বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ চেয়েছিলেন

16

 

সম্প্রতি শারদীয় দুর্গোৎসবে কুমিল্লায় পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে নিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার পেছনে যারা সম্পৃক্ত বা ইন্ধন যুগিয়েছে তাদেরকে ধিক্কার জানাই। ২০১২ সালে রামুর ঘটনার পেছনে সাম্প্রদায়িক শক্তির ইন্ধন ছিল এবং যার জন্য অনেক বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস করে ঐতিহ্য-ইতিহাসকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করা হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এসব সম্প্রীতি বিনষ্টকারী ঘটনা ঘটাবার জন্য প্রতিনিয়ত ওঁত পেতে আছে এবং সুযোগ বুঝে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এতে করে তারা বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে ধ্বংস করে বিকৃত উল্লাস করে। কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাস একদিন দু’দিনের নয় শত শত বৎসরের ধারাবাহিকতার ইতিহাস ও সংস্কৃতি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এদেশে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে দাঁড়াতে শুরু করে। প্রায় ২৬টি বছর সাম্প্রদায়িক শক্তি দেশের ক্ষমতায় থেকে প্রশাসনসহ সর্বস্তরে গেড়ে বসেছে। এইসব সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রশাসন থেকে সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হয়নি, অন্যদিকে ভোল পাল্টিয়ে সুচতুরভাবে এরা বিশাল সংখ্যায় প্রশাসনে ঢুকে পড়েছে। এইসব ভোল পাল্টানো প্রশাসনে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কর্মকর্তাদের কার্যবিধি সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকারকে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। এরা এমনভাবে কাজ করে সরকারের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
দেশ স্বাধীন হবার এক বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সংবিধান রচনা করলেন। অথচ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী এই সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে তছনছ করে দেয়। শেষ পেরেকটুকু টুকে দিলেন স্বৈরাচার এরশাদ যিনি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করলেন। অর্থাৎ রাষ্ট্র তার ধর্ম নিরপেক্ষতার চরিত্র হারিয়ে ফেললো। শুধুমাত্র একটি ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার মাত্রা বৃদ্ধি পেলো। অন্য ধর্ম অবহেলিত হল। সেটিকে কাটিয়ে উঠার জন্য তিন ধর্মের তিনটি কল্যাণ ট্রাস্ট করা হল। অর্থাৎ শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো।
যা হোক অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর ধর্ম নিরপেক্ষতার মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। ধর্মনিরপেক্ষতা হলো রাজনৈতিক ইস্যু। অর্থাৎ রাষ্ট্র কোন ধর্মকে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। যার যার ধর্ম সে স্বাধীনভাবে মুক্তমন নিয়ে পালন করবে। বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে সব ধর্মের প্রতি সমান নজর দিতে। তারপরও রাষ্ট্র যেহেতু ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষতার চরিত্র হারিয়েছে সাংবিধানিকভাবে সেহেতু বাংলাদেশকে এখনো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা যাবে না যতদিন পর্যন্ত ’৭২ এর সংবিধানে ফেরৎ না যাওয়া যাবে।
কিন্তু অসাম্প্রদায়িক চেতনা হচ্ছে আবহমানকাল ধরে সর্বধর্মের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে যে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে তারই চেতনাকে ধরে রাখা।
অর্থাৎ সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে কোন বিরোধ থাকবে না, ভাইয়ের মতো বসবাস করবে, পরস্পরকে সহ্য করবে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সময় প্রত্যেক সম্প্রদায় সহনশীল ও ধৈর্য্যরে পরিচয় দেবে। এখনতো সহনশীলতার অভাব দেখা যাচ্ছে। ইচ্ছে করে সম্প্রীতির পরিবেশ ধ্বংস করার জন্য অনেক ক‚ট-কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু এটি কোন দিনই চাননি। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় রাষ্ট্র কায়েমের রাজনীতি করেছেন এবং রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাষ্ট্র হওয়া মানে পরিষ্কারভাবে বলা যেতে পারে সর্বধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সবস্থান।
