বজ্রপাতে জীবনহানি রোধে সতর্কতা জরুরি

5

প্রতিবছর দেশে বজ্রপাতে এক ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটে। বিশেষ করে বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে কৃষকরা খোলামাঠে যখন কাজ করে ঠিক তখন বজ্রপাত হয় বেশি এবং এতে প্রতিবছরই কৃষক মারা যায়। বৈশাখের তীব্র গরমে স্বস্তি এনে দেয় এক পসলা বৃষ্টি। কিন্তু এই স্বস্তির বৃষ্টির সাথে আসা বজ্রপাত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিসংখ্যান বলছে ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বজ্রপাতে মারা গেছেন অন্তত ৬৩৫ জন। আর শুধুমাত্র ২০১৬ সালেই ১৪২ জনের জীবন নিয়েছিল বজ্রপাত। এ দেশে মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বজ্রপাত হয়ে থাকে। এর মধ্যে এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাত তুলনামূলকভাবে বেশি হয় অনেক সময় এটি পুরো জুনমাস জুড়ে অব্যাহত থাকে। প্রকৃতপক্ষে ঝড়বৃষ্টির সময় বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে কিছু নিয়ম মেনে চললে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় যেমন- বজ্রপাতের সময় যেকেনো পাকা বাড়ির নীচে আশ্রয় নিন। ঘন ঘন বজ্রপাত হতে থাকলে কোনো অবস্থাতেই খোলা বা উঁচু জায়গায় না থাকাই ভালো। এ অবস্থায় সবচেয়ে ভালো হয় যদি কোনও দালানের নীচে আশ্রয় নিতে পারেন। উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুতের লাইন থেকে দূরে থাকুন। উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এ সব জায়গায় যাবেন না বা কাছাকাছি থাকবেন না। ফাঁকা জায়গায় কোনও যাত্রী ছাউনি বা বড় গাছ ইত্যাদিতে বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি থাকে। জানালা থেকে দূরে থাকুন। বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি থাকবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতর থাকুন। ধাতব বস্তু এড়িয়ে চলুন। বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না। এমনকি ল্যান্ড লাইন টেলিফোনও স্পর্শ করবেন না। বজ্রপাতের সময় এগুলোর সংস্পর্শ এসে অনেকে আহত হন। টিভি-ফ্রিজ থেকে সাবধান। বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক সংযোগযুক্ত সব যন্ত্রপাতি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। টিভি, ফ্রিজ ইত্যাদি বন্ধ করা থাকলেও ধরবেন না। বজ্রপাতের আভাষ পেলে আগেই এগুলোর প্লাগ খুলে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করুন। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্লাগ আগেই খুলে রাখুন। বজ্রপাতের সময় রাস্তায় গাড়িতে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করুন। যদি প্রচÐ বজ্রপাত ও বৃষ্টির সম্মুখীন হন তবে গাড়ি কোনো পাকা ছাউনির নীচে নিয়ে যান। এ সময় গাড়ির কাঁচে হাত দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
ঝড়-বৃষ্টির সময় রাস্তায় জল জমা আশ্চর্য নয়। তবে বজ্রপাত অব্যাহত থাকলে সে সময় রাস্তায় বের না হওয়াই মঙ্গল। একে তো বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। উপরন্তু কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়লে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায়। বজ্রপাতের সময় চামড়ার ভেজা জুতা বা খালি পায়ে থাকা খুবই বিপজ্জনক। যদি একান্ত বেরোতেই হয় পা ঢাকা জুতো পড়ে বের হোন। রবারের গাম্বুট এ ক্ষেত্রে সব থেকে ভালো কাজ করবে।
বজ্রপাতের সময় রাস্তায় চলাচলের সময় আশেপাশে খেয়াল রাখুন। যে দিকে বাজ পড়ার প্রবণতা বেশি সে দিক বর্জন করুন। কেউ আহত হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন। মুলতঃ আমাদের দেশে বজ্রপাত বিষয়ে সঠিক জ্ঞানের অভাবেও বছর অনেক মানুষ মারা যায়, অনেকে বজ্রপাতের সময় অযথা ঘরের বাইরে ঘোরাফেরা করে এবং বজ্রপাতকে তেমন একটা পাত্তা দেয়না ফলে এরাই বিপদে পড়ে বেশি। আমাদের সবার মনে রাখতে হবে যে বজ্রপাত কোনো সাধারন বিষয় নয় এটা বাইরে থাকলে যে কারে ওপর পড়তে পারে আর এটা একবার ওপর পড়লে তাকে বালচানো প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। যদিও চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতির ফলে কিছুকিছু বজ্রপাত পড়া মানুষ সেরে ওঠছে তবে যেগুলো বজ্রপাত হওয়ার পর সঙ্গেসঙ্গেই মৃত্যুবরণ করছে তারাও একটু সাবধান হলে হয়ত এপরিণতি ভোগ করতে হতোনা। তাই বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সতর্কতা এবং সাবধানতার কোনো বিকল্প নেই।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বজ্রপাত প্রতিরোধের এখন পর্যন্ত কোনো উপায় আবিষ্কার না হলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রাণহানির আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। অনুশীলনের মাধ্যমে এই অভ্যাসগুলো রপ্ত করার মাধ্যমে বিপদ কমিয়ে আনা যায়। সাধারণত এপ্রিল, মে, জুন এই মাসগুলোতে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই কৃষক ভাইদের দিনের বেলায় মাঠে কাজ করতে গেলে অত্যন্ত সাবধানে যাওয়া প্রয়োজনবোধে অতিরিক্ত ঝড়বৃষ্টি হলে এবং বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হলে মাঠে না যাওয়া।
লেখক: কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক