বঙ্গবন্ধু অমর একুশে ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

18

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

নিবন্ধের সূচনায় বরেণ্য কবি প্রয়াত হাসান হাফিজুর রহমান রচিত ‘অমর একুশে’ কবিতার কয়েকটি পংক্তি বিনয়ের সাথে নিবেদন করতে চাই। ‘আম্মা তাঁর নামটি ধরে একবারও ডাকবে না তবে আর?/…… কি করে এই গুরুভার সইবে তুমি, কতোদিন?/ আবুল বরকত নেই; সেই অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠা/ বিশাল শরীর বালক, মধুর স্টলের ছাদ ছুঁয়ে হাঁটতো যে/ তাঁকে ডেকো না;/ ……সালাম, রফিকউদ্দিন, জব্বার-কি বিষণ্ন থোকা থোকা নাম;/ এই এক সারি নাম বর্শার তীক্ষ্ন ফলার মতো এখন হৃদয়কে হানে;/ ……যাঁদের হারালাম তাঁরা আমাদেরকে বিস্তৃত ক’রে দিয়ে গেল/ দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, কণা কণা ক’রে ছড়িয়ে দিয়ে গেল/ দেশের প্রাণের দীপ্তির ভেতরে মৃত্যুর অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে।/ আবুল বরকত, সালাম, রফিকউদ্দিন, জব্বার কি আশ্চর্য,/ কি বিষণ্ন নাম! এক সার জলন্ত নাম \’ মূলত: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অবিনাশী চেতনার উম্মেষ ঘটিয়ে বাঙালি নবজাগৃতির হৃদয়বিদারক ক্রোড়পত্র রচিত করে। ধারাবাহিকতায় প্রণীত হয় দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য প্রেক্ষাপট।
বাঙালির সমাজ ইতিহাস পর্যালোচনায় প্রণিধানযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরা সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা সোনার বাংলার সবুজ অবগাহন। নিরন্তর দেশপ্রেমে উর্বর জ্ঞাননির্ভর চিন্তা-চেতনা ও ভাবনার প্রকৃতি আবিষ্কারে যেমন বিকশিত অন্তর অপরিহার্য, তেমনি তাকে ধারণ করার জন্য মাতৃভাষার অবদানও সমরূপ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি অনস্বীকার্য যে, মাতৃভাষায় আবেগ-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা সকল কিছুর উপস্থাপন নির্দিষ্ট ভাষার উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাঝে অনবদ্য আত্মপ্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাসের বিশাল অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। সকল কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিক এবং সচেতন মহলে বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচর্যার প্রধান বাহনরূপে মাতৃভাষা সর্বত্রই সমাদৃত। খ্যাতিমান ভাষা বিজ্ঞানী ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতানুসারে- ৬৫০ খ্রীষ্টাব্দে বাংলা ভাষার প্রকাশকালকে চিহ্নিত করা হলে তার সমৃদ্ধির ইতিহাস প্রায় পনের শত বৎসর বিধৃত। ভাষাকে কেন্দ্র করেই ত্রৈকালিক সকল যোগসূত্রের বিকাশ ও প্রসার সর্বজনীন সামষ্টিক কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের আবর্তনে স্বকীয় জাতীয়তাবোধ সৃজনে অভ্যুপেত।
মুক্তির মহানায়ক বাঙালি জাতিসত্তার মহান স্বরূপ উম্মোচক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে প্রদত্ত বর্ণনা থেকে জানা যায়, ১৯৪৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি করাচীতে পাকিস্তান সংবিধান সভার বৈঠকে রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের আলোচনায় পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ সদস্যসহ মুসলিম লীগ নেতারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন। সেদিন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলাকে মর্যাদাসীন