বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ হাট-বাজার

112

মনিরুল ইসলাম মুন্না

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে সরকার। যার প্রমাণে বদলে যাচ্ছে গ্রামের হাটবাজারের চেহারা। আগে কাদাময় ও ঘেষাঘেষি গড়ে ওঠা হাট-বাজারের বদলে এখন গ্রামের বাজার বসবে বহুতল ভবনে। এ লক্ষ্যে দেশের ৪৯১টি উপজেলায় ৫২০টি ভবন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের পাঁচ উপজেলায় অর্ধ শতাংশের বেশি কাজ শেষ। বাকি উপজেলায় এখনও ১০-১৫ শতাংশের মধ্যে।
২০১৭ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২০ সালের ৩০ জুন শেষ করার কথা থাকলেও মহামারির কারণে তা বৃদ্ধি করে আগামী ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল বুধবার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সাথে আলাপচারিতায় এসব তথ্য জানা যায়।
এলজিইডি’র দেয়া তথ্যমতে, গ্রামীণ জনগণের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি অধিকাংশই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করতে হলে গ্রামীণ হাটবাজার নির্মাণ জরুরি। গ্রামাঞ্চলে হাটবাজারের পূর্ণ সুবিধা থেকে গ্রামীণ কৃষক ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীরা তেমন সুযোগ পান না।
বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় কৃষক তার উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে স্বল্পমূল্যে উৎপাদনের জায়গায় বিক্রি করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে স্থায়ী অবকাঠামো না থাকায় গ্রামীণ বাজারে মালামালের সরবরাহ অপ্রতুল থাকায় ভোক্তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বেশি দাম দিতে হয়। ৪ থেকে ১০ হাজার বর্গফুটের বাজার নির্মাণসহ অন্যান্য ভৌত সুবিধা দেওয়া গেলে কৃষি ও অকৃষি পণ্যের সহজ বাজারজাতকরণের মাধ্যমে কৃষক প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে তার পণ্য বিক্রয় করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ভোক্তারাও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সহজে ও ন্যায্যমূল্যে কেনার সুবিধা পাবেন।
এরই প্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পটি দেশের সব উপজেলার পাশাপাশি চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলায়ও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পল্লী অঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণ, কৃষি পণ্য ন্যায্যম‚ল্যে প্রাপ্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, পরিবহন ব্যয় হ্রাস ও প্রকল্প এলাকায় উন্নত হাটবাজার অবকাঠামো তৈরি হবে। সামগ্রিকভাবে পল্লী এলাকার জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং দারিদ্রতা কমবে।
এলজিইডি চট্টগ্রাম অঞ্চল কার্যালয় সূত্র জানা যায়, বর্তমানে সন্দ্বীপ উপজেলায় বাজারের ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে ৯৬ শতাংশ, মিরসরাইয়ে ৮৫ শতাংশ, হাটহাজারীতে ৮০ শতাংশ, রাউজানে ৫০ শতাংশ, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫ শতাংশ এবং চন্দনাইশে ১০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বোয়ালখালী, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও সীতাকুন্ডতে জমি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে কাজ শুরু হয়নি। কর্ণফুলী ও পটিয়াতে টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সাতকানিয়া ও ফটিকছড়িতে মার্কেট নকশা প্রস্তুতের কাজ চলছে।
এলজিইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী তোফাজ্জল আহমদ পূর্বদেশকে বলেন, এটি সরকারের একটি নতুন উদ্যোগ। এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। গ্রামীণ বাজারের এসব ভবন নির্মাণের ফলে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহিত হবে। গ্রামীণ অর্থনীতি বিকশিত হবে। সরকারের এসডিজি লক্ষ্যমাত্রায় কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। গ্রামের আর্থসামাজিক অবস্থারও পরিবর্তন হবে। পণ্য কেনা-বেচার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামেও ১৫ উপজেলায় পর্যায়ক্রমে ভবনের কাজ শেষ হবে। প্রতিটি বাজারের আয়তন হবে কমপক্ষে চার হাজার বর্গফুট, সর্বোচ্চ ১০ হাজার বর্গফুট। চার তলা ফাউন্ডেশনে আধুনিক এ মার্কেটে প্রাথমিক পর্যায়ে দোতলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে। পর্যায়ক্রমে চার তলা পর্যন্ত নির্মিত হবে। নীচ তলায় থাকবে কাঁচা বাজার, মাছ-মাংসের দোকান ও মুদির দোকান। দ্বিতীয় তলায় অর্ধেক অংশে হার্ডওয়্যার, গার্মেন্টস, কসমেটিকস এবং বাকী অর্ধেক অংশে মহিলাদের দোকান। যেখানে আলাদা টয়লেটসহ মহিলা ও শিশুদের জন্য আলাদা কর্নার থাকবে। তৃতীয় তলায় ইলেকট্রিক্যাল-ইলেকট্রনিক্স, টেইলারিং, কাপড়ের দোকান। চতুর্থ তলায় ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, সাইবার ক্যাফে ও খাবারের দোকান। আর এ বাজার বাজার হবে সবার জন্য উন্মুক্ত।
প্রকৌশলী তোফাজ্জল আহমদ বলেন, সাব-সয়েল ইনভেস্টিগেশন ও টপো সার্ভে সম্পাদনপূর্বক প্রস্তাবিত মার্কেটে জমির প্রাপ্যতা এবং অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন স্থাপত্য নকশার দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ করা হবে। মার্কেট ভবনের নীচতলায় চারদিক থেকে জনগণ ঢুকতে এবং বেরিয়ে যেতে পারবে। দোতলায় উঠার জন্য সুবিধাজনক অবস্থান ভবনের দুপাশে সিড়ি নির্মাণ করা হবে। ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
প্রসঙ্গত, গত ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ‘দেশব্যাপী গ্রামীণ বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক এই প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।