বছরজুড়ে আলোচনায় জলাবদ্ধতা প্রকল্প

14

এম এ হোসাইন

পুরো বছর জুড়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ছিলো চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্প। সামান্য বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়াতে একাধিক সংস্থা বাধ্য হয়ে বসেছিল জরুরি বৈঠকে। গঠন করা হয় চার সদস্যের কমিটিও। তবে কার্যত কোনো সুফল আসেনি। বছর শেষে এসে আগামী বর্ষায় দুর্ভোগ হলে এর দায় বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএকে নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র।
গেল বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতেই ডুবেছে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। তারও আগে বৃষ্টিতে কয়েক দফা জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে। সমন্বয় সভা আর দফায় দফায় খালের বাঁধ অপসারণের সময় নির্ধারণ দেখেছে চট্টগ্রামবাসী। বর্ষার বৃষ্টিতে বারে বারে ডুবেছিল নগর। জোয়ারের পানিতে খাতুনগঞ্জ, আগ্রাবাদের মতো বাণিজ্যিক এলাকায় রাস্তাঘাট ডুবে যায়।
গেল জুনে চারদিনের টানা বৃষ্টিতে নগরীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তখন নগরের অনেক এলাকা ডুবে যায়। অনেক জায়গায় পানি জমে থাকে ৫ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত। এ অবস্থায় সেবা সংস্থাগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসে চসিক। ২২ জুন অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সিডিএ-এর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসকে প্রধান করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তিতে ৩২টি খাল পরির্দশন করে কমিটি চসিক মেয়রের কাছে দুই পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। এই প্রতিবেদনে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে ৬টি স্বল্পমেয়াদি ও ১১টি দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করে কমিটি। কমিটির চিহ্নিত করা কারণগুলোর মধ্যে ছিল অতিবর্ষণ ও একইসঙ্গে কর্ণফুলী নদীতে পূর্ণিমার সময় অতিরিক্ত জোয়ার, খালের সংস্কার কাজের জন্য মাটি থাকার ফলে খাল সংকোচন, খাল ও নালা-নর্দমা বেদখল, নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে খাল-নালায় বর্জ্য ফেলা এবং নিয়মিত খাল-নালা থেকে মাটি উত্তোলন না করা। কমিটির স্বল্প মেয়াদী সুপারিশ সমুহের মধ্যে ছিল স্ব স্ব সংস্থার উদ্যোগে চিহ্নিত সমস্যার দ্রুত সমাধান, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় বর্ষা মৌসুমে নিয়মিতভাবে খাল-নালার বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালু রাখা, পানি চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়ানো বিভিন্ন সেবা সংস্থার পাইপ অপসারণ, খাল-নালায় বর্জ্য না ফেলার জন্য জনসচেতনতা বাড়ানো, খাল-নালা দখলকারীদের উচ্ছেদ ও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতার বাইরের খাল-নালাগুলো সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে নিয়মিত পরিষ্কার করা। কমিটির প্রস্তাবিত দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশগুলোর মধ্যে ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প ও বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা, সংস্কার কাজের জন্য খালে দেওয়া বাঁধ অপসারণ, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিলট্র্যাপ স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে সার্কেল গঠন করা, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১টি খাল নিয়ে দ্রুত প্রকল্প হাতে নেওয়া, শেখ মুজিব রোডের কালভার্টের মাটি উত্তোলন, ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার সুপারিশ অনুযায়ী নগরে জলাধার তৈরি করা এবং নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ৪০টি জলকপাট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দেওয়া।
জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা সিডিএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্ষা ও জোয়ারের পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে নগরীর ৩৬টি খাল খনন, সংস্কারের কাজ চলছে। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় ১৮টি খালের কাজ আটকে আছে। বাকি ১৮টি খালের কাজ শেষ করে সিটি কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও সেগুলো নিচ্ছে না কর্পোরেশন। সবগুলো খালের কাজ শেষ করার পর বুঝে নিতে চায় কর্পোরেশন। মূলত সংস্কার ব্যয় থেকে বাঁচতে খালগুলো বুঝে নিতে নারাজ কর্পোরেশন। অন্যদিকে ১৮টি খালের কাজ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও কার্যত কোনো খালেরই পুরোপুরি কাজ শেষ হয়নি। আবার যেগুলোর কাজ শেষ হয়েছে সেখানে নতুন করে ভরাট হচ্ছে।
২০১৭ সালের আগস্টে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ২০১৮ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের বড় বাধা ভূমি অধিগ্রহণ। অনুমোদনের সময় ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ ছিল দেড়গুণ। আইন সংশোধন করে তা তিনগুণ নির্ধারণ করা হয়। তাই প্রকল্পের নির্ধারতি ৬ হাজার ৫১৬ কাঠা ভূমির মধ্যে মাত্র ৩০০ কাঠা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এই জটিলতায় নগরীর মির্জাখাল, ত্রিপুরাখাল, গয়নাছড়া খাল, ডোমখালী খাল, মহেশখাল, চাক্তাইখাল, চাক্তাই ডাইমেনশন খাল, হিজড়া খাল, বদরখাল, নোয়াখাল, শিতলঝর্ণা খাল, চশমাখালসহ ১৮টি খালের খনন, সম্প্রসারণ ও সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হয়নি।