বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ

18

মো. আবদুর রহিম

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জন্ম বীরের দেশ বাংলাদেশের। দেশের জন্ম রক্ত আর ত্যাগে। দেশের স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রক্তমূল্যে অর্জিত দেশটি ছিল ধ্বংসস্তুপে ভরা। শূন্য থেকে যাত্রা এদেশের। মুদ্রা নেই, সম্পদ নেই, কলকারখানা নেই, রাস্তঘাট নেই, পুল কালভার্ট নেই, বিদ্যুৎ নেই, কিছুই নেই। ছিল সাড়ে সাত কোটি নিঃস্ব কংকালসার মানুষ। অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা ধ্বংসপ্রাপ্ত। ১ কোটি গৃহহারা শরণার্থী, ২ লক্ষ ৬৯ হাজার বীরঙ্গনা সামনে নিয়ে পথচলা সদ্য স্বাধীন এই দেশটির। দেশটি পুনর্গঠনে হাত দিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ পেলেন তিনি। এ সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশটির কোমড় সোজা করে দাঁড় করালেন। ব্যাংক বীমা, অফিস-আদালত, কল-কারখানা সচল হলো, পুল কালভার্ট নির্মাণ হলো, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলো, সমুদ্র বন্দর, বিমানবন্দর, রেলপথ চালু হলো, বিদেশের স্বীকৃতি এলো, জাতিসংঘ, ওআইসি সহ বিশ^ দরবারে বাংলাদেশের নাম লেখা হলো। জাতিসংঘ বঙ্গবন্ধুকে বাংলায় ভাষণ দেয়ার স্বীকৃতি দিলো, মুসলিম বিশে^ বাংলাদেশের স্থান হলো। সৌদি আরবে হজ¦ পালনের সুযোগ হলো, জাতির পিতা ‘জুলিও কুরি’ উপাধি পেল। সর্বোপরি নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি উচ্চতায় পৌঁছে দিল জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু স্বল্প সময়ে পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালিদের ফেরত আনলেন, ভারতের মিত্রবাহিনীকে তাদের দেশে পৌঁছে দিলেন, বন্দী বিনিময় হলো। সর্বোপরি বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিজ পায়ে দাঁড়ালো। বাঙালি দুর্ভাগা জাতি, ২৩ বছর পাকিস্তানিদের গোলামীর পূর্বে দুইশত বছর ব্রিটিশদের গোলামীর জিঞ্জিরেও আটকা ছিল। মুক্তিদূত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালি এই জাতির ভাষার অধিকার, বাঁচার অধিকার, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে দিল। জাতিরাষ্ট্র এ বাংলাদেশের জন্য সংবিধান, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত এনে দিলো। অথচ এ জাতিরাষ্ট্রের পিতাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় করে দিল। রক্তগঙ্গায় ভাসল পিতার রক্তে বাংলার পবিত্র মাটি। জাতির পিতা ও জাতীয় নেতাদের হত্যা করে দেশটি দখল করলো ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি। তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বদলে দিল। তারা দেশের অগ্রগতি সমৃদ্ধ স্তব্ধ করে ছিল। রুখে দিল প্রগতি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ প্রায় ২১ বছর ছিল এদেশের কালো অধ্যায়। সামরিক শাসন, স্বৈরশাসনের যাতাকলে পিষ্ট হলো গণতন্ত্র, ভাত ও ভোটের অধিকার। উন্নয়ন অগ্রগতি ও প্রগতি হলো বাধাগ্রস্ত। বাংলার আকাশে ১৯৯৬ সালে আবার নতুন সূর্য উদিত হলোÑ জাতির পিতার কন্যার হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব এলো। জাতি নতুন আশার আলোতে পুলকিত হলো। শুরু হলো নবযাত্রা, নবউচ্ছ¡াস আর উদ্যম। তলাবিহীন ঝুড়ি ধীরে ধীরে এগুতে থাকলো। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার যাদুর পরশে বদলে যাওয়া শুরু হলো স্বাধীন এদেশ। স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় দেশে এলো নতুন হাওয়া, দুনিয়ার মানুষের সামনে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ। শুক্রবার ২৭ ফেব্রæয়ারি ২০২১ খ্রি. উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণে জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার স্বীকৃতি লাভ। এ স্বীকৃতি তরুণ প্রজন্মকে উৎসর্গ করলেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘের চূড়ান্ত সুপারিশ প্রাপ্তির খবরটি প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানার কাছ থেকে প্রথম শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশবাসীর এ বিরল অর্জনের খবর দেশবাসীকে জানাতে গত শুক্রবার ২৭ ফেব্রæয়ারি ২০২১ খ্রি. তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ভার্চুয়ালী। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘১২ বছর ধরে সরকার পরিচালনায় নিরন্তর পরিশ্রম এবং পরিকল্পনার ফসল হচ্ছে এ অর্জন। এ কৃতিত্ব এ দেশের আপামর জনসাধারণের। সরকার শুধু নীতি-সহায়তার মাধ্যমে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। উন্নয়নের চলমান গতিধারা অব্যাহত থাকলে বিশে^র দরবারে বাংলাদেশ অচিরেই একটি উন্নত সমৃদ্ধ, মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেÑ এমন আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই উত্তরণ এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্্যাপন করছে, আমরা মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশের জন্য এ উত্তরণ এক ঐতিহাসিক ঘটনা। আজকের বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ।’ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে সুপারিশের দিনটি জাতির স্মরণীয় দিন। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে জন্ম থেকে আজকের এই দিনে আসার পথে অনেক চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে। গত পাঁচ দশকে এশিয়ার ও আফ্রিকার অন্য দেশের তুলনায় আমাদের অর্জনটা প্রশংসনীয়। জাতিসংঘের কাছ থেকে আমরা সেটার স্বীকৃতি ও পেয়েছি। ২০১৮ সালে স্বল্পোনাœত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার জন্য সব সূচক আমরা প্রথম অর্জন করি। ২০১৮ থেকে ২০২১ এই তিন বছরেও আমরা সূচকের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে গত ছয় বছর যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আগামী পাঁচ বছর ও আমাদের ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকৃত শেষটা সুষ্ঠুভাবে অর্জনের জন্য আমাদের উদ্যম রাখতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের পর্যালোচনায় ২০১৯ সালে মাথাপিছু আয়ের মানদÐ নির্ধারিত ছিল ১ হাজার ১১২ মার্কিন ডলার। ওই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৮২৭ ডলার। আর বর্তমানে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৬৪ ডলার। অর্থাৎ মানদÐের প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ। মানব সম্পদ সূচকে নির্ধারিত মানদÐ ৬৬ এর বিপরীতে বাংলাদেশের অর্জন ৭৫ দশমিক ৪। অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচকে উত্তরণের জন্য মানদÐ নির্ধারিত ছিল ৩২ বা তার কম। কিন্তু ওই সময়ে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৭। করোনা ভাইরাস বহু কিছুকেই জটিল করে দিয়েছে। চলমান অতিমারি থেকে গেলেও এর প্রভাব অব্যাহত থাকবে বহুদিন। অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে কোভিড-১৯ ক্রমপ্রকাশমান প্রভাব সম্পর্কে আমাদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। দেখতে হবে, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নষ্ট না হয়। মূল্যস্ফীতি যাতে বৃদ্ধি না পায়। বাংলাদেশকে আগামী পাঁচ বছর প্রতিকূল বিশ^ অর্থনীতির মধ্যে বিকাশ লাভ করতে হবে। পৃথিবীজুড়েই এখন মন্দা চলছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ কর্মকাÐ এখন শ্লথ। যদি তেলের দাম আরও বাড়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব যদি আরও প্রকট হয়। এ বিষয়গুলোকে আমলে নিতে হবে সরকারকে। এছাড়াও বাংলাদেশে আছে ১১ লাখ রোহিঙ্গার ভরণপোষণ ও তাদের প্রত্যাবাসনের খরচ নির্বাহের বিষয়টি। আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের উন্নয়নের বাংলাদেশকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে সমাজে বৈষম্য কমানোর দিকে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রজীবনের সব ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, ১০০ বছর মেয়াদি ব-দ্বীপ পরিকল্পনা, জলবায়ু অ্যাকশান প্ল্যান এবং জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি অ্যাজেন্ডা এগুলো পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের সঙ্গে উত্তরকালীন কৌশলকে মেলাতে পারলে এবং আন্তর্জাতিক পরিমÐলে বাংলাদেশের দাবি দাওয়া তুলে ধরার জন্য নিউইয়ার্ক, জেনেভা, ব্রাসেল সহ অন্য মিশনগুলোতে যৌথভাবে মনোযোগী হয়ে ব্যক্তি খাত ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় উদ্যোগে সম্পৃক্ত রাখা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আগামীতে দেশকে অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেশে গৃহীত কৌশল দেশ ও বিদেশে বাস্তবায়ন করতে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। দেশ বিদেশ এর অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করে দেশে চলমান স্থিতিশীল ধারা অব্যাহত রেখে দেশ পরিচালনা সম্ভব হলে উন্নয়নশীল বাংলাদেশ তার অভিষ্ঠ লক্ষ্য উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব হবে না। দেশবাসী নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে নিজেরা তৎপর হলে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশ সামনে এগুবে এতে কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান অর্জন ও সাফল্যে জাতির পিতার স্বপ্নপূরণে এক ধাপ সামনে এগুলো। দেশবিরোধী অপশক্তি তাদের ভুলবুঝে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার উদ্যেমী হলে দেশ আরো দ্রুত সামনে এগুবে। আমরা আশা করি সব মত ও পথ এক মোহনায় মিলিত হয়ে দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক
বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতা স্মৃতি পরিষদ