বঙ্গমাতা : বঙ্গবন্ধুর প্রেরণা ও শক্তির নাম

3

আ.ফ.ম.মোদাচ্ছের আলী

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে নয় নেপথ্যের সংগঠক হিসেবে যিনি নিজেকে যুক্ত করে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, বাঙলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়সম সু-উচ্চতায় অধিসঠিত করেছেন তিনি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনে ছায়ার মতো পাশে থেকে লড়াই করেছেন, অন্যদিকে আগলে রেখাছিলেন সংসার।
বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়াতেই ১৯৩০ খ্রীস্টাব্দের ৮ আগস্ট জন্ম নিয়েছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর রেণু। জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় ও একই বংশধর। সেই আমলে শেখ পরিবারে নিজেদের মধ্যেই বিয়ে হতো।অল্প বয়সে বঙ্গবন্ধুর সাথে বেগম মুজিবের বিয়ে হয়।এই বিয়ের কাজ সমাধা হয়েছিল বেগম মুজিবের দাদা শেখ কাশেমের আগ্রহে। বঙ্গবন্ধুর খেলার সাথী থেকে তিনি হয়েছিলেব জীবন সাথী। লড়াই করেছেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনের সিংহভাগ কেটেছে জেলখানায়।ঢাকায় অবস্থানকালে বঙ্গবন্ধু বারবার কারারুদ্ধ হয়েছেন। সেই দুঃসময়ে অর্থাভাবে বেগম মুজিবকে মূল্যবান গৃহসামগ্রী বিক্রি করতে হয়েছে। ছয় দফা আন্দোলনের সময় তিনি নিজের স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে আওয়ামীলীগকে আর্থিক সহায়তা করেছেন। নীলিমা ইব্রাহীম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে নিয়ে লিখেছেন ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগ ভুখা মিছিল বের করে এবং যথারীতি শেখ মুজিবু গ্রেপ্তার হন।এবারের জেলের মেয়াদ দু বছর। এই সময়ে হাসিনা ও কামাল মায়ের সঙ্গে দেশের বাড়িতে, নানা দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা নিয়ে দিন কাটে। কিন্তু প্রথম থেকেই রেণুর মনোবল অসীম। ১৯৫৩ সালের ২৮এপ্রিল শেখ জামালের জন্ম। ১৯৫৪ সালে প্রথমবারের মতো তিন সন্তুান সহ বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুকে সহায়তা করার মানসে ঢাকা শহরে আসেন। বাসা ভাড়া নেন গেন্ডারিয়ার রজনী চৌধুরী লেনে। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধু যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী হলেন।উঠলেন ৩ নম্বর মিন্টু রোডের মন্ত্রীদের জন্য সংরক্ষিত বাড়িতে। কিন্তু ২৯ মে ৯২(ক) ধারা জারীর মাধ্যমে মন্ত্রী পরিসদ বাতিল হলো।পুলিশ বাড়িতে বার বার হানা দিচ্ছে আর বেগম মুজিব মোকাবেলা করছেন। ১৪ দিনের সরকারি নোটিশ হাতে নিয়ে এবার উঠলেন নাজিরা বাজার গলির একটি বাড়িতে। এই বাড়িতেই শেখ রেহানার জন্ম। বঙ্গবন্ধু জেলে।ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া,স্কুলের বেতন,এসব সাংসারিক খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হলেও তিনি ছিলেন অদম্য।কাউকে বুঝতে না দিয়ে এসব সামলিয়ে নিতেন তিনি। কোন কোন দিন তিনি হঠাৎ ছেলেমেয়েদের বলতেন “আজ আমরা রুটি খাবো কেমন? রোজ রোজ ভাত খেতে ভালো লাগেনা।” বেগম মুজিব নিজকে তৈরি করেছিলেন একজন রাজনীতিকের সহযোদ্ধা হিসেবে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন আর দশটা সংসারের মতো তাঁর সংসার নয়।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু বাঙালির বাঁচার দাবি ছয় দফা পেশ করেন। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা নিয়ে উল্কার গতিতে সারা দেশে জনসভা করতে লাগলেন।জনসভায় হাজার হাজার মানুষের জনসমাগম হতে থাকলো। তিনি যেখানেই যেতেন সেখানেই বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হতো। ইতিমধ্যে আইয়ুব খান তাঁর বিরুদ্ধে ১২ টি মামলা দায়ের করে। ১৯৬৬ সালের ৮ মে দেশরক্ষা আইনে তাঁকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য আটক করা হয়, ইতিপূর্বে তিনি ৮ বার গ্রেফতার হন।
৬ দফা আন্দোলন সফল করার পেছনে বেগম মুজিবের অবদান অপরিসীম। পলাশী থেকে ধানমন্ডি গ্রন্থে আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন ‘কেউ কি জানে ৬ দফা আন্দোলনের সেই ভয়ংকর দিনগুলোতে আপনি স্বামীকে কতটা সাহস যুগিয়েছেন? বোরকায় শরীর ঢেকে তার ভেতরে ৬ দফার লিফলেট লুকিয়ে ঢাকা শহরের ঘরে ঘরে বিতরণ করেছেন? বঙ্গবন্ধু যাতে ৬ দফা নিয়ে আইয়ুব বিরোধী পদক্ষেপ না নেন তার চেস্টাও করা হয়েছিল, কিন্তু বেগম মুজিব সেটি প্রত্যাখান করেছিলেন। ‘ধীরে বহে মেঘনা’ গ্রন্থের ১৩০ পৃষ্ঠায় লেখা ইতিহাসের অংশ উদ্ধৃত করছি, ফজলুল কাদের চৌধুরী আইয়ুব খানের কিছু লোভনীয় প্রস্তাব শেখ মুজিবকে জানান। শেখ মুজিব মুচকি হেসে বলেন হাসুর মায়ের সঙ্গে একটু আলাপ করুই।দুদিন পর শেখ মুজিবের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে তিনি নিজেই গোপনে মাঝরাতে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর রাগ্রার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। শেখ মুজিব হাসিমুখে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন।শেখ মুজিবকে একা পেয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী তার প্রস্তাব তুকতে যাবেন এমন সময় চা নাশতার ট্রে নিয়ে বেগম মুজিব ঘরে ঢুকলেন বেগম মুজিব। সেটি ফজলুল কাদের চৌধুরীর সামনের টেবিলে রেখে বিনীতভাবে বললেন আমাদের মাথা কিনতে চাইবেননা। শেখ মুজিবকে মোনায়েম খা বানানোর চেস্টা করবেননা।
১৯৬৮ সালের ১৯ জুন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হয়।আইয়ুব মোনেম এর চরম দমন পীড়ন চলতে থাকে। আগরতলা মামলার আইনজীবীদের টাকার যোগান দিতে হয়েছে বেগন মুজিবকে। ১৮৬৯ সালের গণ আন্দোলনের তীব্র চাপে আইয়ুব খান গোক টেবিল বৈঠক ডাকেন যাতে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার কিথা উঠলে বেগম মুজিব ক্যান্টনমেন্টে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ চেয়ে মেসেজ পাঠান। এই প্রসঙ্গে ড. নীলিমা ইব্রাহীম এর লেখা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ‘গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করছি’ খুব কৌশলে শেখ হাসিনা ও ড. ওয়াজেদ বঙ্গবন্ধুর হাতে বেগম মুজিবের বার্তা পৌঁছে দেন।কিছুক্ষণ পরেই বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের অনুমতি পান।তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন আজ যদি তুমি প্যারোলে যেতে রাজি হতে তাহলে তোমার বিরুদ্ধে আমি পল্টনে জনসভা করতাম। এবার আবদুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্য এই প্রসঙ্গে তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। বিশেষ আদালতে এই মামলা চলার দিনটিতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একবার ও স্বামীর কাছে যাওয়ার চেষ্ঠা করতেননা। তিনি অন্যান্য বন্দীর স্ত্রীর কাছে বসে থাকতেন।ধীর স্থির মূর্তি।কারো চোখের পানি নিজের বুকের বেদনা গোপন করে অকল্প কন্ঠে তাকে বলতে শুনেছি তোমরা ভেঙে পড়োনা বোন। আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখো। আইয়ুব মোনেম খাঁর ষড়যন্ত্র ব্যার্থ হবেই।
৭ মার্চ ভাষণের পূর্বে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন চাপে ছিলেন। ভাবছিলেন। ভাবনার গভীরে যাওয়ার মূহুর্তে বেগম মুজিব অভয়বাণী শুনিয়েছিলেন এতো কি ভাবছো? তোমার বিবেক যেভাবে বলে সেভাবেই বক্তৃতা দেবে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি পদক্ষেপ,লড়াই সংগ্রামের সম্মুখ সারথি বেগম মুজিব। তাইতো বঙ্গবন্ধুর পাশেই দেদীপ্যমান নাম ‘বঙ্গমাতা’ বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মহিয়সী এই নারীর জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : ছড়াকার,প্রাবন্ধিক,গবেষক ও শিশুসাহিত্যিক