বঙ্গবন্ধুর দীপ্র সত্যাগ্রহ দর্শন

14

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বাঙালির বাঙলা’ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছিলেন “বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে-‘বাঙালির বাংলা’ সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে। সেদিন একা বাঙালিই ভারতকে স্বাধীন করতে পারবে। বাঙালীর মতো জ্ঞানশক্তি ও প্রেমশক্তি এশিয়ায় কেন, বুঝি পৃথিবীতে কোন জাতির নেই।” এমন এক আরাধ্য বিশ্বস্ততায় পরিপূর্ণ কবির ধারণা কেন ফলপ্রসু হচ্ছিল না তার কারণ হিসেবে তিনি বাঙালির কর্মবিমুখতা, জড়ত্ব, মৃত্যুভয়, আলস্য, তন্দ্রা, নিদ্রা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিচ্ছা ইত্যাদি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন। অবিদ্যা যে বাঙালির দিব্যশক্তিকে তমসাচ্ছন্ন ও নিস্তেজ করে রেখেছিল তা তিনি যথার্থই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
জাতীয় কবির এই পরম আবেগ ও বস্তুনিষ্ঠ অমিয় বাণীকে ধারণ করেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যেন তাঁর জীবন দর্শনের অমূল্য সম্পদ ‘সত্যবাদী আদর্শ’ সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। জাতীয় কবি যেমন বলেছেন – “বাঙালি, বাঙালীর ছেলে মেয়েকে ছেলে বেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও : ‘এই পবিত্র বাংলাদেশ/বাঙালি-আমাদের/দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’/তাড়াব আমরা, করিনা ভয়/যত পরদেশি দস্যু ডাকাত/‘রামাদে’র ‘গামা’দের। বাঙালি বাঙালির হোক! বাঙালির জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।” এই অবিনাশী চেতনাকে আমৃত্যু লালন করে বাঙালির নিজস্ব পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত লাল-সবুজের পতাকা খচিত আজন্মের গর্বিত ঠিকানা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব।
আমাদের সকলের জানা যে, বাংলা নামক এই জনপদ ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে ভিনদেশী শাসকদের উপনিবেশ শাসন-শোষণের প্রচন্ড যাঁতাকলে অবিরাম বিপর্যস্ত ছিল। ১২০৪-১৭৫৭ পর্যন্ত স্বার্থান্বেষী মুসলিম শাসকদের নানাবিধ অনৈতিক কার্যকলাপ ও নিদারুণ অবহেলা বাঙালিদের অনগ্রসরতার প্রধান অনুষঙ্গ। আঠারো শতকে তাদের দুর্বলতার সদ্ব্যবহার ও কূটকৌশল অবলম্বন করে বাংলাকে দখল করে ব্রিটিশ বেনিয়াগোষ্ঠী। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাঙালীর অশিক্ষা, অযোগ্যতা ও অসচেতনতা পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কেও এদের চিন্তা-চেতনাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করেনি।
বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বিভিন্ন পর্যায়ে কীভাবে ১৯৪৬ সালের শেষ দিকে ভারতের রাজনীতিকে ব্রিটিশ সরকার জটিল করে তুলেছিল তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবের পক্ষে মুসলিম লীগের ইতিবাচক এবং কংগ্রেসের দোদুল্যমান অবস্থানের প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালের জুন মাসে ভারত ভাগের ঘোষণা আসে। বাংলাদেশ ও পাঞ্জাবকে বিভক্ত করে বাংলাদেশের কলকাতা ও আশপাশের জেলাগুলো ভারতবর্ষে থাকবে- কংগ্রেসের প্রস্তাবে এই বিভক্তির বিরুদ্ধে মওলানা আকরম খাঁ সাহেব ও মুসলিম লীগ নেতাদের তীব্র প্রতিবাদ ছিল।
কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা এর পক্ষে জনমত সৃষ্টির প্রচারণা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন ‘আমরাও বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম। …. শহীদ সাহেবের পক্ষ থেকে বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা আমাদের রাজধানী থাকবে। দিল্লি বসে অনেক পূর্বেই যে কলকাতাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে একথা তো আমরা জানতামও না, আর বুঝতামও না।’ খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব ১৯৪৭ সালের ২২ এপ্রিল ঘোষণা করে ছিলেন, ‘যুক্ত বাংলা হলে হিন্দু মুসলমানের মঙ্গলই হবে’। মওলানা আকরম খাঁ সাহেব মুসলিম লীগের সভাপতি হিসাবে ঘোষণা করে ছিলেন, ‘আমার রক্তের উপর দিয়ে বাংলাদেশ ভাগ হবে। আমার জীবন থাকতে বাংলাদেশ ভাগ করতে দেব না। সমস্ত বাংলাদেশই পাকিস্তানে যাবে।’
