বরকতময় লাইলাতুল বরাত

3

সৈয়দ আল্লামা ইমাম হায়াত

ঈমানের বরাত-জীবনের বরাত-দুনিয়ার বরাত-কবরের বরাত-হাশরের বরাত-আখেরাতের বরাত-শান্তির বরাত- সৌভাগ্যের বরাত-মুক্তির বরাত-দোজাহানের সব সৌন্দর্যের বরাত-আল্লাহকে পাওয়ার বরাত-প্রাণাধিক প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম অনেক কিছু নিয়ে মানুষের জীবন। অনেক বিষয়ের সাথে সংযুক্ত এ জীবনের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা, সুপরিণতি কিংবা কুপরিণতি। কিছু স্থায়ী ও মৌলিক বিষয় যা অপরিহার্য এবং জীবনের চুড়ান্ত পরিণতি নির্ণয় করে আর কিছু অস্থায়ী বিষয় যা প্রয়োজনীয় তবে অস্থায়ীভাবে সুখ বা দুঃখ বা এ দুয়ের মিশ্রিত অবস্থা তৈরি করে। আর তাই ভাগ্যের অবস্থা ও স্বরূপ আছে। স্থায়ী বা চূড়ান্ত সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য, অস্থায়ী বা চলমান সুখ-দুঃখ।
জীবনসত্য বুঝতে পারা, সত্যের উৎসের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সত্যের আলোকে নিজেকে আলোকিত করতে পারা, জীবনের উদ্দেশ্য ও মর্ম উপলব্ধি করতে পারা, জীবন তথা সময়কে অর্থপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারা, জীবনের যথার্থ দিশারী খুঁজে পাওয়া ও যথার্থ জীবন সাথী লাভ করতে পারা, জীবনের দায়িত্ব-কর্তব্য বোঝার লক্ষ্যে উপনিত হওয়ার জন্য জ্ঞান-যোগ্যতা ও গুণাবলী অর্জন করতে পারা ও এর পরিপন্থী অবস্থা থেকে মুক্ত হতে পারা ইত্যাদি স্থায়ী, মৌলিক ও অপরিহার্য বিষয়গুলো হওয়া বা না হওয়া জীবনের আসল ভাগ্য বা চূড়ান্ত পরিচিতি ও পরিণতি নির্ণয় করে।
আবার ভালভাবে বেঁচে থাকার জন্য জীবনের উপকরণসমূহ লাভ করা, দয়াময় আল্লাহতাআলা কর্তৃক তাঁর প্রিয়তম হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম প্রদত্ত অধিকারসমূহ লাভ করা; জীবনের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গতিশীলতার সুরক্ষা পাওয়া এবং জীবনের করণীয়গুলো সম্পাদনের সামর্থ্য ও সুযোগ অর্জন করতে পারা ইত্যাদি বিষয়গুলোও জীবনের বিকাশ, সুখ ও সমৃদ্ধির জন্য একান্ত অপরিহার্য। মূলত দোজাহানের সকল ভাগ্যের সূত্র ও উপকরণ একমাত্র দয়াময় আল্লাহতাআলার পক্ষ থেকে তা দান কিংবা শাস্তি যাই হোক। কিন্তু তা কোনমতেই খেয়ালীপনা বা নিয়মনীতিবিহীন নয়। এর রয়েছে সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় ন্যায় ভিত্তিক কারণ ও নিয়মনীতি, সুবিচারভিত্তিক পদ্ধতি-প্রক্রিয়া এবং অলঙ্ঘনীয় মাধ্যম। সব কিছু সৃষ্ট হওয়া এবং এরপর যে কোন দান, নেয়ামত তথা সকল রহমত নাজিল হওয়ার, বিতরণ হওয়ার, প্রাপ্ত হওয়ার একটা মূল অছিলা বা মধ্যস্থ আছে যাকে রাসুলে হাকিকী বলা হয় এবং এই রাসুলে হাকিকীই আমাদের প্রাণাধিক প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম।
সকল রহমত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে হওয়ায় এবং সকল দান ও নেয়ামতের কেন্দ্র হওয়ায় কোরআন পাকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামকে বলা হয়েছে রাহমাতাল্লিল আলামিন বা সর্ব জগতের সবার জন্য সবকিছুর জন্য রহমত। এ মূল মাধ্যমের অছিলায় জীবন অস্তিত্ব লাভ, গঠন ও বিকাশ হওয়ার, সমৃদ্ধ ও সফল হওয়ার, দুর্ভোগ ও দুর্ভাগ্য থেকে বাঁচার বিষয়গুলো বিভিন্নভাবে দেয়া আছে এবং দেয়া হচ্ছে অবিরত। মানুষ যাতে জীবনের মর্ম ও সত্য উপলদ্ধি করে মিথ্যা, আঁধার ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে সৎ গুণাবলী বিকশিত করে সঠিক লক্ষ্যে চলতে পারে, আদর্শ ও সভ্য সমাজ গঠন করে অধিকার ও মর্যাদা সহকারে বাঁচতে ও বিকশিত হতে পারে এবং শোষণ-নিপীড়ন-পাশবিকতা-কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকতে পারে সে জন্য দয়াময় আল্লাহতাআলার নবীগণ এবং সবশেষে সকল নবীর মূলনবী বা নাবিয়ীল উম্মী আমাদের প্রাণাধিক প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম মানুষকে দোজাহানে সৌভাগ্যের সুস্থ সঠিক জীবন ব্যবস্থার বাস্তব পথ দান করেছেন। দয়াময় আল্লাহতাআলা ও তাঁর প্রিয়তম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম, মহামহিম প্রাণপ্রিয় আহলে বায়েত, মহামান্য খোলাফায়ে রাশেদিন, সত্যের ইমামবৃন্দ ও মহান জামিয়ে আওলিয়া কেরামের সাথে শহীদানের সাথে বেঈমানি বিশ্বাসঘাতকতা করে মিথ্যা ও জুলুমের পক্ষে নির্লজ্জ ওকালতি করে সামান্য স্বার্থের বিনিময়ে নিজেদের বিকিয়ে দেয় অপশক্তির কাছে। সত্যের ছদ্মনামে মানুষকে মিথ্যার দিকে ঠেলে দেয়; বিকৃত হয় দ্বীন, বিপন্ন হয় সমাজ।
দয়াময় আল্লাহতাআলা দুনিয়ায় মানুষকে ভালমন্দ বুঝার, হওয়ার ও করার জ্ঞান-সুযোগ-শক্তি ও স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং প্রতিফলও জানিয়েছেন। অনেকে জীবন ও দুনিয়ার ভালমন্দ উত্থান পতন সবকিছু সরাসরি আল্লাহতাআলার নামে বরাতের উপর চালিয়ে দিতে চায়, যা সত্য নয়। বিশ্ব প্রকৃতি ও সৃষ্টির সবকিছু আল্লাহতাআলার নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়ম ও বিধানের ভিত্তিতে চলে, সরাসরি হুকুমে নয়, প্রাকৃতিক নিয়ম ও বিধানের মধ্যেই হুকুম দেয়া আছে, বস্তু ও প্রকৃতি দয়াময় আল্লাহতাআলা সৃষ্টি করেছেন এবং এর মধ্যে তাঁর বিধান, জ্ঞান, আদেশ, পদ্ধতি, গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য দিয়ে দিয়েছেন যার ব্যতিক্রম হয় না। অনু পরমাণু জীবকোষ থেকে উত্থান পতন জীবন মৃত্যু পুনরুত্থান আখেরাত সবকিছুই সে বিধান মোতাবেক চলছে এবং চলবে। দয়াময় আল্লাহতাআলা আজাবদাতা গজবদাতা নন বরং তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের রহমতে আজাব গজব থেকে উদ্ধারকারী।
আল্লাহতাআলা সর্বজ্ঞান ও সর্বশক্তির মালিক এবং তিনি যে কোন অবস্থার পরিবর্তন করতে পারেন, যা ইচ্ছে দিতে পারেন এবং করতেও পারেন। যেকোনো বিপদ দূর করতে পারেন কিংবা পরীক্ষা বা শাস্তিস্বরূপ দিতেও পারেন। আর সে জন্য আমাদের তাঁর প্রিয়তম হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম, তাঁর রহমতের কেন্দ্র রাহমাতাল্লিল আলামিনের অছিলা নিয়ে চাইতে হবে তাঁর কাছে এবং পাওয়ার জন্য অবশ্যই চলতে হবে তাঁরই অনুগৃহীত ও তাঁর প্রিয়তম হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মনোনীত মহামহিম প্রাণপ্রিয় পবিত্র আহলে বায়েত, মহামান্য খোলাফায়ে রাশেদিন, সত্যের ইমামবৃন্দ, মহান আওলিয়ায়ে কেরাম ও মুমিনদের প্রদর্শিত পন্থার অনুসরণে, যুগের সঠিক দিক নির্দেশনায়। বরাতের উপলক্ষ সাধারণ বোধগম্যতার ঊর্ধ্বে এক তাৎপর্য্যময় বিষয়, কোরআনুল করীম ও হাদিস শরীফে বরকতময় রহমতময় এবং আদেশ নির্ধারণী হিসেবে যার স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে (ফিহা ইউফরাকু কুল্লু আমরিন হাকীম, সুরা ঃ দোখান আয়াত ঃ ৪), যার পুর্ণাঙ্গ ও প্রকৃত হাকিকত কেবল দয়াময় আল্লাহতাআলা ও তাঁর মহান প্রিয়তম হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম এবং তাঁদের মনোনীত বিশিষ্টজনদের যাঁদের তাঁরা জানিয়েছেন তাঁরাই জানেন।
শবে বরাত সংক্রান্ত সরাসরি সুরা সুরা দোখান শরীফের শুরুতে আল্লাহতাআলা হামীম নাম মোবারকের মাধ্যমে প্রথমে তাঁর সকল রহমতের কেন্দ্র তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্মরণ ও অতঃপর কোরআনুল করীমের স্মরণ করেছেন। এরপর চতুর্থ আয়াত শরীফে আমরিন হাকীম বা আদেশ নাজিল ও ষষ্ঠ আয়াত শরীফে রাহমাতাম মির রাব্বিকা অর্থাৎ বিশেষ রহমত নাজিলের উল্লেখ করেছেন। হাদিস শরীফের সমস্ত কিতাবে শবে বরাতের আরো একটি মহান বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে- মাগফিরাত বা আল্লাহতাআলার অশেষ ক্ষমা, যার পূর্বশর্ত ঈমান। অতএব কোরআনুল করীমের ভিত্তিতে প্রমাণিত হলো, সকল বরাতের উৎস আল্লাহতাআলার হাবীব রাহমাতাল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হয়ে যাওয়া। দোজাহানের সকল বরাতের পথ কোরআনুল করীমের নির্দেশিত পথ ও প্রক্রিয়া তথা সত্য-জ্ঞান-ন্যায়-নিরাপত্তা-রিজিক-সুবিচার-অধিকার মানবতার জীবনব্যবস্থা খেলাফতে ইনসানিয়াত। শবে বরাত অস্বীকার কোরআনুল করীম অস্বীকার। স্বয়ং মহান প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম এ রজনীতে জান্নাতুল বাকী শরীফে (সৌদী গোত্রবাদী ওহাবীবাদী এ স্বৈর সরকার কর্তৃক ধ্বংসকৃত) মহান মকবুল সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু আনহুমের পবিত্র মাজার শরীফসমূহ জিয়ারত করেছেন এবং এ রজনীতে বিশেষ দোয়া ও এবাদতের তাগিদ দিয়েছেন- হাদিস শরীফ। বরাতের পবিত্র রজনীতে মানুষের জন্য তার অবস্থা ও কাজের পার্থিব প্রতিফলন নির্ধারিত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে মাগফেরাত ও তওবার সুযোগ দেওয়া হয়। বিশেষ রহমতের সুযোগ দেওয়া হয় এবং বিশেষভাবে মোনাজাত কবুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
লেখক: বিশ্ব সুন্নী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্ব ইনসানিয়াত বিপ্লবের প্রবর্তক