বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বিজয়ের আনন্দে পূর্ণতা লাভ

23

 

আজ ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ৯ মাসব্যাপী স্বশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মহাবিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ২২দিন পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন বঙ্গবন্ধু। এর দুইদিন পর ১৯৭২ সালের এ দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্ত স্বদেশে ফিরে আসেন। পাকিস্তানি শোষণ নির্যাতনের শৃঙ্খল ভেঙ্গে মুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরাটা ছিল সেই সময়ের বিজয়ের আনন্দে পূর্ণতা লাভ। এ ক্ষণটিও হয়ে উঠেছে ইতিহাসের উজ্জ্বলতম দিক। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এবারের দিবসটি নানা দিক থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ এ দিনটি এমন একসময় অত্যন্ত আবেগঘন আনন্দে উদযাপন করতে যাচ্ছে, যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী চলছে, চলছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বর্ষের নানা আয়োজন। শুধু তাই নয়, এবার এ দিনটি ফিরে এসেছে এমন এক সময়ে যখন তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে বাংলাদেশ স্থান করে নিয়েছে।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে মহাবিজয়ের ফলে বাংলাদেশ যখন আনন্দ-উল্লাসে উত্তাল, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনো পাকিস্তানি কারাগারে বন্দী। গোটা জাতি তখন তার জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে উৎকণ্ঠিত, তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় অধীর। বাহাত্তর সালের জানুয়ারির ১০ তারিখ বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত এ দেশের অগণিত মানুষ নিরাপদে তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য মুসলমানরা রোজা রেখেছে, মসজিদে-ঘরে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের মত মন্দির, মট, পেগোডা, গীর্জায় প্রার্থনা করেছেন।
অবশেষে ৮ জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডি থেকে রয়টার্স বার্তা সংস্থার ছোট্ট একটি খবরে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সেখান থেকে পিআইএর একটি বিশেষ বিমান অজ্ঞাত গন্তব্যস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে। কিন্তু তারপর বেশ কয়েক ঘণ্টা আর কোনো খবর নেই। বাংলাদেশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার প্রহর কাটে না। অবশেষে জানা যায়, পাকিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু লন্ডনে পৌঁছেছেন। রেডিও পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান ত্যাগের খবর দিতে গিয়ে জানায়, প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো বিমানবন্দরে শেখ মুজিবকে বিদায় জানান। বঙ্গবন্ধুর নিরাপদে লন্ডনে পৌঁছার খবর পাওয়ার পর দেশের সর্বত্র আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর মুক্তি ও আসন্ন স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবরে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার-দালালরাও খুশি হয়েছিল। কারণ, তাদের বিশ্বাস ছিল বঙ্গবন্ধু ছাড়া কেউ তাদের গণরোষ থেকে রক্ষা করতে পারবে না।
লন্ডনে পৌঁছেই বঙ্গবন্ধু টেলিফোনে ঢাকায় কথা বলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে। লখনৌ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। বিশেষ বিমানে লন্ডন থেকে ঢাকা আসার পথে বঙ্গবন্ধু নয়া দিল্লিতে অবতরণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অকাতরে সবরকম সাহায্য দেওয়ার জন্য তিনি ভারতীয় নেতৃবৃন্দ এবং জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে সচেতন এবং দেশবাসীর মনোভাব সম্পর্কে সদাসজাগ বঙ্গবন্ধু একটি মুহূর্তের জন্যও ভুলে যাননি যে, বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। তাই শ্রীমতি গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম সুযোগেই বঙ্গবন্ধু বলেন, দেশে ফেরার আগে আমি একটা ব্যাপার স্পষ্ট করে জেনে যেতে চাই। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য কবে ফিরে আসবে ? জবাবে শ্রীমতি গান্ধী বলেন, আপনি যেদিন চাইবেন, সেদিনই।
১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। প্রাণপ্রিয় নেতাকে বরণের জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছে রেসকোর্সে, এয়ারপোর্ট রোডে এবং তেজগাঁও বিমানবন্দরে। সে মুহূর্তে তাদের অন্তর যেন নিঃশব্দে সোচ্চার ছিল এক অনুপম হৃদয়সংগীতে : ‘তোমার পথের প্রান্তে মনের মণিদীপ জ্বেলে রেখেছি’। একজন নেতার জন্য অগণিত মানুষের অন্তরে কী প্রগাঢ় ভালোবাসা জমে উঠতে পারে, আর কী গভীর আস্থা ও বিশ্বাসে, ব্যাকুলতায় ও ব্যগ্রতায় ফুলের মতো তা ছড়িয়ে পড়তে পারে সে দৃশ্য দুই চোখ ভরে দেখছিলাম। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তিলাভের পর তিনি হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই বঙ্গবন্ধু একাধিকবার বন্দী হয়েও জয়ী হয়েছেন তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। হেরে গেছে পাকিস্তানি শাসকরাই। আসলে এ বিজয় ছিল বাংলার জনগণের। বাঙালি জাতিই সংগ্রাম করে, রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জয়যুক্ত করেছে, ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে। কিন্তু কেন? এর একটাই কারণ। বাঙালি জাতির আত্মার অমোঘ বাণীকে নিজের কণ্ঠে তুলে নিয়েই তিনি বাঙালির হ্নদয় জয় করেছিলেন। পরিণত হয়েছিলেন বাঙালির বিবেকের প্রতীকে। তিনি বলতেন, ‘আমার মাথা কিনতে পারে এমন শক্তি পৃথিবীতে নেই’। এটা কোনো অতিশয়োক্তি ছিল না। বাংলার মানুষ এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করত। তাই বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল অকুণ্ঠ, ভালোবাসা ছিল হৃদয় উজাড় করা। আজ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তাঁকে।