বদিউর রহমান মাস্টার পটিয়ায় আওয়ামী রাজনীতির শালকাঠ

62

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

পটিয়া থানা আওয়ামী লীগের মূলধারার রাজনীতিতে বদিউর রহমান মাস্টার ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী একজন নেতা। তিনি রাজনীতি করতে করতে পেশা জীবনে প্রবেশ করেন। তাঁর সমসাময়িক ছাত্রনেতাদের সঙ্গে এখানেই তাঁর তফাৎ। তিনি ছিলেন ছাত্রদের রাজনীতির শিক্ষক, এবার হলেন লেখাপড়ার শিক্ষক। ছাত্রনেতা বদি ভাই হয়ে গেলেন বদিউর রহমান মাস্টার। রাজনীতি ছেড়ে শিক্ষকতায় নয়, রাজনীতি রইলো তাঁর অন্তরে। রাজনীতিকে লালন করতেন হৃদয়ের গভীরে। মাস্টারি করলেও স্কুল ছুটির পর আবার রাজনীতির অঙ্গনে চলে আসতেন। থানা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে হাজির হতে কখনো ভুল হতো না তাঁর।
ষাটে দশকের পটিয়ায় আওয়ামী লীগের অবস্থান কেমন ছিলো আজকের দিনে বসে তা’ কল্পনাও করা যাবে না। বামপন্থী রাজনীতি-প্রভাবিত পটিয়ায় কখনো আওয়ামী লীগ প্রধান রাজনৈতিক ধারা হয়ে উঠতে পারেনি। তখন থানা আওয়ামী লীগ বলতে সভাপতি অ্যাডভোকেট মোজাফিজুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক হামিদুর রহমান। তাদের আসল শক্তি ছিলো ছাত্রলীগ। ষাট সালে পটিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পটিয়ায় ছাত্র রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছিলো।
পটিয়ার রাজনীতি রণাঙ্গনে বদিউর রহমান মাস্টার ছিলেন এক লড়াকু সৈনিক। রাজনীতি কখনো কখনো উত্তপ্ত হয়ে উঠতো। জেল, জুলুম, হুলিয়া, গ্রেফতার, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে আসতো চোখের স্বচ্ছ দৃষ্টি। গুলি বোমাও ফুটলো স্বাধীনতার পর। স্বাধীনতার পূর্বে ছিলো লোহার রড, ছুরি, ইট-পাটকেল। কিন্ত বদি মাস্টার কখনো পশ্চাদপসরণ করেননি, পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেননি। এমনই একরোখা, জেদী মানুষ ছিলেন সংগ্রামী নেতা বদি ভাই। পটিয়ায় এক কথায় যাঁকে ছাত্রলীগের জন্মদাতা বললে সত্যের অপলাপ হয় না, তিনি হচ্ছেন, ফতেনগর নিবাসী চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম খালেদ। তাঁর চাচা অ্যাডভোকেট বদিউল আলম ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। সিরাজ সাহেবের ইয়া বড় পাকানো গোঁফ ছিলো, সেজন্য তিনি ‘মোচ সিরাজ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম খালেদ বিয়ে করেছিলেন মোহাম্মদপুর কাজী বাড়ি থেকে আমার খালা ‘পানু মামা’র বোনকে। পানু মামার পুরো নাম আমার মনে নেই, তবে ‘সোবহানী’ শব্দটা মনে আছে, সেটা তাঁর নামের শেষাংশ। তিনি সম্ভবত বাংলাদেশ বিমানের সর্বোচ্চ পদ থেকে রিটায়ার করেছেন। পানু মামার এক ভাই এস আলম গ্রæপের এমডি মাসুদ সাহেবের এক বোনকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় তিনি অকালে পরপাড়ে পাড়ি দিয়েছেন। সিরাজ সাহেব আরো একদিক থেকে আমার আত্মীয় ছিলেন। সেটা হলো তাঁর চাচা অ্যাডভোকেট বদিউল আলম সাহেব আমার মামা ড. কে এম ফরিদ উদ্দিনের ভায়রা। তাঁরা উভয়ে খন্দকিয়ার পরলোকগত জজ সাহেব গোলামুর রহমান চৌধুরী সাহেবের জামাতা। যাই হোক, সেসব কথা নয়। মূল কথা হলো চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম খালেদ বৃহত্তর পটিয়ায় ছাত্রলীগের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। আমি ৬৫-৬৬ সাল থেকে রাজনীতির অলি গলি রাজপথে ঘোরাঘুরি করতাম। তখন দেখেছি সহজ সরল মানুষটা ছাত্রলীগের জন্য কী অমানুষিক পরিশ্রমটাই না করেছেন। সব সময় ঘর্মাক্ত কলেবর হন্তদন্ত হয়ে হাঁপিয়ে ওঠে চলা তাঁর অভ্যাস। তখনো আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের রাজনীতির জন্য মাঠ তৈরি হয়নি। কিন্তু সেদিকে ভ্রæক্ষেপ নেই সিরাজ সাহেবের, তিনি একাই লড়ে যাচ্ছেন।
