‘বদলি’ হওয়া প্রকৌশলী স্বাক্ষর করছেন ফাইলে

12

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাঁশখালী উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়াকে প্রধান প্রকৌশলীর অফিসিয়াল আদেশে বদলি করা হয় গত ৬ সেপ্টেম্বর। বদলি হওয়ার এক মাস ছুঁই ছুঁই হলেও ‘অজ্ঞাত কারণে’ এখনো তিনি বাঁশখালী ছেড়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। প্রতিদিনই বাঁশখালী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে অফিস করছেন তিনি। ফাইল-নথিতে নিয়মিত স্বাক্ষর করছেন। বদলি হওয়ার পরও ফাইল নথিতে স্বাক্ষর করে পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিচ্ছেন। আর কৌশলে নিজের বদলি ঠেকানোর মিশন চালিয়ে যাচ্ছেন এই প্রকৌশলী।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আমিরুজ্জামান পূর্বদেশকে বলেন, ‘বাঁশখালীর প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে ঠিক। কিন্তু সেখানে যাকে দেয়া হয়েছে তিনি প্রশিক্ষণে আছেন। অফিসতো আর খালি রাখা যাবে না। সেজন্য কিছুদিন উনি কর্মস্থলে আছেন। যদিও কোন কাজ করতে পারছে না। অনেক সমস্যা আছে। উনিও ঠিকমতো হয়তো সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখতে পারেন নাই। বদলিতো আর এমনি হয়নি, কারণ নিশ্চয় আছে। ভালো-মন্দ মিলিয়েই হয়েছে। আমাদেরকে সব পক্ষের কথা শুনতে হয়। সরকার যখন বদলি করেছে, তিনি চলেই যাবেন।’
এদিকে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকলেও গত বুধবার অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়াকে। উপজেলায় উন্নয়নে দায়িত্বে থাকা গুরুত্বপূর্ণ এই কর্মকর্তার পরিবর্তে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া সহকারী প্রকৌশলী কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদকে। কিন্তু তিনি প্রশিক্ষণে থাকায় কেউ এ সভায় যোগদান করতে পারেনি। সভায় প্রকৌশলী অনুপস্থিত থাকায় উপজেলার উন্নয়ন নিয়ে কোন আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। সভায় উপস্থিত কয়েকজন উপজেলা প্রকৌশলীর স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বাঁশখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী মুহাম্মদ গালিব সাদলী পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমরা অফিস অর্ডার দেখে জেনেছি উপজেলা প্রকৌশলী বদলি হয়েছেন। সেখানে আরেকজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু উনি যাচ্ছেন না। নিয়মিত অফিস করছেন। আবার উনার বদলি প্রত্যাহার হয়েছে এমন আদেশও নেই। তাই উপজেলার সভায় উনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অফিস আদেশে যিনিই অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন, উনার নামে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।’
জানা যায়, বাঁশখালী উপজেলা প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়াকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় একই পদে বদলি করা হয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর এই বদলির আদেশ হলেও এখনো তিনি বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে বাঁশখালীতেই দায়িত্ব পালন করছেন। একই তারিখে পৃথক আদেশে তাঁর স্থলে বাঁশখালীর সহকারী প্রকৌশলী কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদকে উপজেলা প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের আদেশ দেয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। দুটি আদেশই দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুর রশীদ খান। প্রধান প্রকৌশলী এমন আদেশ দেয়ার একদিন আগেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়া সহকারী প্রকৌশলী কুমিল্লায় প্রশিক্ষণে চলে যান। এই কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ শেষ হবে ৩ নভেম্বর। প্রশিক্ষণে থাকলেও নতুন করে কাউকে এ পদে পদায়ন না করায় বহাল তবিয়তে আছেন উপজেলা প্রকৌশলী।
উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদ পূর্বদেশকে বলেন, ‘দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে কীভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবো। তাছাড়া আমি এখন প্রশিক্ষণ শেষ হয়নি। প্রশিক্ষণ শেষ হলেই দায়িত্ব নিব। এ ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী স্যার বলেছেন ট্রেনিং শেষ হলেই দায়িত্ব বুঝে নিব।’
সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি বাঁশখালীতে উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত চারজন সহকারী প্রকৌশলী বদলি হলেও তিনি রয়ে যান। এমনকি তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে একজন সহকারী প্রকৌশলী উল্টো বদলি হয়েছেন। এর আগেও একবার বদলি হলেও তা ঠেকিয়ে দেন। দীর্ঘদিন বাঁশখালীতে থাকার পেছনে এই কর্মকর্তার খুঁটির জোর কোথায় তা নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রচার আছে, টাকা যেমন আয় করেন, তেমনি প্রভাবশালী মহলকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন এই কর্মকর্তা।
এসব বিষয়ে জানতে বদলি হওয়া উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়ার মুঠোফোনে কল দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুজ্জামান চৌধুরী পূর্বদেশকে বলেন, ‘বদলি হয়েছে শুনেছি। কিন্তু নতুন কেউ না আসায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত এক মাসে চলমান কিংবা নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি কেমন তাও জানি না। গত মাসিক সভায় উনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সহকারী প্রকৌশরী যাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে উনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ আসেন নাই। প্রকৌশলী বদলি হওয়ার পর থেকে কোন নিয়মিত ফাইল আমার কাছে আসে না। অফিস কীভাবে চলছে জানি না।’