাসিত মানসিকতা তাঁর জীবনকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।
প্রগতিশীল আন্দোলন ও সামাজিক বিপ্লবে তাঁর গতিশীল নেতৃত্ব এনে দেয় পরিবর্তনের রূপরেখা।
সমাজহিতৈষী ডা. নজরুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নের সাগরতীর ঘেঁষা রায়ছটা গ্রাম নিবাসী দারোগা আবদুস সামাদ চৌধুরী ও মেহেরুন্নেসা বেগমের সন্তান। তাঁর জন্ম পিতার কর্মস্থল বগুড়ায় ১৯৩৯ সনের ১০ জুন তারিখে। তাঁর পিতা ঢাকা কেরানীগঞ্জ থানায় বদলি হলে তিনি সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে ভর্তি হন। এরপর ১৯৫২ সালে সপরিবারে বাঁশখালীতে স্থানান্তর হলে তিনি বাণীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫৪ সালে বাণীগ্রাম সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে প্রথম ডিভিশন লাভ করেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রী লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বাঁশখালীর গুনাগরিতে ৩ বছর চেম্বার করেন। উল্লেখ্য, সে সময় বাঁশখালীতে এমবিবিএস পাস করা ডাক্তার প্র্যাক্টিস করতেন না। বাঁশখালীতে প্র্যাক্টিসের পর তিনি চলে যান লিবিয়ায়। সেখানে ১১ বছর তিনি চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন; এরপর ইংল্যান্ড হতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন।
তিনি ছিলেন একাধারে ছাত্রনেতা, তুখোড় বক্তা ও বিভিন্ন ইস্যুতে দাবি আদায়ে নেতৃত্বদানকারী আপোসহীন নেতা। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সদস্য, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জি এস ও ভি পি, তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি (নির্বাচিত), ছয়দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বাতিলকরণ আন্দোলন এবং ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলনের চট্টগ্রাম অঞ্চলের আহ্ববায়ক হিসেবে তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব নিশ্চিতভাবে ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে।
তিনি লিবিয়া বেনগাজীতে বাংলাদেশ সমিতির সভাপতি ও একজন রোটারিয়ান হিসেবে পৃথিবীর ৪০ টি দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বাঁশখালীতে সরকারি ভাবে ৪২,০০০ হাজার এবং বেসরকারি প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এই মানবিক বিপর্যয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে গঠিত হয় ‘বাঁশখালী সোসিও মেডিকেল
রিলিফ ফোরাম।’ এ সংগঠনের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত উপকূলে ব্যাপক চিকিৎসা ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। এই কার্যক্রমে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন ডা. নজরুল ইসলাম চৌধুরী। এ মানবিক উদ্যোগের অন্তপ্রাণ হিসেবে কাজ করেন বাঁশখালীর অনেক কৃতিসন্তান। তাঁদের মধ্যে ডা. তড়িৎ কান্তি চৌধুরী, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেজবাহুল হক, ডা. রশিদ আহমদ, ইউএসটিসির ভূতপূর্ব উপাচার্য প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া, প্রফেসর ডা. জমির উদ্দিন চৌধুরী, লেঃ কর্নেল অবঃ (ডা.) কামাল উদ্দিন আহমেদ, প্যাথলজিস্ট ডা. জাফরুল হক চৌধুরী, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. এম এ মান্নান (সরল), মুক্তিযোদ্ধা ডা. ইউসুফ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সুভাষ ধর, প্রফেসর ডা. আজিম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
ডা. নজরুল ইসলাম চৌধুরী রচিত “ঋধপব ঃড় ঋধপব – ইধহমষধফবংয” গ্রন্থটি একটি কালজয়ী দলিল। এ বই সম্পর্কে প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়ুয়া বলেন- ‘দেশ ভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, সরকার পরিবর্তন, সামরিক ও বেসামরিক সরকার, কম্যুনিজম, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ধর্ম ও ধর্ম নিরপেক্ষতা সম্পর্কিত তাঁর গ্রন্থটি পেশাজীবী ও নির্মোহ দৃষ্টিতে প্রণীত।’
এ গ্রন্থের প্রাক্-কথনে লেখকের বচন প্রণিধানযোগ্য-

“ The idea of writing this book came into my mind when Sk. Mujibur Rahman the founder of Bangladesh was killed on 15 th August 1975 along with 14 of his family members in a brutal coup-de-etat. I was at that time working abroad. “
বইটির ভূমিকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রাক্তন উপাচার্য, বাঁশখালীর কৃতিসন্তান ইতিহাসবেত্তা ড. আবদুল করিমের অভিব্যক্তি নিম্নরূপ-
The writer being a Medical Practioner, his subject being far different from history, politics or any branch of social or pre-conceived notion. His analysis is unbiased, though he has got his own political ideology.
…. this book is readable, it is thought-provoking and challenging.

বাঁশখালীদরদী, সমাজহিতৈষী ও বুদ্ধিজীবী এই ক্ষণজন্মা গুণীজন গত ২৮ এপ্রিল ২০২১ ইং সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় ৮২ বছর বয়সে চট্টগ্রাম শহরের লালখানবাজারস্থ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজেউন।
২৯ এপ্রিল ফজরের নামাজের পর চট্টগ্রাম লালখান বাজারে প্রথম জানাজা ও জোহরের পর বাঁশখালী রায়ছটা আবদুস ছামাদ চৌধুরী দারোগা বাড়ির মসজিদ সংলগ্ন মাঠে দ্বিতীয় জানাজার পর তিনি নিজগ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত হন।
তাঁর মৃত্যুতে বাঁশখালী সমিতি চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ গভীর শোক ও মাগফেরাত কামনা করেন।

লেখক : প্রাবন্ধিক