করার জন্য কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য বাবু ধীরেন্দ্র দত্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় – এক কূট পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রচন্ড চক্রান্ত হচ্ছিল। এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিশ; বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হল। প্রকৃত অর্থে সে সময় বঙ্গবন্ধুর সক্রিয় ভূমিকার কারণেই মাতৃভাষা আন্দোলনের জন্য অবশ্যম্ভাবী প্রতিবাদী প্রাণস্পন্দন নতুন আবহে উজ্জীবিত হয়। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং তার নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হয়। একই দিন রাষ্ট্রভাষার দাবিতে প্রথম হরতাল কর্মসূচীতে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে প্রতি বছর ১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এরই আলোকে ১৯৪৯, ১৯৫০ ও ১৯৫১ সালে ক্রমান্বয়ে দ্বিতীয়-তৃতীয় ও চতুর্থ বারের মত রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হয়। উল্লেখ্য যে; ১১ই মার্চের আন্দোলন ঢাকাসহ পূর্ব বাংলার সব জেলাতেই আলোড়ন সৃষ্টি করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথম এই হরতাল কর্মসূচি নতুন মাত্রিকতায় দেশের জনগণের আন্দোলন-অনুভূতির শক্ত ভীত তৈরি করে এবং তৎকালীন সরকার ১৫ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা চুক্তি করতে বাধ্য হয়। হরতালের দিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় শতকরা প্রায় নব্বই ভাগ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং করার দায়িত্ব বন্টন করে দেয়া হয়। সচিবালয়ে পিকেটিং করা কালে প্রথম গেইটে বঙ্গবন্ধু, শামসুল আলম, অলি আহাদ, দ্বিতীয় গেটে কাজী গোলাম মাহবুব, খালেক নওয়াজ, শওকত আলী প্রমূখ পিকেটিং করেন। অন্যসব স্থানে একই রকম পিকেটিং পরিচালনা করেন অধ্যাপক আবুল কাশেম ও মির্জা মাজহারুল ইসলামসহ প্রমূখ। এ সময় বঙ্গবন্ধুসহ পিকেটিং ও বিক্ষোভে অংশ নেয়া প্রায় সকল নেতা-কর্মী গ্রেফতার হন।
১৬ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে বিখ্যাত আমতলায় অনুষ্ঠিত সভায় সংগ্রাম পরিষদের সাথে স্বাক্ষরিত আপোষ চুক্তির সকল শর্ত অনুমোদিত হয়। বঙ্গবন্ধুসহ আন্দোলনকারী নেতা কর্মীদের হেয় প্রতিপন্ন করা ও ভারতের দালাল, কমিউনিস্ট ও রাষ্ট্রদ্রোহী ইত্যাদি বিরূপ বিশেষণে আখ্যায়িত করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য নানাবিধ দোষারোপ কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। যদিও বঙ্গবন্ধুর মতে, সত্তর-পঁচাত্তর জন বন্দী ছাত্র এবং বিপুল সংখ্যক আহতদের মধ্যে একজনও হিন্দু ছিলনা, তবুও বিরূপ অভিধায় অভিযুক্ত করে রাষ্ট্রযন্ত্র অপরিসীম নিপীড়ন-নির্যাতনের অপকৌশল অবলম্বন করে। এই প্রতিবাদ আন্দোলনে প্রাণ বিসর্জনকারী শহীদানের অফুরন্ত অবদানে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ষরে চিরঅম্লান-অমর ও অক্ষয় চিত্রপট অঙ্কিত করে।
