বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শন ও বর্তমান প্রেক্ষিত

12

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

এটি সর্বজনবিদিত যে, আধুনিক বিশ্বের বিরাজিত মানব সমাজের চলমান আচার-আচরণের মৌলিক উৎস সূত্র হচ্ছে ধর্ম। এই ধরিত্রীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রগাঢ়তম বিকাশ ও বিস্তার সামগ্রিক উন্নয়ন মানদন্ডে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করলেও ধর্মের প্রভাব সমাজ জীবনে এখনও সৌহার্দ-সম্প্রীতির বিপরীতে বিরোধ-বিচ্ছেদের অভিশপ্ত দৃশ্যপট রচনায় ব্যাপৃত। অনস্বীকার্য যে ধর্মবিশ্বাসী বিশ্ববাসী সকলের অন্তরে পরম ¯্রষ্টার অলৌকিক অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। আল্লাহ-খোদা-ঈশ্বর-ভগবান-বিষ্ণু-কৃষ্ণ-মহেশ্বর-শিব ইত্যাদি উপাসনা-উপমা ভিন্ন ভিন্ন মনস্তাত্তি¡ক ব্যাঞ্জনা সৃজনে বিপ্রতীপ অবিস্মরণে হৃদয়ের গভীরে এক ও অদ্বিতীয় পরমাত্মার সন্ধান বিশ্বস্বীকৃত। অনেকেরই বিশ্বাস মানবসৃষ্ট এসব অভিধা সমূহ ইহ ও পারলৌকিক অনুষঙ্গেরই অংশ। যাকে উদ্দেশ্য করে সকল কামনা-বাসনা-প্রার্থনা নিবেদন; ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও তার উপহৃত স্বরূপ এক ও অভিন্ন। যে নামেই সম্বোধন করা হোক না কেন; সকল নদী-সাগর-মহাসাগরের স্রোতধারার অখন্ডিত মোহনা হচ্ছে এক মহান সত্ত্বার অতুলনীয় উপলব্ধি। তিনিই অন্তর্যামী এবং সর্বত্র প্রশংসা-বন্দনার মাধ্যমে তাঁর যথার্থ সন্তুষ্টিই সকল সৃষ্টির অর্চনীয় সাফল্য।
প্রসঙ্গত বিশ্বকবি রবীঠাকুর চমকপ্রদ কাব্যে বিষয়টি বর্ণীল করেছেন- ‘আমি কিন্তু ডেকেই বসি/যেটাই মনে আসুক না, যারে ডাকি সেই তো বোঝে/ আর সকলে হাসুক না।’ দুঃখজনকভাবে অনুধাবনের বিভাজন থেকেই মানুষের মধ্যে এসব নামাকরণ উচ্চারণে সহিংসতা-বর্বরতা-নৃশংসতা-উগ্রবাদীতার বহিঃপ্রকাশেই ধার্মিকতা-অসাম্প্রদায়িকতার প্রতিকূলে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার কঠিন দেয়াল নির্মিত হয়। সর্বজনস্বীকৃত শিক্ষণ হচ্ছে, ভারতবর্ষে এই নির্মম সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প প্রণোদিত ও প্রমুদিত হয়েছে ইংরেজ শাসনের কূট পরিক্রমায়। বাঙালির মানবিক সত্ত্বাকে নিধন করার লক্ষ্যে ভারত শাসনের শেষ পর্যায়ে ইংরেজ শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় আবহমান বাংলা ও বাঙালির চিরায়ত বন্ধুত্বের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করা হয়েছে। অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞানসমৃদ্ধ না হয়ে স্ব স্ব ধর্মের মোড়কে পরমতসহিষ্ণুতার আদর্শ পরিচর্যা নেহায়েতই অসম্ভব। প্রকৃতপক্ষে ধর্মে নূন্যতম বিশ্বাস না থাকলেও ক্ষমতা-আধিপত্য-অর্থলিপ্সু কতিপয় মানব সন্তান কদর্য মনোভাবকে প্রমত্ত করার লক্ষ্যে ধর্মাবরণ ছদ্মবেশে নিজেদের উম্মোচিত করে। সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়ে সক্ষমতার ঘাটতি অনেকক্ষেত্রে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দুরূহ করে তুলে। উপায়ান্তর না দেখে ভিন্ন পন্থা অবলম্বনে উস্কানি-ইন্ধনের মদদে ব্যক্তিস্বার্থে ধর্মের অতীব পবিত্র চরিত্রকে ঘৃণ্য রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখা এদের মুখ্য উদ্দেশ্য। ফলশ্রুতিতে সমাজ হয় খন্ডিত-কলুষিত-কদাচার-পাপাচারে পরিপূর্ণ।
মুক্তির মহানায়ক জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টির অমূলক-অযৌক্তিক-নিষ্ঠুর দাঙ্গা-হাঙ্গামার নির্দয় অভিজ্ঞতায় প্রচন্ড কাতর ও যন্ত্রণাদগ্ধ ছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে এহেন অযাচিত-অবাঞ্চিত-অনভিপ্রেত বিচ্যুতি থেকে পরিত্রাণ লাভে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক মানসে কালপরিক্রমায় অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার পরিগ্রহে তিনি ঋদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গণপরিষদে খসড়া শাসনতন্ত্র অনুমোদন উপলক্ষে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতির আদর্শের মৌলিক চারটি স্তম্ভ তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। চতুর্থ স্তম্ভ – ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বিশ্লেষণে বঙ্গবন্ধু মনুষ্যত্বের সাবলীল ও স্বাভাবিক প্রকাশে বাঙালি স্বজাত্যবোধের মূল্যায়নে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনকে অসাধারণ বিশ্লেষণে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ধর্ম-বর্ণ-দলমত নির্বিশেষে সকল নাগরিকবৃন্দের গ্রহণযোগ্য ধর্ম পালনের সৌকর্যকে উদঘাটিত করেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম কর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবো না। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারো নাই।’
ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত মার্জিত-পরিশীলিত ধর্ম চর্চা বা পারস্পরিক প্রাত্যহিক বিনিময়-আদান প্রদান-লেনদেন-শ্রদ্ধা ভালোবাসা-পুণ্য প্রীতির সঙ্গত ও সংযত প্রায়োগিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করার অনুপম ক্ষেত্রের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খৃষ্টানরা তাদের ধর্ম করবে তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হল এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বৎসর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যাভিচার – এই বাংলাদেশের মাটিতে এ-সব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলবো ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি। কেউ যদি বলে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার নাই, আমি বলবো সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যদি গুটি কয়েক লোকের অধিকার হরণ করতে হয়, তা করতেই হবে।’
২৮ জানুয়ারি লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের সাউথ এশিয়া সেন্টার আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অর্মত্য সেন বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়; তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘সমাজের সমতা প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে মতাদর্শ, তা এখনও সারা পৃথিবীর জন্য প্রাসঙ্গিক। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার না করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর শক্তিশালী স্বতন্ত্র যে ধরণ ছিল, বর্তমান সময়ে তার বিস্তৃত ব্যবহার রয়েছে। যা কেবল বাংলার জন্য নয়, সারা পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’ অনবদ্য বিশ্লেষণে অধ্যাপক সেন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়নে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে বিশেষভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সেকুলারিজম ধারণার মানে মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে না, এমন নয়। সেটা ছিল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার হবে না।’ তিনি বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা দর্শন ব্যাখ্যায় ষোড়শ শতকের স¤্রাট আকবরের মতাদর্শের তুলনামূলক আলোচনায় বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও আকবরের মতাদর্শ এখনও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটা কেবল ভারতে ব্যবহৃত হতে পারে তা নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও প্রাসঙ্গিক।’
ধর্মান্ধ নয়; বিশ্বের সকল ধার্মিক ও মনুষ্যত্ব-মানবিকতায় পরিশুদ্ধ মানুষ মাত্রই কালান্তরে গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পিছনে যাদের সক্রিয় অবদান-প্রাণবিসর্জন রয়েছে, অকৃত্রিম শ্রদ্ধা-কৃতজ্ঞতায় যথাযোগ্য মর্যাদায় তাদের স্মরণ করে থাকেন। যথার্থ অর্থে তাদের সুনাম-সম্মানকে সমাসীন করা না হলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আলোকিত ভবিষ্যত নির্মাণ অবশ্যই কষ্টদায়ক হবে। বিপরীতে পরাজিত অন্ধকারের অশুভ শক্তিও বিজয়ের আনন্দবার্তা ও গৌরবোজ্জল পটভূমিকে শুধু ভূলুন্ঠিত করবে না; নানা অপকৌশলে বিকৃত ইতিহাসপাঠে জনগণ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার সকল নষ্ট-ভ্রষ্ট সম্ভবনাকে ঘৃণ্য পন্থায় কাজে লাগাবে। সাম্প্রতিককালে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে কোমলমতি শিশু-কিশোর ও ধর্মপ্রিয় শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে কুৎসিত ও দুশ্চরিত্রের মুখোশধারী ব্যক্তিদের কর্মযজ্ঞ ইতিমধ্যেই বিপুল প্রচারিত। যথাসময়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বঙ্গকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার সরকার বিচক্ষণ ও সাহসী প্রক্রিয়ায় তাদের দমন করতে সমর্থ হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রাথমিক প্রতিবেদন, বেতার, টেলিভিশনসহ নানামুখি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্তের প্রকাশ সত্যই প্রশংসিত।
সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের মানুষরূপী দানবদের ভয়ঙ্কর বলাৎকার-ধর্ষণ-যৌনাচার-কুপ্রবৃত্তির এসব অপকর্মের আড়ালকৃত বিষয়গুলো জনসম্মুখে ইতিমধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থাপিত হয়েছে। অন্যথায় দেশ শুধু জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ পরিপুষ্ট অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতো না; পবিত্র ইসলামের আদর্শিক চিন্তা, কোরআন-হাদিসের অনিন্দ সুন্দর কল্যাণমুখী শিক্ষা এবং দেশপ্রেমে পরিপূর্ণ উজ্জীবিত হয়ে মানবপ্রেমে পবিত্র ইসলামকে প্রতিপালন করার সম্ভাব্য সকল উদ্যোগই ব্যর্থতার অন্ধকার গহŸরে নিমজ্জিত হওয়ারও সমূহ সম্ভাবনা ছিল। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের অপার প্রাপ্তির তৌর্যত্রিক পান্ডুলিপি সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-কৃষ্টির ধূসর শিলালিপিতে রূপান্তরিত করার সকল অপকৌশল চিহ্নিত হয়েছে। প্রাচীন কাল থেকে বাঙালির স্বাভাবিক জীবনযাপনে প্রতিষ্ঠিত সত্য; প্রতিহিংসা-পরশ্রীকাতরতা-লোভ লালসা চরিতার্থে পার্থিব অর্জনকে সকল সুখবোধের অনন্য গন্তব্যের বিপরীতে ত্যাগ-তিতিক্ষা-সৌহার্দ-সম্প্রীতি-বন্ধুত্বই ছিল অফুরন্ত মহিমায় ভাস্বর। নৈতিক ও আদর্শিক চিন্তা-চেতনার বন্ধন বরাবরই তৈরি করেছে সকল মানুষের জন্য নিরাপদ-গ্রহণযোগ্য-পারস্পরিক স্নেহ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধার পূর্ণোপমা বৈচিত্র। রাষ্ট্র শাসনেও একই ধারায় সকল ধর্ম-ধর্মাবলম্বীর প্রতি যৌক্তিক সহনশীলতা রাষ্ট্রে মৌলিক নীতিরূপে বিবেচ্য হয়ে আসছে। অবশ্যই ধার্মিকতা ও ধর্মান্ধতার পার্থক্য নিরূপণে প্রত্যেক জাতি-রাষ্ট্রকে জাগরুক রাখতে হবে। শুধু বাংলাদেশে নয় পুরো বিশ্বে ধার্মিক বা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অসাম্প্রদায়িক ধারণায় পরিশুদ্ধ এবং ধর্মান্ধরাই সাম্প্রদায়িক হীন অপশক্তিকে ব্যবহার করে গোষ্ঠীস্বার্থ উদ্ধারে লিপ্ত থাকে।
৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে কলকাতা বিগ্রেড ময়দানে বঙ্গবন্ধু তাঁর আবেগঘন ভাষণে আদর্শিক ভাবধারার চেতনাসূচি প্রকাশ করে বলেন, ‘নীতির জন্য সংগ্রাম করেছিলাম। আজ আমার দেশ সার্বভৌম।’ তিনি বিশ্বকবি রবীঠাকুরের ‘প্রান্তিক’ কাব্যগ্রন্থের পংক্তি উপস্থাপনে বলেন, ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস,/ শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস-/ বিদায় নেবার আগে তাই ডাক দিয়ে যাই/ দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে প্রস্তুত হইতেছে ঘরে ঘরে’। ‘আমার বাঙালিরা প্রস্তুত আছে। নাগিনীদের আমরা চিনি।’ মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর পরিপূর্ণ সহযোগিতা-সমর্থন এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য বিশ্ববাসীকে উদ্বুদ্ধ করার মৌলিক আমর্শন ছিল গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের নৈতিক-আদর্শিক অভিন্ন মতাদর্শের মেলবন্ধন। ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘এ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এর একটা মানে আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আল-বদর পয়দা করা বাংলার বুকে চলবে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।’
খ্যাতিমান বাউল সম্রাট লালন ফকিরের শোষণ-দারিদ্রমুক্ত শ্রেণিহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন যেন বঙ্গবন্ধুর জীবনচরিতের কৃতাহ্নিক আরাধনার অধিবাস ছিল। নিরন্তর সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-জাগতিক ভোগের কদাভ্যাস পরিত্যাজ্যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিস্ময়কর বিকল্প। করোনা অতিমারির দু:সহ তৃতীয় তরঙ্গের প্রতিধ্বনিকে উপেক্ষা করে নয়; সকল স্বাস্থ্যবিধি এবং সরকার প্রদত্ত নির্দেশনা মেনে এই সংক্রমণ বিস্তারের বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার প্রত্যয় ঘোষণায় জাতির সাথে সমস্বরে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনকে অপ্রতিবন্ধ দৃশ্যমান রাখার প্রত্যাশায় লালন ফকিরের কবিতার পংক্তি উচ্চারণে নিবন্ধের ইতি টানছি। ‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।/ যেদিন হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান জাতি-গোত্র নাহি রবে/ শোনায়ে লোভের বুলি নেবেনা কাঁধের ঝুলি/ ইতর-আতরাফ বলি দূরে ঠেলেনা দেবে।/ আমির ফকির হয়ে এক ঠাঁই সবার পাওনা খাবে সবাই/ আশরাফ বলিয়া রেহাই ভবে কেউ নাহি পাবে/ ধর্ম-কূল-গোত্রে-জাতি তুলবে না গো কেহ জিগির/ কেঁদে বলে লালন ফকির কে মোরে দেখায়ে দেবে’।

লেখক: শিক্ষাবিদ, সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী
সাবেক উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।