বঙ্গবন্ধুর সত্য উপলব্ধি এবং সত্যবাদীতার দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গী দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বারং বার বাংলার গণমানুষকে যেভাবে উজ্জীবিত করেছে তা শুধু ইতিহাস সমৃদ্ধ নয়, দৃষ্টান্ত হিসেবেও সর্বজন সমাদৃত। বঙ্গবন্ধু শহীদ সাহেবের মত যুক্ত বাংলার সমর্থক ছিলেন বিধায় তাঁদের বিরুদ্ধে নানামুখী বিরূপ কুৎসা রটনা করা হয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে মিথ্যাচার এবং অপবাদ দিয়ে অন্যের চরিত্রহরণ বা ভাবমূর্তি বিনষ্ট ও পরশ্রীকাতরতা বৈশিষ্ট্য বঙ্গবন্ধুর কাছে অত্যন্ত নিন্দনীয় ছিল। মহাত্মা গান্ধীর মত বঙ্গবন্ধুও ছিলেন সত্যাগ্রহী। নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ রাজনৈতিক জ্ঞান, বিচক্ষনতা ও কর্মক্ষমতার অনুসরণে বঙ্গবন্ধু সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে কখনো পিছ পা হন নি।
১৯৭৩ সালে জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরে বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক এবং খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা আঁদ্রে মালরো অসম্পূর্ণ নির্মিত স্মৃতিসৌধের বেদীতে পুষ্পস্তবক দিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কেমন দেখলেন ? উত্তরে তিনি বললেন, ‘ইউরোপবাসী নেহেরু বা গান্ধীর মত মুজিবকে ভেবে ভুল করেন। মুজিবের জনগণকে মোহিত করার ক্ষমতা রয়েছে। আবেগময় পরিবেশ তিনি তৈরি করতে পারেন। সন্দেহ নেই, তিনি একজন খাঁটি মানুষ। তার মধ্যে কোনো দুর্নীতি নেই, তবে রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে আর তাদের সমস্যাগুলোও বড়।’ সত্যবাদীতার মৌলিক নির্যাস যদি হয়ে থাকে সকল কিছু এমনকি জীবনের বিনিময়েও মানুষের কল্যাণই প্রথম ও প্রধান এবং তার জন্য প্রণিধানযোগ্য উপাদান হচ্ছে মননশীল জ্ঞাননির্ভর মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, এই প্রেক্ষিত বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুই হচ্ছেন একজন বিশ্বনন্দিত সত্যবাদীতার আদর্শিক চিন্তক ও বরেণ্য নেতা।
বঙ্গবন্ধুর সত্যবাদীতার আদর্শ উপলব্ধিতে আমরা যদি বাস্তব বিবর্জিত হয় বা কল্পনাপ্রসূত কোন বিষয়কে ভিত্তি ধরে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করি, তাহলে এটি কখনো একটি আদর্শিক দৃষ্টান্তের প্রায়োগিক অনুধাবন হবে না। সাহস করে সত্য বলা ও প্রতিষ্ঠার যে মহান স্বরূপ বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষণে উন্মোচন করেছেন তা বিশ্বেও বিরল। সত্যবাদীতার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে আত্মসমালোচনা। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ কর্মী ভাইয়েরা, কোনদিন তোমরা আমার কথা ফেলো নাই। জীবনে আমি কোন দিন কন্টেষ্ট করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বা প্রেসিডেন্ট হই নাই।’
‘কোন দিন স্বার্থে অন্ধ হয়ে তোমাদের ডাক দেই নাই। কোনো দিনে কোন লোভের বশবর্তী হয়ে কোনো শয়তানের কাছে মাথা নত করি নাই। কোনো দিন ফাঁসির কাষ্ঠে বসেও বাংলার মানুষের সঙ্গে বেঈমানী করি নাই। আমি বিশ্বাস করি তোমরা আমার কথা শুনবা, তোমরা আত্মসমালোচনা করো, আত্মসংযম করো। তোমরা আত্মশুদ্ধি করো। ……. কিন্তু কিছু কিছু লোক যখন মধু-মক্ষিকার গন্ধ পায় তখন তারা এসে আওয়ামী লীগে ভীড় জমায়। আওয়ামী লীগের নামে লুটতরাজ করে। পারমিট নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা, আওয়ামী লীগ থেকে তাদের উৎখাত করে দিতে হবে – আওয়ামী লীগে থাকার তাদের অধিকার নাই। তাই বলছি, আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে, আজ আত্মসংযমের প্রয়োজন আছে, আজ আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন আছে।’
এমন নির্ভীক সাহসীকতায় সত্য বলা এবং সত্যের পথে নিয়োজিত থাকার জন্য সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অমরবাণী, বার্তা বা নির্দেশ দলীয় নেতা-কর্মীদের দিতে পেরেছেন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে কয়জন নেতাই বা আছেন। এমনকি জীবনের অন্তিম মুহূর্ত ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ঘাতকদের কাছে কাপুরুষের মত মাথা নত করেন নি। মিথ্যা, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে জীবন বিসর্জনে কখনো আত্মসমর্পণ বা প্রাণভিক্ষা চান নি। মহাপুরুষ, মহাকালের একমাত্র মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, যাঁর তুলনা তিনি নিজেই। যাঁর কোন বিকল্প প্রতিচ্ছবি নেই। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর সত্যবাদীতা, সত্যনিষ্ঠতা ও অকপটে ভুল স্বীকার ও সংশোধনের মানসিকতা বঙ্গবন্ধুকে বিশ্বনেতার অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এজন্যই বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির নেতা নন, তিনি বিশ্বনেতার মর্যাদায় সমাসীন।
লেখক: শিক্ষাবিদ
সমাজবিজ্ঞানী, সাবেক উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়