জেলে বন্দী অবস্থায় অনশন শুরু করে বঙ্গবন্ধু মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার যে আমরণ পণ করেছিলেন, শত দুঃখ দুর্দশা এবং জেলে পুলিশ কর্তৃক জবরদস্তিমূলক নাকে নল দিয়ে পেটে খাবার ঢুকানের যে কঠিন যন্ত্রণার কথা বঙ্গবন্ধু বর্ণনা করেছেন তা কিন্তু যে কোন দেশপ্রেমিক মানুষকে না কাঁদিয়ে ছাড়তে পারে না। আজ বাংলা ভাষা স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা অর্জন করেছে। এর পিছনে কত রক্ত এবং শহীদের আত্মত্যাগ তা বঙ্গবন্ধুর আবেগতাড়িত বর্ণনা থেকে বুঝা যায়। যেহেতু একমাত্র বাঙালি জাতি মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় সমগ্র বিশ্বে প্রাণ বিসর্জনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করল যার ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতিয়তাবাদের উম্মেষ, দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন মাতৃভূমি। এটিই স্বীকৃত হয়েছে বিশ্ব দরবারে। এজন্যই মহান একুশে ফেব্রুয়ারী ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ও অবিস্মরণীয়।
১৯৫৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারী আইন পরিষদের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খসড়া শাসনতন্ত্রের অন্তর্গত জাতীয় ভাষা সংক্রান্ত প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন যে, ‘পূর্ববঙ্গে আমরা সারকারি ভাষা বলতে রাষ্ট্রীয় ভাষা বুঝি না। কাজেই খসড়া শাসনতন্ত্রে রাষ্টের ভাষা সম্পর্কে যেসব শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা কু-মতলবে করা হয়েছে। পাকিস্তনের জনগণের শতকরা ৫৬ ভাগ লোকই বাংলা ভাষায় কথা বলে, এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রশ্নে কোনো ধোঁকাবাজি করা যাবে না। পূর্ববঙ্গের জনগণের দাবি এই যে, বাংলাও রাষ্ট্রীয় ভাষা হোক।’ পরবর্তী পর্যায়ে সংক্ষুব্ধ বাঙালির বজ্রকঠিন শপথের মহিমা ও আদর্শিকতায় ছাত্র আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৭০ সালে ‘পাকিস্তান : দেশ ও কৃষ্টি’ বইটি স্কুলের পাঠ্যসূচি থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর ভিত্তি স্থাপিত হলেও অর্থ-রাজনৈতিক নির্মম বৈষম্য সৃষ্টি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যকে পরিপূর্ণতাদানে সুনিপুণ নষ্ট পরিকল্পনায় তারা ধর্মকেই শোষণের ঢাল হিসেবে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি আদিকাল থেকেই ঐতিহ্যিক চেতনায় ধর্মান্ধকে বর্জন ও ধার্মিকতাকে গ্রহণ করার মাধ্যমেই মানবিক-গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষতার শ্বাশত বৈশিষ্ট্যকে ধারণ-লালন করে জাতীয়তাবাদের অবিজ্ঞেয় আলোয় একাশ্রিত হয়। একুশের চেতনায় পরিপূর্ণভাবে অসাম্প্রদায়িক প্রতীতি প্রতিফলিত হয় ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ মূলমন্ত্রে। সমাজ সংস্কৃতির বিকাশ আবরণে ধর্ম আপেক্ষিক কোন বস্তু হিসেবে নয়, সনাতনিক নিয়ম বা স্বাভাবিক সহজ সরল মানবিক বৃত্তিকে গঠন করার প্রক্রিয়ায় এর ভ‚মিকা সাবলীল অবারিত ও চিরঞ্জীব। বিভিন্ন সূত্রমতে বর্তমানে বিশ্বে প্রায় দুইশত সত্তরটি শাখা-প্রশাখা ও স¤প্রদায়ে বিভক্ত উনিশটি প্রধান ধর্মমত প্রচলিত আছে। এইচ.পি. বেকার’র মতে অসাম্প্রদায়িক প্রত্যয়টি অপবিত্র, পাপী, ঈশ্বরহীন, বিধর্মী ইত্যাদির সমার্থক নয়। বরং স্ব স্ব ধর্মের প্রতি নিজস্ব শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাসের সাথে অন্য ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি যুক্তি ও প্রায়োগিক বিবেচনায় সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের বিনিময়ে ছন্দোবদ্ধ হয় মানবিক নির্যাস।