সবুরে মেওয়া ফলে। অচিরে ধৈর্য্যরে পরীক্ষায় জয়ী হন সিরাজ সাহেব। দেখলেন বাঙালির কথা বলার মানুষ শুধু একা তিনি নন, তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে পা ফেলতে এগিয়ে এসেছেন ভাটিখাইনের কবির আহমদ, পটিয়ার শামসুদ্দিন আহমদ, আহমদ নূর, বদিউর রহমান, ছৈয়দ আহমদ বি কম, আবু সিদ্দিক চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, আফজল প্রমুখ। শামসুদ্দিন আহমদ পরর্তীকালে ছাত্রলীগের প্রধান সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। যাঁরা তাঁকে পটিয়ায় ছাত্রলীগের প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কঠোর পরিশ্রম করেন, সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেন, এমনকি জীবনের ওপর ঝুঁকি নেন, তাঁদের মধ্যে বদিউর রহমান অন্যতম। বদিউর রহমান নিজেও ছাত্র রাজনীতি একজন বলিষ্ঠ প্রবক্তা, দক্ষ সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। যাঁরা তাঁকে পটিয়ায় ছাত্রলীগের প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কঠোর পরিশ্রম করেন। সীমাহীন ত্যাস স্বীকার করেন, এমনি জীবনের ওপর ঝুঁকি নেন, তাঁদের মধ্যে বদিউর রহমান অন্যতম। বদিউর রহমান নিজেও একজন ছাত্র রাজনীতিকর একজন বলিষ্ঠ প্রবক্তা, দক্ষ সংগঠক হিসেবে পটিয়ার ছাত্র-জনতার মাঝে পরিচিতি লাভ করেন। গোড়ার দিকে তিনি বৃহত্তর পটিয়া ছাত্রলীগের আহŸায়ক ছিলেন। তখন পটিয়ার স্কুল কলেজে ছাত্রলীগের শাখা গড়ে তোলা ও রাজনীতির বিস্তার ঘটানোর জন্য সিনিয়র চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম খালেদ, বন্ধু শামসুদ্দিন সহ অনেক পরিশ্রম করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি আওয়ামী যুবলীগে যোগ দেন। তিনি ও ও কমান্ডার আহমদ নবী বৃহত্তর পটিয়ায় আওয়ামী যুবলীগের যুগ্ম আহŸায়ক নির্বাচিত হন। এই কমিটিতে কোন আহবায়ক ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মরহুম বদিউর রহমান মাস্টার মধ্যম পটিয়ার ডেপুটি কমন্ডার ছিলেন।
১৯৭৩ সালে বৃহত্তর পটিয়া থানা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠিত হলে জনাব বদিউর রহমান মাস্টার সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ও হামিদুর রহমান। পরবর্তীকালে জনাব বদিউর রহমান মাস্টার পর্যায়ক্রমে পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিশু কিশোর সংগঠন শাপলা কুড়ির আসরের প্রধান উপদেষ্টা, বঙ্গবন্ধু পরিষদের উপদেষ্টা, রিজবি বাংলাদেশ এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। রাজনীতি করার কারণে জনাব বদিউর রহমান মাস্টার কারা নির্যাতন ভোগ করেন। ড. কামাল হোসেনের নির্বাচনে তিনি কারাবন্দি ছিলেন।
বদিউর রহমান মাস্টার ১৯৬৫ সালে আবদুস সোবহান রাহাত আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৬৮ সালে পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচ.এস.সি এবং ১৯৭১ সালে পটিয়া সরকারি কলেজ বিএস পাস করেন। এরপর তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন। তিনি দক্ষিণ ভূষি ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যায়লয় সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
মরহুম বদিউর রহমান মাস্টার ১৯৪৯ সালের ৬ ডিসেম্বর পটিয়া উপজেলা সদরে (বর্তমানে পটিয়া পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম মোঃ নজু মিয়া, মাতা মরহুমা ছমুদা খাতুন। পিতামহ তুপান আলী। ১৯৭৩ সালে বদিউর রহমান মাস্টার উজিরপুরের প্রখ্যাত সমাজসেবী নুরুল ইসলাম চৌধুরীর কন্যা খাইরুন নেছার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন। তাঁর ৫ ছেলেমেয়ে। বদিউর রহমান মাস্টার ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পরলোকগমন করেন।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক