বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে চন্দনাইশের বিস্তির্ণ এলাকা

190

টানা ১০ দিনের অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চন্দনাইশের বিস্তির্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কসহ অভ্যন্তরিন সড়কগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। গত ১৫ জুলাই বন্যা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় পুরো চন্দনাইশ উপজেলা এখন বন্যার পানিতে ভাসছে। উপজেলার পানিবন্দী মানুষ মানবেতর জীবন-যাপন করছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তাও পাচ্ছে না বানবাসী মানুষ। উপজেলার দক্ষিণ হাশিমপুর বড়পাড়া (কসাইপাড়া), পাঠানিপুল, দেওয়ানহাট, এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উপর দিয়ে দুই থেকে আড়াই ফুট উচ্চতায় বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে গত ১৩ জুলাই সকাল থেকে গত ১৫ জুলাই সকাল পর্যন্ত মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। ১০ দিন ধরে পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর দিন যাপন করছে উপজেলার দেড় লক্ষাধিক মানুষ। গত ১৩, ১৪ জুলাই শঙ্খনদীর পানি উপচে পড়ে লোকালয়ে প্রবেশ করলে

উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। গত ১৩ জুলাই দুপুর থেকে বন্যার পানি বাড়তে থাকে এবং স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বন্যায় রূপ নিয়েছে। অনেকেই নিজস্ব বাড়ি-ঘর ছেড়ে নৌকায় করে আত্মীয়-স্বজন কিংবা সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত ১৪ জুলাই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উপর দিয়ে তীব্রগতিতে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেনি। চন্দনাইশ থানা পুলিশ ও দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশের সহায়তায় চন্দনাইশের কসাইপাড়া অংশে ঝুঁকিপ‚র্ণভাবে যানবাহন চলাচল করলেও তীব্র যানজট লেগে থাকে মহাসড়কে। গত ১৫ জুলাই মহাসড়কে পানি কমে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হলেও যানজট রয়েছে। এতে সড়কের উভয় পাশে কমপক্ষে ২ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান বাস চালক রফিকুল ইসলাম। এভাবে শত শত যানবাহন মহাসড়কে আটকে আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মহাসড়কে তীব্র যানজট হওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের পায়ে হেঁটেও গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা যায়। বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে চলেছে। দেড় লাখের অধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। উপজেলার বানবাসী একটি পরিবারেও চুলায় আগুন জ্বালানো সম্ভব হয়নি। অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে হাজার হাজার পরিবারের সদস্যরা। এদিকে যানবাহন চলাচল করতে না পারার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু পিকআপ চালক যাত্রীদের জিম্মি করে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে তিনগুণ বেশি ভাড়া আদায় করে নিচ্ছে। খরস্রোতা শঙ্খনদীর পানি উপচে পড়ে তীব্রগতিতে চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পৌরসভার চাগাচর বারুদখানা, রায়জোয়ারা, দিয়াকুল, লালুটিয়া, বৈলতলী, বরমা, দোহাজারী, কিল্লা পাড়া, জামিজুরী, পূর্ব দোহাজারী, হাশিমপুর, চন্দনাইশ পৌরসভা, বরকল, বরমা, ধোপাছড়ির, ছামাছড়ি, শামুকছড়ি, ছিড়িংঘাটাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিতে ডুবে থাকা বর্ষাকালীন সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে কৃষকদের চরম ক্ষতি সাধিত হয়েছে। যে সব কৃষক ইতিমধ্যে আউশ ধানের বীজতলা তৈরী করেছে তাদের বীজতলাও নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে দূর্দশায় পড়েছে আউশ চাষিরা। ধোপাছড়ি ইউনিয়ন দিয়ে গতকাল সোমবার পর্যন্ত তীব্র গতিতে পাহাড়ি ঢলের পানি লোকালয়ে প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চন্দনাইশে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে প্রতিদিন উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্ল­াবিত হচ্ছে। চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আ ন ম বদরুদ্দোজা জানান, অবিরাম বর্ষণের ফলে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চন্দনাইশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার পানিবন্দী অসহায়দের মাঝে সরকারি ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়াও স্ব-স্ব ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সে সাথে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। অপরদিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার জানান, এখন রকম ক্ষয়-ক্ষতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। পানি নেমে গেলে মাঠ পর্যায়ে প্রতিবেদন দেয়া সাপেক্ষে ক্ষয়-ক্ষতি নির্ধারণ করা সম্ভব। ২ হাজার ১’শ ২৫ হেক্টর টার্গেটের মধ্যে ১ হাজার হেক্টর ইতিমধ্যে ভেসে উঠেছে। আজ এবং কাল বৃষ্টি না হলে আরো ৫’শ হেক্টর ভেসে উঠবে। তাছাড়া আউশ ধান পানিতে সাধারনত নষ্ট হয় না। যে সকল সবজি হারব্রেট করা রয়েছে তা ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা নেই বলে তিনি জানান। অপরদিকে মৎস্য কর্মকর্তা কামাল উদ্দীন চৌধুরী বলেছেন, চন্দনাইশে ছোট বড় ৩ হাজারের অধিক মৎস্য প্রকল্প রয়েছে। এসব মৎস্য প্রকল্প ৫’শ হেক্টর জলাশয়ে ৪ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন হয়েছে বলে জানিয়েছেন। পল্লী বিদ্যুৎতের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, চন্দনাইশ-সাতকানিয়া এলাকায় ৯’শ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন রয়েছে। ইতোমধ্যে এ সকল লাইনের বেশ কিছু এলাকা পানিতে নির্মজিত রয়েছে। বন্যার কারণে ৪টি খুঁটি, ১১টি ট্রান্সফর্মার, ৩টি ক্লোফার্ম নষ্ট হলেও বিদ্যুৎ লাইন চালু রাখার জন্য ১১ জন লাইনম্যান, প্রকৌশলী, এজিএম, জিএম সার্বক্ষনিক কাজ করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা ডা. বখতিয়ার আলম জানান, বন্যার সময় একজন দু’বছরে শিশু পানিতে পড়লে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
তাছাড়া গত ১৪ জুলাই দু’জনকে সাপে কাটলে তাদেরকেও প্রাথমিক চিকিৎসার পর চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। সূত্রে জানা যায়, চন্দনাইশে ছোট বড় ২৫ টি গরুর খামার, ব্রয়লার, লেয়ার ও দেশীয় মিলে ৯৬ টি পল্টি ফার্ম রয়েছে। এ সকল খামার ও ফার্ম থেকে মুরগী ও গরু সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তেমন কোন ক্ষয়-ক্ষতি হয়নি। তবে চারণভূমি পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় গরুর খাদ্য সমস্যা হচ্ছে। সব মিলিয়ে চন্দনাইশে ৮০ শতাংশ মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েছে। এলাকার সর্বস্থরের মানুষের দাবী চন্দনাইশকে বন্যা দূর্গত এলাকা ঘোষণা করে সরকারি ও বেসরকারিভাবে যথাযথ ত্রান প্রেরণের আহবান জানান।