বাংলার সামাজিক ইতিহাসের অপ্রতুলতা, বস্তুনিষ্ঠ তথ্যপ্রবাহ ইত্যাদি এই অসা¤প্রদায়িক সম্পর্কের স্বরূপ নির্ণয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সার্থক রূপায়ন করতে পেরেছেন একুশের এই মহান ভাষা আন্দোলন। বস্তুতপক্ষে অজানাকে জানার আগ্রহ, প্রোথিত অনুভূতি এবং অদম্য ইচ্ছার বস্তুনিষ্ট নিয়ামক হিসেবে আদর্শগত সমাজ উদ্ভূত উপাদান হচ্ছে শুভ-সত্য ও সুন্দরের পরিপূরক বিকিরণ। পবিত্র ধর্ম ইসলামকে ঘিরে ঘৃণ্য অপসংস্কৃতি বা সন্ত্রাস-জঙ্গী-বর্বরতা-নৃশংসতা-হত্যা-প্রতিহিংসাপরায়নতাকে উম্মাদিত করা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। ইসলাম ধর্মের নিগূঢ়তম পবিত্রতা-মানবিকতা-সর্বজনীনতা-নান্দনিকতা-সৃজনশীলতা-অগ্রসরমানতা এবং সর্বোপরি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি অবিচল কল্যাণ প্রবৃত্তিকে বিনষ্ট-বিভ্রান্ত-কলুষিত করার অব্যাহত অপচেষ্টা-অপকৌশল সম্পূর্ণরূপে পবিত্র ইসলাম-কোরআন-সুন্নাহ্র পরিপন্থী।
প্রকৃত অর্থে ধর্ম মানব চেতনার স¤প্রসারিত রূপ। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার এবং রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। ফলে রাষ্ট্র কাউকে বিশ্বাসের খাঁচায় বন্দি করতে পারে না বা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ধর্ম বিশ্বাস রাষ্ট্রের উপর চাপিয়ে দেওয়া কোনভাবে যৌক্তিক না। মানবাধিকার ঘোষণার ১৮ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে ‘প্রত্যেক মানবের তার স্বাধীন চিন্তা, বিবেক ও ধর্ম বিশ্বাসের অধিকার আছে। এই অধিকারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আছে ধর্ম ও বিশ্বাস পরিবর্তনের স্বাধীনতা এবং একক বা যৌথভাবে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগতভাবে তার ধর্ম বা বিশ্বাসের শিক্ষা, প্রথা, উপাসনা ও আচরণ জনসমক্ষে ব্যক্ত করার অধিকার। স্মরণ রাখতে হবে, অন্যতম সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সনদের ৫৫ ও ৫৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত মূলনীতি একক ও যৌথভাবে পালন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনের মতে- ‘সেকুলারবাদ থেকে জাতীয়তাবাদ। একটি ভৌগলিক ভ‚খন্ডের জনগণ স্বাধীনতা ও সমতার ভিত্তিতে আপন জনজীবন, রাজনীতিক, অর্থনীতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করবে এবং সেখানে সকলের সমান আধিকার থাকবে, কেউ বেশি, কেউ কম অধিকারী হবে না ধর্ম, বর্ণ ও মতবাদের জন্য। এর চালিকা আত্মিক ভাবধারা হচ্ছে মানবতাবাদ। একটি বিশেষ ভ‚খন্ডের জনগোষ্ঠী এই ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হলে তাকে বলা হয় জাতীয়তাবাদ। এই সার্বিক ভাবধারাকে কোন ধর্ম, বর্ণ বা বিশেষ মতবাদের দ্বারা বিভাজিত করলে যা দাঁড়ায় তা হল সাম্প্রদায়িকতা অর্থাৎ বিকৃত জাতীয়তাবাদ।’ যে কোন ধরনের পারস্পরিক নিন্দার্হ আচরণকে পরিহার করে অন্যের মঙ্গলে আত্মনিবেদনের মধ্যেই প্রকৃত অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার জয়গান। বঙ্গবন্ধুর জীবনচরিত-অমর একুশের শিক্ষা-ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা বাঙালির জীবনজয়ের সকল ক্ষেত্রে অত্যুজ্জ্বল পাথেয় হউক – আজকের দিনে এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি। বিনম্রচিত্তে বঙ্গবন্ধু-একুশের শহীদান-জাতীয় চার নেতা-বঙ্গমাতাসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল শহীদ সদস্য-মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লক্ষ শহীদদের স্মৃতির প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং সর্বোচ্চ ত্যাগী ২ লক্ষ জননী-জায়া-কন্যার অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে নিবন্ধের ইতি টানছি।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী, সাবেক উপাচার্য চ.বি.