কুমিল্লার ঘটনা পরিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক। বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যে বিশ্বে উন্নয়নের রোড মডেল হিসেবে ভাবমূর্তি তৈরি করেছে এবং মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত করার আন্তরিক অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তাকে ব্যাহত করার জন্যই কুমিল্লার ঘটনা। মৌলবাদী, ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী পাকিস্তানের পরাজিত প্রেতাত্মাদের এটি একটি নিন্দনীয় কাজ। পবিত্র কোরানকে অবমাননা কাজে ব্যবহৃত করে ঘোলা জলে মাছ শিকারের ব্যবস্থা করা। এটি আরো ব্যাপক হতে পারতো। সরকারের তথা নেত্রী শেখ হাসিনার সময়োচিত পদক্ষেপে এই ঘটনা ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনি। তবুও যতটুকু হয়েছে তাতে আমরা শংকিত। মানুষের মনোবল ভেঙে দিয়ে মানুষকে কলংকিত করার জন্য যেই সমস্ত স্বার্থান্ধরা দায়ী তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আমি সব সময় বলি আমাদের পরিচয় আমরা মানুষ। যেহেতু আমরা বাংলাদেশে বসবাস করি, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক সেহেতু আমাদের দ্বিতীয় পরিচয় আমরা বাঙালি, আমাদের তৃতীয় ও সর্বশেষ পরিচয় আমরা কোন ধর্মের আমরা কি মুসলমান, না হিন্দু, না বৌদ্ধ, না খৃস্টান। মানুষ হিসেবে বাহ্যিকভাবে আমাদের মধ্যে কোন প্রভেদ নাই শুধুমাত্র চিন্তা চেতনার কারণে আমরা বিভিন্ন ধর্মের হয়ে গিয়েছি। আমরা যদি মানুষ ভাবতাম নিজেকে তাহলে আমাদের মধ্যে কোন সংঘাত হোত না। আমরা ধর্মীয় আবরণে শুরুতেই যদি কোন্ ধর্মের ভাবি তাহলে সংঘাত অনিবার্য। অপরদিকে কোন ধর্মীয় শাস্ত্রে কোথাও লিখা নাই যে অপর ধর্মের মানুষের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে যাও নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতিরজনক স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের উপর অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়ে যাবার জন্য বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য নেতৃত্ব দেননি। বঙ্গবন্ধু সব বাঙালিদের নেতা। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে, বা ধ্বংস করার অব্যাহত প্রচেষ্টা চলছে এটা ভাবতেও আমি নিজেকে অপরাধী মনে করছি। এর জন্য আমরা যুদ্ধে যাইনি। আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম শান্তিপূর্ণভাবে সৌহার্দ্য সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে এদেশে বসবাস করার জন্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীরা অবশ্যই দেশের শত্রু। এরা এদেশের আলো বাতাস, মাটি, পানি, নদী, সাগর, পাহাড় কোন কিছুকে ভালোবাসে না। এদের একটাই চাহিদা কিভাবে অপর ধর্মের মানুষকে ধ্বংস করা যায়। ছোট বেলা থেকে এদের ব্রেইন ওয়াশ করা হয়। তাই সাম্প্রদায়িক শক্তি তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ আধুনিকায়ন করতে হবে। প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রী সর্বধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য সর্বধর্মীয় সিলেবাস তৈরি করতে হতে এবং সেইভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নামাজ শেষে খুৎবা প্রথার মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে এবং খুৎবাতে মানবতা ও মনুষ্যত্ব, মানবিক মূল্যবোধের বয়ানের জন্য ইমামদের প্রতি নির্দেশনামা জারী করতে হবে। খুৎবাতে কোন বিদ্বেষমূলক বয়ান করা যাবে না। ইমাম ভাইদের সেরকমভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আমি সেদিনও সার্কিট হাউসে বলেছি শুক্রবার আস্লে অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের মনে ভীতির সঞ্চার হয়। দেখা গিয়েছে জুমা নামাজের পরই প্রায় সময়ই ইসলাম ধর্মের ভাইয়েরা অন্য ধর্মের উপর হামলা করার প্রয়াস চালায়। এটা কেন হবে। ইসলাম ধর্মতো শান্তি ও সাম্যের ধর্ম। এই পবিত্র ধর্মকে অপব্যবহার করার অধিকার কাকেও দেয়া হয়নি। বাঙালিরা শান্তিতে বসবাস করতে চায়। আসুন সকলে মিলে মিশে শান্তিতে বসবাস করি। অন্যান্য ধর্মের ভাই বোনদের উদ্দেশ্যে বলি প্রত্যেক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিজেরাই সুরক্ষার ব্যবস্থা করবেন, স্বেচ্ছাসেবক স্কোয়াড গঠন করে প্রতি মুহূর্তের জন্য সজাগ থাকবেন। সাবধানের মার নেই। মনে রাখবেন এটাই জীবন।
লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট